বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

অফুরন্ত আনন্দের স্মৃতিতে টেকনাফ ভ্রমণ কামরান চৌধুরী

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৬:৫৯:১২  

কামরান চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রধানতম পর্যটন শহর কঙ্বাজার। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, দিগন্ত বিস্তৃত নীল সমুদ্র, আকাশছোঁয়া পাহাড়, বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোডা আরও নানা আকর্ষণ নিয়ে কঙ্বাজার জেলা বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী। কঙ্বাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের মধ্যে টেকনাফের সৌন্দর্য নানা কারণে সবার কাছে আকর্ষণীয়, উপভোগ্য ও মনোরম।

টেকনাফ : নাফ নদীর টেকে (বাঁকে) অবস্থিত বলে এলাকার নাম হয়েছে টেকনাফ। পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের অনন্য এক মিলনস্থল বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের ভূমি টেকনাফ। বাংলার সব সৌন্দর্য যেন এসে মিলেছে এখানে। জেলা শহর থেকে সড়কপথে এ জায়গাটির দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। নানা ট্রলার-নৌকা আসে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ ঘাটে। টেকনাফে যে বাজার রয়েছে সেখানে মিয়ানমারের বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। এখান থেকে বহুদূরের মিয়ানমারের পাহাড় ও সবুজ বন দেখা যায়। কঙ্বাজার থেকে বাস ও মাইক্রোবাসে টেকনাফ আসা যায়। কঙ্বাজারের কলাতলি ও টেকনাফ মোড় থেকে বাস ছাড়ে, সময় লাগে ২ ঘণ্টা। এখানে থাকার জন্য রয়েছে পর্যটন মোটেল নেটং। টেকনাফ শহরের ৫ কিলোমিটার আগে এটি অবস্থিত। এছাড়া সাধারণ মানের কয়েকটি হোটেল রয়েছে। সেন্টমার্টিন যেতে হলে আপনাকে টেকনাফে যেতে হবে। টেকনাফ উপজেলার পূর্বপ্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে নাফ নদী; এ নাফ নদী থেকেই এ অঞ্চলটির নামকরণ হয়েছে। টেকনাফে বহু পর্যটক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টেকনাফের সমুদ্রসৈকত, নে-টং বা দেবতার পাহাড়, মাথিনের কূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের তৈরি করা বাঙ্কার ইত্যাদি। কঙ্বাজার সমুদ্রসৈকতের তুলনায় টেকনাফ সমুদ্রসৈকতের পানি অধিক পরিষ্কার। এছাড়াও টেকনাফে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ বার্মিজ মার্কেট। এ মার্কেটে প্রতিদিন শত শত পর্যটক কেনাকাটা করে থাকেন।

টেকনাফ সমুদ্রসৈকত : টেকনাফ শহর থেকে কিছুদূর দক্ষিণে গেলেই সুন্দর সমুদ্রসৈকত। সৌন্দর্যের লীলাভূমি টেকনাফের বেলাভূমিতে প্রচুর সোনালি বালি রয়েছে। খুবই পরিচ্ছন্ন এ সৈকতে পর্যটকের আনাগোনা খুব বেশি নয়। তবে এ সৈকতে জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যায় সব সময়। টেকনাফ শহর থেকে রিজার্ভ কিংবা লোকাল জিপে সহজেই আসা যায়। এখানে অসংখ্য সি-গাল দেখা যায়। টেকনাফ থেকে দেখা যায় সূর্য ওঠে সমুদ্র থেকে আর অস্ত যায় সমুদ্রের জলে।

মাথিনের কুয়া : টেকনাফ থানা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক মাথিনের কুয়া। এ কূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুলিশ অফিসার ও সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্টাচার্য এবং ১৪ বছর বয়সী মাথিনের প্রেমের অমরগাথা। ২০ শতকের শেষদিকের কথা, টেকনাফ থানার অফিসার হয়ে আসেন সুদর্শন ধীরাজ ভট্টাচার্য। রাখাইন কন্যা মাথিন প্রায়ই জল নিতে আসত থানার সামনের কুয়ায়। দুইজনের মধ্যে পরিচয় হয়। সে পরিচয় একসময় রূপ নেয় প্রেমের সম্পর্কে। কিন্তু ধর্মের ভিন্নতা তাদের দুইজনের মিলনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ বাড়ি থেকে দুঃসংবাদ পেয়ে কলকাতা ফিরে যায় ধীরাজ, বহুদিন পরেও ফিরে আসতে পারেননি তিনি। অনেক দিন চলে গেলেও ফিরে না আসায় লোকজন মাথিনকে বলত, সে তাকে ঠকিয়েছে। মাথিন ক্ষোভে-দুঃখে এ কূপে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। বহু বছরের পুরনো এ কূপটি ধীরাজ-মাথিনের প্রেমের সাক্ষী হয়ে আছে। আজও কূপটি সংরক্ষণ করে আসছে থানা কর্তৃপক্ষ। এটি দেখতে গিয়ে এ প্রেম উপাখ্যান আপনার মনকে একটু হলেও নাড়া দেবে।

নাফ নদী : নাফ নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে পৃথক করেছে। বাংলাদেশের সুন্দরতম নদীও বলা যায় এটিকে। দেশের সর্ব দক্ষিণ উপজেলা টেকনাফের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে এ নদী। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন যেতে হয় এ নদীর ওপর দিয়ে। এখানে নাফ নদী থেকে নেটং পাহাড়ের সৌন্দর্য যেমন উপভোগ করা যায়, তেমনি নেটং পাহাড় থেকেও চোখ মেলে দেখা যায় নাফ নদীর সৌন্দর্য। অসংখ্য মাছ ধরার নৌকা দেখা যায়, জাল পেতে রেখেছে তারা। বিকালে নাফ নদীতে ভ্রমণ করে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে দেখা যায়, নাফ নদীর ওপারে বার্মার সীমান্তে তারকাঁটার বেড়া এবং প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে।

শাহপরীর দ্বীপ : টেকনাফ উপজেলার সবরাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ। একসময় এটি দ্বীপ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছুকাল আগে এটি মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। টেকনাফ উপজেলা শহর থেকে শাহপরীর দ্বীপে যেতে জিপে সময় লাগে আধা ঘণ্টা।

শিলখালী গর্জন বন : টেকনাফ থেকে কঙ্বাজারগামী মেরিন ড্রাইভ সড়কে ২০ কিলোমিটার দূরে শিলখালী গর্জন বন। আকাশছোঁয়া বড় বড় গর্জন গাছ এ বনের মূল শোভা। কিছুক্ষণ এর পাশে অবস্থান করলে অভিভূত হবেন। নির্মল বাতাস আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।

শাপলাপুর সৈকত : শিষখালী থেকে মেরিনড্রাইভ সড়ক ধরে আরও ১০ কিলোমিটার গেলে শাপলাপুর সমুদ্রসৈকত। খুব সকাল কিংবা বিকালে দেখতে পাবেন এ সৈকতে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়া ছোটাছুটি করছে। তাছাড়া দীর্ঘ এ সৈকত বেশিরভাগ সময়ই থাকে প্রায় জনমানবহীন। ভ্রমণে যারা নির্জনতাকে পছন্দ করেন তাদের জন্য শাপলাপুর সৈকত আদর্শ স্থান।

গেম রিজার্ভ ফরেস্ট : টেকনাফ উপজেলার প্রায় ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে অবস্থিত গেম রিজার্ভ ফরেস্ট। কঙ্বাজার থেকে টেকনাফ যেতে হোয়াইখিয়ং বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে সংরক্ষিত এ বনাঞ্চল। মূলত বন্যহাতি সংরক্ষণের উদ্দেশে ১৯৮৩ সালে এ বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। এ বনে রয়েছে প্রায় ২৯০ প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ। এছাড়া ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৩ প্রজাতির উভচর ও প্রায় ২৮৬ প্রজাতির পাখির বসবাস। তবে এ বনের মূল আকর্ষণ বন্যহাতি। বর্তমানে এ বনের অবস্থা ভালো নয়। অসাধু বনকর্মীদের সহায়তায় বনের গাছপালা উজাড় হওয়ার পথে। বনের আশপাশে রাখাইন, চাকমাসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে।

তৈঙ্গা পাহাড় ট্রেইল : প্রায় ৪০০ ফুট উচ্চতায় তৈঙ্গা টেকনাফের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এ পাহাড়ের চূড়া থেকে একদিকে নাফ নদী আরেক দিকে বঙ্গোপসাগর দেখা যায়।

টেকনাফ নেচার পার্ক : টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার উত্তরে দমদমিয়া নামক জায়গায় টেকনাফ নেচার পার্ক। জঙ্গলে ভ্রমণের জন্য তিনটি হাঁটার পথ পাওয়া যায়। আপনি গাইডের সহায়তায় ঘুরে দেখতে পারেন জঙ্গলটি।

সেন্টমার্টিনে যেতে হলে টেকনাফ থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টায় কেয়ারি সিন্দবাদ, এসসিটি কুতুবদিয়া, ঈগল, এসটিসি কাজল ইত্যাদি সমুদ্রে চলাচল উপযোগী জাহাজ রয়েছে। এগুলোতে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে পারেন। সেখানে ২ ঘণ্টা খাবার ও গোসলের বিরতির পর আবার বিকাল ৩টায় সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেয়া যায়।

কামরান চৌধুরী : এনজিও কর্মকর্তা ও পর্যটন লেখক


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা