বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

আরবমাতা বিবি হাজেরা (আ.)

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৭:৩৭:৩৪  

মাহবুবুর রহমান নোমানি

আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভরসার প্রতীক আরবমাতা হাজেরা (আ.)। তিনি আমৃত্যু স্বামী ইবরাহিম (আ.) কে দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এর জন্য বেছে নিয়েছেন দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গ জীবন। জীবনের পরতে পরতে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। অসীম ত্যাগ ও ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা স্থাপন করে ইতিহাসে তিনি স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন।
হাজেরা শব্দের অর্থ হিজরতকারিণী।
তিনি ইবরাহিম (আ.) এর জীবনসঙ্গিনী হয়ে জন্মভূমি মিসর ত্যাগ করেছিলেন বিধায় হাজেরা নামে অভিহিত হন। মিসর অধিপতি তাকে ইবরাহিম (আ.) এর বড় স্ত্রী সারার খেদমতের জন্য উপহার দিয়েছিল। এ মর্মে বোখারিতে বর্ণিত হয়েছে, ‘একবার ইবরাহিম (আ.) মিসর হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তার স্ত্রী সারা (আ.) ছিলেন পরমা সুন্দরী। মিসরে পৌঁছে তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। সেখানকার রাজা ছিল অত্যন্ত জালেম ও নারীলোভী। ইবরাহিম (আ.) ধৃত হয়ে রাজার দরবারে উপনীত হন। রাত্রিকালে লম্পট রাজা অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বিবি সারার প্রতি অগ্রসর হলে তার হাত-পা অবশ হয়ে যায়। কোনো ক্রমেই সে নবীপত্নীর দেহ স্পর্শ করতে সক্ষম হলো না। রাজা সারা (আ.) এর কাছে ক্ষমা চেয়ে তার সুস্থতার জন্য দোয়া করতে বলল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলে সে সুস্থতা লাভ করে। কিন্তু চরিত্রহীন রাজা ফের তার প্রতি ধাবিত হতে চাইল। এবারও পক্ষাঘাতের শিকার হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল। এভাবে কয়েকবার প্রচেষ্টার পর অবশেষে রাজা ভড়কে গেল। বারবার তার পক্ষাঘাত হওয়াকে বিবি সারার কেরামত ভেবে তাকে মুক্ত করে দিল। সঙ্গে বহু উপঢৌকন প্রদান করল এবং তার খেদমতের জন্য বিবি হাজেরা (আ.) কে দান করল।’ হাদিসটি বর্ণনা করে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘হে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী আরববাসী! ইনিই তোমাদের মাতা হাজেরা (আ.)।’ (বোখারি : ৩১৭৯)।
ইবরাহিম (আ.) তখন পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। একদা তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, ‘হে প্রতিপালক, আমাকে একটি নেক সন্তান দান করো।’ আল্লাহ তায়ালা বিবি হাজেরার গর্ভ থেকে সন্তান মঞ্জুর করেন। একদিন ফেরেশতা এসে হাজেরা (আ.) কে বলল, ‘তুমি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করবে। তার নাম রাখবে ইসমাঈল।’ বর্ণিত আছে, ইসমাঈল (আ.) এর জন্মের সময় ইবরাহিম (আ.) এর বয়স ছিল ৮৬ বছর। অন্য বর্ণনা মতে ১২০ বছর।
ইসমাঈলের জন্ম বিবি সারার জন্য অত্যন্ত মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তিনি মানবসুলভ প্রকৃতির তাড়নায় মা হাজেরার প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ এলো। সেমতে ইবরাহিম (আ.) শিশু ইসমাঈল ও হাজেরা (আ.) কে নিয়ে রওনা করেন। সঙ্গে জিবরাঈল (আ.) গাইড হিসেবে ছিলেন। পথিমধ্যে কোনো শস্যশ্যামল বনানী দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলতেন, এখানেই অবস্থান করানো হোক। কিন্তু জিবরাঈল (আ.) বলতেন, এখানে অবস্থানের নির্দেশ নেই। অবশেষে জনশূন্য, তৃণলতাহীন, উত্তপ্ত বালুকাময় প্রান্তরে পৌঁছে তাদের থামিয়ে দেয়া হলো। সেখানে বসবাস শুরু করতে না করতেই ইবরাহিম (আ.) হাজেরা ও ইসমাঈলকে এখানে রেখে সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ পেলেন।
আপনি কি কখনও ভেবেছেন, চারদিকে ধূসর, রুক্ষ, ধু-ধু প্রান্তর, চাষাবাদহীন, সবুজ-শ্যামলতার আমেজবিহীন, জনশূন্য মরুভূমিতে ফারান পাহাড়ের পাদদেশে নিঃস্ব অবস্থায় একজন নারী ও দুধের শিশুকে কেন ফেলে রেখে আসা হয়েছিল? ‘আল্লাহর নির্দেশে আমি চলে যাচ্ছি’ প্রিয়তমা স্ত্রীকে এতটুকু বলে যাওয়ার দেরিও তিনি সহ্য করতে পারলেন না। স্রষ্টার হুকুম পালনের কী অপূর্ব দৃষ্টান্ত! অসহায় স্ত্রী পেছন থেকে বারবার কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি এ জনমানবহীন প্রান্তরে আমাদের একা রেখে কোথায় যাচ্ছেন?’ আল্লাহর পয়গম্বর কোনো জবাব দেননি। অবশেষে ডেকে বললেন, ‘আপনি কি আল্লাহর কোনো নির্দেশ পেয়েছেন?’
ইবরাহিম (আ.) মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ’। আল্লাহর নির্দেশের কথা জানতে পেরে হজরত হাজেরা (আ.) খুশি মনে বললেন, তাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না। মহান আল্লাহর প্রতি কী অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা লালন করেছেন নবীপতœী মা হাজেরা (আ.)!
কিছু দিনের মধ্যে খাদ্য ও পানি শেষ হয়ে গেল। এক সময় নিদারুণ পিপাসা তাকে পানির খোঁজে বের হতে বাধ্য করল। শিশু ইসমাঈলকে উন্মুক্ত স্থানে রেখে তিনি ‘সাফা-মারওয়া’ পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার দৌড়ান। দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে তিনি শুনতে পান, কে যেন আওয়াজ করছে। হাজেরা (আ.) বললেন, ‘তুমি যদি সাহায্য করতে পার, তবে সামনে আস।’ অতঃপর জিবরাঈল (আ.) পায়ের আঘাতে একটি পানির ঝরনাধারা বইয়ে দিলেন। বর্তমানে এ ঝরনার নামই জমজম কূপ। জিবরাঈল (আ.) বললেন, তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ তোমাকে এবং এই শিশুকে ধ্বংস করবেন না। এখানেই রয়েছে আল্লাহর ঘর। যার নির্মাণকাজ এই শিশু ও তার বাবার ওপর আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন।
তার এ ছোটাছুটি আল্লাহ তায়ালা এতটাই পছন্দ করেছেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত আগত বংশধরদের জন্য তার অনুসরণ আবশ্যক করে দিয়েছেন। হাজীরা সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড় দিয়ে বিবি হাজেরা (আ.) এর স্মৃতিচারণ করেন। শুষ্ক মরুভূমিতে পানির সন্ধান পেয়ে বনি জুরহাম গোত্রের লোকেরা সেখানে বাস করার জন্য মা হাজেরা (আ.) এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করল। তিনি বললেন, বসবাস করতে পারো; কিন্তু পানির মালিকানা স্বত্বের অংশীদার হতে পারবে না। তারা এ শর্ত মেনে নিল। আর এভাবেই গড়ে উঠলো মক্কায় জনপদের ভিত্তি। বিবি হাজেরা (আ.) ছিলেন নগরমাতা ও সবার শ্রদ্ধার মুকুট।

পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা