বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর একটুখানি সহযোগিতা চাই

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৬:৫৪:৫৭  

তাহসিনা আকতার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফরিদ স্যার সাথে আলাপকালে তিনি ভারতের এপিজে আবুল কালাম এবং পাকিস্তানের অধ্যাপক কাদের খানের মেধাগত অর্জনের কথা বলেছিলেন। আমি প্রশ্ন করেছিলম ভারতবর্ষ বা পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশে শিক্ষকরা এবং গবেষকরা যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা সরকার থেকে পান আমদের দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কি শিক্ষকতার অনুষঙ্গ হিসেবে সেই ধরনের কোন সুবিধা পান? আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষকই তাদের পেট ও পরিবার নিজ প্রচেষ্টায় সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মেধাগত উৎকর্ষতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা তাঁদের কোথায়? আমাদের অনেক শিক্ষকই যেকোন হলের একটি মাত্র ছোট কক্ষে বছরের পর বছর দিন কাটাতে বাধ্য হন। হাজার হাজার শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ যানবাহনে চলাফেলা করেন যেহেতু তাঁদের একটি নিজস্ব গাড়ি কেনার জন্য যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য বা সহায়তা নেই এবং তাঁদের অনেকেরই দূর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন। এমনকি শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে পাবলিক বাস ধরতে গিয়ে আমাদেরই একজন শিক্ষক আজ প্রায় পঙ্গু। ভাগ্যজোরে তিনি বেঁচে যান। যাঁদের নিজস্ব গাড়ি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আছে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা/সমর্থন দ্বারা নয় বরং নিজের সম্পত্তি, যোগ্যতা ও চেষ্টার দ্বারা সেগুলোর ব্যবস্থা করেছেন। শিক্ষকদের গুনগত মান উন্নয়নের জন্য কোন ধরনের প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষা তহবিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই যার মাধ্যমে আমরা দেশের বাইরে পড়াশুনা করে নিজেদের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারি। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের বেতন অনেক বেশি এবং তাঁরা তাঁদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট সরকারি অনুদান পেয়ে থাকেন যা একজন শিক্ষকের ক্যারিয়ার উন্নয়নের জন্য পূর্বশর্ত। পক্ষান্তরে, আমাদের শিক্ষকরা নিজ প্রচেষ্টায় উচ্চশিক্ষার জন্য তহবিলের ব্যবস্থা করে থাকেন যা বর্তমান বিশ্বে অনেক প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং অনিশ্চিত।

চলুন এবার বহুজাতিক সংস্থা ও ব্যংকের দিকে তাকাই। এমনকি একজন মধ্যবয়স্ক কর্পোরেট কর্মকর্তা তাঁদের চাকুরীর আনুষঙ্গিক হিসেবে বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট, গাড়ি, লোন, ঋণ সহায়তা ও অন্যান্য অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন যা শিক্ষকদের কাছে স্বপ্নের মত। দুর্ভাজ্যজনক হলেও এমন দৃশ্য দেখা যায় যেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রিকশা দিয়ে চলাফেরা করছেন কিন্তু বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত তাঁরই কোন একজন ছাত্র বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করছেন এবং আমাদের শিক্ষকরাই এই কর্মকর্তাদের সৃষ্টি করেছেন।

তাই আমরা ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জাতিকে জানাতে চাই যে, আমাদের দাবিগুলো অযৌক্তিক নয় বরং এগুলো হচ্ছে আমদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার দাবি। আমাদের মধ্যেই অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা নীরবে নিভৃতে সেইসব গরীব ছাত্রদের সাহায্য করে যাচ্ছেন যারা ঢাকা শহরে নিজেদের জীবন-যাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে পারে না। আমাদের শিক্ষকরাই নীরবে পথের গরীব ভিক্ষুকদের এমনভাবে সাহায্য করে যাচ্ছেন যাতে তারা ছোট ব্যবসায়ীতে পরিণত হতে পারে। আমাদের অনেক শিক্ষকরাই নিজেদের স্বল্প বেতনের টাকা থেকে নিজেদের গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। যেকোন ব্যবস্থার মতই হয়ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বহু ভুল-ক্রটি রয়েছে যা আমরা ভিন্নভাবে সমাধান করতে পারি।

আমাদের শিক্ষকদেরই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন দিতে হয়েছে তাঁদের মেধা ও বৃদ্ধি দিয়ে জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেবার অপরাধে। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষকদের বেছে নিয়েছিল যাতে করে এই দেশ আর কখনও তার নিজস্ব মহিমা ও গৌরব নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। আমরা সেই মেধা ধ্বংসের ইতিহাস ভুলে যাব না এবং তিল তিল করে মেধা ধংসের এই যজ্ঞখেলায় আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শেষ হতে দেব না।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। আমাদের সমস্ত দাবির মূল অভিপ্রায় একটাই যে, জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করে দেশকে শ্রদ্ধা সম্মানের সাথে বিশ্বের বুকে দাঁড় করানোর সুযোগ করে দিন। এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া, আমাদের প্রাণের দাবি। শুধু চাই একটুখানি সরকারের মনোযোগ ও সহযোগিতা।

তাহসিনা আকতার

সহকারি অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা