বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

মহেশখালী দ্বীপ ও আদিনাথ মন্দির

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৬:৫৩:১৪  

কামরান চৌধুরী

দেশের ভেতর ভ্রমণের চিন্তা করলেই কয়েকটি স্থানের মধ্যে মানুষ প্রথমেই ভাবে কক্সবাজার জেলার সমুদ্রসৈকতের কথা। কক্সবাজারের মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ময় দ্বীপ মহেশখালী। সাগরঘেরা দ্বীপটি অত্যন্ত চমৎকার। যারা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান তারা এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। এক যাত্রায় দেখতে পাবেন সাগর, বন, পাহাড়, দ্বীপের মাঝে বৈচিত্র্যময় নানা উপাদান। দ্বীপটির আয়তন ৩৬২.১৮ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী পাহাড় এবং এর পাদদেশে প্রবাহিত মহেশখালী চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা হয়েছে। এ কারণে অনুমান করা হয়, এটি একসময় মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। উপজেলার উত্তর প্রান্তে জনতা বাজার নামক স্থানে মহেশখালী সেতু নির্মিত হওয়ায় মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দ্বীপটিতে অরণ্যের ছোঁয়া রয়েছে। উপকূল বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে ঘন বনে, যেখানে রয়েছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। ছোট্ট এ জায়গাটিতে একসঙ্গে অনেক কিছু দেখার রয়েছে।

কক্সবাজার থেকে সহজেই ইঞ্জিন নৌকা বা স্পিডবোটে যাতায়াত করা যায়। কক্সবাজার ট্রলারঘাট থেকে মহেষখালী যেতে সময় লাগে স্পিডবোটে ৩০ মিনিট এবং ইঞ্জিন নৌকায় দেড় ঘণ্টা। সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত যাতায়াত করা যায়। পানিপথের দৃশ্যও উপভোগ করার মতো। ভাটার সময় নদীর পানি কমে যায়, তখন স্পিডবোট চলতে অসুবিধা হয়। জোয়ার-ভাটার উভয় অভিজ্ঞতা আপনাকে এক অভূত শিহরণ জাগাবে মনে। তবে জোয়ারের সময় যাবেন। স্পিডবোট ঘাটটি কংক্রিটের তৈরি। ঘাটের সিঁড়িতে শত শত শামুক জমাট বেঁধে আছে। খালি পায়ে নামবেন না, পা কেটে যেতে পারে। ঘাট থেকে ৫০০ মিটার লম্বা ব্রিজ তৈরি রয়েছে। এর ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে ভালো লাগবে। ঘাট থেকে নামলেই রিকশা অপেক্ষা করছে। রিকশায় ঘুরে দেখতে পারেন দ্বীপটি, আবার বন্ধু-বান্ধব মিলে হেঁটেও দেখতে পারেন যদি হাতে কিছুটা সময় থাকে। জেলেদের বিচিত্র জীবনযাপনও উপভোগ করতে পারেন। জেলেদের পাড়ায় শুঁটকি মাছের ছড়াছড়ি। দ্বীপটিতে পানের বরজ রয়েছে, পানগুলোর সুনাম দেশময়। রাস্তার পাশে ক্ষেতে সমুদ্রের পানি শুকিয়ে লবণ তৈরি করার দৃশ্যও দেখতে পাবেন। এখানে রাখাইন পরিবার রয়েছে, তারা তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে। সমুদ্রতীরে শামুক-ঝিনুকের ছড়াছড়ি। পাহাড়ের ওপর উঠে সমুদ্রের জলরাশি দেখতে চমৎকার লাগবে। অত্যন্ত নিরিবিলি পরিবেশ এখানে। আরও আছে বাবা লোকনাথের মন্দির। হাজার হাজার অতিথি পাখি দেখবেন শীতকালে। অন্যান্য সময়ও রয়েছে পাখির সমারোহ।

দ্বীপটির নামকরণের ইতিহাস চমৎকার। কথিত আছে, এখানকার প্রভাবশালী বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ সিকদার হরিণ শিকার করতে গিয়ে একদিন একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নেয়ার সময় একটা শব্দে তন্দ্রা টুটে যায়। তিনি দেখেন, একটি গাভী একটি মসৃণ শিলাখন্ডের ওপর বাঁট থেকে দুধ ঢালছে; তার এ গাভীটি কিছু দিন আগে হারিয়েছিল। গাভী আর শিলাখ-টি নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। সে রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখেন, এক মহাপুরুষ তাকে বলছেন যে, শিলাখ-টি একটি দেববিগ্রহ। যেখানে এটি ছিল সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করতে হবে। মন্দিরের নাম হবে আদিনাথ মন্দির। এ আদিনাথের (শিবের) ১০৮ নামের মধ্যে ‘মহেশ’ অন্যতম। আর এ মহেশ নাম থেকেই মহেশখালী নামকরণ।

মহেশখালী বিখ্যাত মূলত আদিনাথ মন্দিরের জন্য। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শিব চতুর্দশী পূজার আগে-পরে কয়েকদিনব্যাপী মেলা হয়ে থাকে। মেলায় দেশীয় পণ্যের পসরা বসে। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে। অাঁকাবাঁকা সিঁড়ি ভেঙে আদিনাথ পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই এই মন্দির। কয়েকশ’ বছর আগে মৈনাক পাহাড়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় মন্দিরটি। সমতল ভূমি থেকে ৬৯টি সোপান অতিক্রম করে আদিনাথের মন্দিরে যাওয়া যায়। সিঁড়ির পাশেই রাখাইন নারীরা বিভিন্ন পসরা সাজিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ মিটার উঁচু মন্দিরটি। মন্দিরের দৈর্ঘ্য ১০.৫ মিটার, প্রস্থ ৯.৭৫ মিটার এবং উচ্চতা ৬ মিটার। উত্তরের অংশের প্রথমভাগে বর্গাকারে দুইটি পূজাকক্ষে আদিনাথ বানলিঙ্গ শিবমূর্তি এবং অষ্টভুজা দুর্গামূর্তি রয়েছে। সামনের দিকের প্রবেশপথটি ধনুকাকৃতির। এখানে একটি পারিজাত গাছ রয়েছে। পারিজাত ফুলও দেখতে চমৎকার, ভাগ্য ভালো হলে আপনিও দেখতে পাবেন। আদিনাথ মন্দিরকে শিবমন্দিরও বলা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান আরাধ্য দেবতাদের অন্যতম হলো এই আদিনাথ বা শিব। তিনি মহাকালরূপী মহেশ্বর। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা মহেষখালীর জমিদার প্রভাবতী ঠাকুরানী। এই মন্দিরের পাশে ১৫০ ফুট উপরে রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির। এ দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে বিস্তীর্ণ সাগর আর পশ্চিমে বিশাল পাহাড়। মহেশখালীতে থাকার তেমন ভালো জায়গা নেই। খাবারের জন্য কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এখানে ডাব খেতে পারেন সস্তায়। বাজারে সামুদ্রিক মাছও দেখতে পাবেন। যাওয়ার সময় বা ফেরার সময় নদীতে সামুদ্রিক মাছ ধরার ট্রলার দেখতে পাবেন। সড়কপথেও যাওয়া যায়। চকরিয়া হয়ে বগাখালীর গোরকঘাটার লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয়। কিন্তু নদীপথেই আনন্দ। এক কথায় বলা যায়, ভ্রমণটা অত্যন্ত উপভোগ্য হবে। পরিবার অথবা বন্ধুদের সঙ্গে অর্ধবেলা সময় বের করে ঘুরে আসুন, মনে থাকবে দীর্ঘদিন এই স্মৃতি।

জেটিঘাট থেকে বাজারে প্রবেশের আগেই সড়কের বাঁ পাশে মহেশখালী বড় বৌদ্ধ কেয়াং বা মন্দির। এর ভেতরে কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির। বেশ কয়েকটি পিতলের বৌদ্ধ মূর্তিও আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ, মাথায় হাতে শায়িত বুদ্ধ এবং দন্ডায়মান বুদ্ধ ইত্যাদি। পুকুরের মাঝে পদ্মের ওপর বসা এবং পেছনে সাপের মূর্তি রয়েছে। কেয়াংয়ের সামনে রয়েছে রাখাইনদের কয়েকটি দোকান, সেখান থেকে উপহারসামগ্রী ক্রয় করে আনতে পারেন প্রিয়জনদের জন্য। এছাড়া পাশেই তাঁতের ঠকাঠক শব্দ শুনতে পাবেন। ভেতরে ঢুকে দেখতে পারেন তাঁতে কাপড় বোনার দৃশ্য। তাদের সঙ্গে ছবিও তুলতে পারেন।

কামরান চৌধুরী : এনজিও কর্মকর্তা ও পর্যটন লেখক


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা