বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

রাষ্ট্রের দায় বনাম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৬:৪৯:৫৯  

আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দানা বাঁধে। এর ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে সরকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আন্দোলনের দ্বিতীয় ধারাটির উৎস অষ্টম পে-স্কেলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবনয়ন। আন্দোলনটি ঢিমেতালে হলেও চলমান রয়েছে। এ আন্দোলনের ফল কী হবে তা অনেকটা অনিশ্চিত। অনিশ্চয়তার কারণ খুবই স্পষ্ট। অন্যতম কারণ হতে পারে শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তি, আর অপেশাদারি মানসিকতা। লেজুড়বৃত্তি ও অপেশাদারি মানসিকতার সূত্র ধরেই শিক্ষকরা খুইয়ে দিচ্ছেন তাদের আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ববোধ। শাসকগোষ্ঠী এ সুযোগটি কাজে লাগান পুরোদস্তুর। আন্দোলন সফল হবে কিনা এ আশঙ্কার জন্ম মূলত এখান থেকে। তারপরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আশার খবর হলো, বেতনকাঠামোর বৈষম্যরোধে মন্ত্রিপরিষদ থেকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যে কমিটি গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। আপাতত মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে সরকার নমনীয়। কিন্তু এখানেই কি সঙ্কটের পরিসমাপ্তি?

উপর্যুক্ত প্রশ্নটির মীমাংসায় পরে আসছি। অন্য একটি প্রশ্ন সামনে রেখে আলোচনার গভীরে যেতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবনয়নের ঔদ্ধত্য সরকারের বেতন নির্ধারণী কমিটি পেল কোথা থেকে? এ প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা জরুরি। এর জন্য প্রথমত দায়ী সাম্প্রতিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হালহকিকত। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নৈরাজ্য, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় ভরপুর। রাজনৈতিক দলাদলির রেশ ধরে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি শিক্ষার মান ও রুচিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দলীয়করণের কবলে পড়ে অযোগ্য, মেধাহীন নিয়োগেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ইদানীং পত্রিকার পাতায় ছাত্র ভর্তি নিয়েও শিক্ষকদের অনেকের দুর্নীতির সংবাদও আমরা জানতে পেরেছি। আর গবেষণা? যে দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কে নেয়ার কথা, সেটুকু কি সে পালন করছে? যদি বলি পারছে না, তাহলে অন্যায় কিছু বলা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি এ তথ্য জাতিকে জানাতে কৃপণতা করব না যে, শিক্ষকদের একটি অংশ গবেষণা কিংবা পাঠদান উভয় থেকেই অনেক দূরে। প্রমোশনের জন্য ন্যূনাধিক ক’টি প্রবন্ধ প্রকাশের শর্ত থাকলেও অনেক শিক্ষককেই হিমশিম খেতে দেখেছি। কারও সামর্থ্য থাকলেও গবেষণার প্রতি আকর্ষণ নেই, কারওবা যোগ্যতা নেই। এ দুরবস্থা প্রমাণ করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমরা কাজটি করছি না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার সুবাদে এখানকার অভ্যন্তরীণ অনেক অবিচার, অন্যায্যতার পর্যবেক্ষণ করেছি। এখানে এমনসব অবিচার ও বৈষম্য রয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত সীমানায়। অন্য অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এ থেকে মুক্ত নয়। আমরা লক্ষ করছি, প্রশাসনের সমর্থক না হলে ইনিয়ে-বিনিয়ে শিক্ষকের প্রমোশন ঠেকিয়ে দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় ছুটি প্রাপ্য থাকা সত্ত্বেও ভিসি বলয়ের না হলে তার ছুটি আটকিয়ে দেয়া হয়। বিধিবহির্ভূতভাবে বিদেশে অবস্থানের কারণে চাকরিচ্যুতি তাতেও পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যারা অবৈধভাবে বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করলেও তাদের চাকরির কিছুই হয় না। উল্টো সেটাকে এক্সট্রা-অর্ডিনারি লিভ হিসেবে মওকুফ করার তৎপরতা চলে। আবার বৈধভাবে শিক্ষাছুটিতে থাকা অনেকে শিক্ষকের চাকরি খোয়াতেও দেখেছি। বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। এসব বিষয়ে শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়াও স্ববিরোধিতাপূর্ণ, হাস্যকর। বছর দুয়েক আগে এ ধরনের হাস্যকর ঘটনা লক্ষ করেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। একজন শিক্ষককে বিশেষ বিবেচনায় বাসা বরাদ্দ দেয়া হতে পারে এ ধরনের গুজবকে কেন্দ্র করে কতিপয় শিক্ষক ভিসিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। নিয়ম অনুসরণের নীতি-উপদেশ দেন। অথচ এর দিন কয়েক পর সেই শিক্ষকরাই বিশেষ বিবেচনায় বাসা বরাদ্দ গ্রহণ করেন। এ লজ্জাহীনতা আমাদের পেশার সঙ্গে যে মিলে না তা আমরা বুঝতে চাই না। আমরা মনে করি, জোর যার মুল্লুুক তার। এ ধরনের একটি সংস্কৃতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রোজকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন এক অরাজকতার ক্রীড়নক।

উপর্যুক্ত আলোচনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে হালহকিকত উপস্থাপিত হচ্ছে তা অর্থমন্ত্রীর ‘করাপ্ট প্র্যাকটিস’ মন্তব্যকেই যুক্তিযুক্ত করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রেই আমি অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যের সঙ্গে একমত নই। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই মন্তব্যের যৌক্তিক উপাদানগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্তিত্বশীল রয়েছে। আমাদের চাকরির নিয়োগপত্রে অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে পাঠদান ও গবেষণার কথা বলা আছে। পূর্ণ ইউনিট কোর্সের জন্য ৫০ ঘণ্টার ক্লাস নিতে হয়। আমরা কি আমাদের এ দায়িত্ব পালন করি? বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার জন্য দেনদরবার, তদবির নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ ব্যস্ত থাকেন। আর কিছুসংখ্যক ওই মহাশক্তিধর শিক্ষকদের স্তবকতায় মগ্ন থাকেন। সবকিছু মিলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হারিয়ে বসছেন তাদের স্বীয় মর্যাদা। এ মর্যাদাহীনতার ফোকর দিয়েই আমলা আর রাজনীতিবিদরা তাদের অবমূল্যায়ন করার সাহস পাচ্ছেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এত যে স্খলন, নিজেদের মর্যাদাহানি সেখানে হাজারটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও উপস্থাপন করা যেতে পারে, যা শিক্ষকদের সম্মানিত করে রাখার জন্য যথেষ্ট। বিজ্ঞানে, শিক্ষায়, সামাজিক পলিসি নির্ধারণে যাদের নাম আসবে অবশ্যই তারা আমলা কিংবা রাজনীতিবিদ নন, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারের বিভিন্ন নীতি, শিক্ষা ও উন্নয়নের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই সমৃদ্ধ জাতিগঠনের লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। দেশের খনিজসম্পদ রক্ষা, রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলা, জাতিকে নানাভাবে বিশ্বের দরবারে উদ্ভাসিত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মত, ভিন্নমত আর সামাজিক সঙ্কটের বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনায় নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই অবদান রাখছেন। রাষ্ট্র যখন হুমকির সম্মুখীন হয়, অপশাসনে ঢাকা পড়ে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভয়েসই তখন জাতিকে পথ দেখায় বাতিঘরের মতো। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতিবিদদের চেয়েও সমৃদ্ধ, প্রতিশ্রুতিশীল অঙ্গীকার লক্ষ করি তাদের মধ্যে। আমি এখনও অনেক শিক্ষককে দেখেছি, যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উন্নয়নের জন্য বিভাগে, গবেষণা ল্যাবে নিজেদের নিবেদিত করছেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিক বৃত্তিসম্পন্ন জাতিতে রূপান্তরিত করার আশা জাগানিয়া গান শোনাচ্ছেন। বিদেশ বিভুঁইয়ের অনেক সুবিধা-সুযোগ ছেড়ে দেশের মাটি আঁকড়ে থাকছেন। এসবকে তুচ্ছ করে দেখার কি সুযোগ রয়েছে?

রাষ্ট্রের অন্যক্ষেত্রের মেধাবী ও উদ্যমী ব্যক্তিদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তাদের অদম্য কর্মস্পৃহার মাধ্যমে জাতির উন্নয়নকে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য ও জ্ঞানসাধনায় বড়মাপের অবদান রাখছেন তারা। এত অর্জনের পরে তাদের মধ্যে যেটুকু স্খলন দেখি, সেখানে কিন্তু রাষ্ট্র তথা ক্ষমতাসীনদের ভূমিকাই বেশি। আমরা যে বলছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্য নিয়োগ হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের তদবির কি সেখানে থাকছে না? প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া বিশেষভাবে ভর্তি করার জন্য আমলা, রাজনীতিবিদরা ভিসির ওপর চাপ সৃষ্টি করেন না? এসব চাপকে ভিসিদের কেয়ার করতে হয়, সিরিয়াসলি বিবেচনায় আনতে হয়। কারণ তিনিও যে তাদের তদবির করে এ পদে এসেছেন। সম্পর্কটি লেনদেন হওয়ার ফলে সৎবিচার ও ন্যায্য এখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। লেনদেনের এ সম্পর্কটি রাষ্ট্রীয় তরফ থেকেই বন্ধ হওয়া উচিত। গত বছর বিশেক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন তাদের ক’জনইবা পন্ডিত ব্যক্তি? জ্ঞান বিকাশে, সামাজিক উন্নয়নে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুশীল করে তোলার ক্ষেত্রে তাদের কী অবদান আছে? শিক্ষার উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান উৎপাদনের কারখানা বানানোর ইচ্ছা বা দক্ষতা কোনোটি কি সম্মানিত এ ভিসিদের রয়েছে? অথচ শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ এ ব্যক্তিদের। অদক্ষ ও জ্ঞানস্পৃহাহীন নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উৎপাদন ও উন্নয়নের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর গবেষণা ও বিশ্বের জ্ঞানভাবনাকে অভিবাদন জানাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে আরও বেশি নার্সিং করতে হবে। যত্ন-আত্তি করতে হবে। এ দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে। রাষ্ট্র তথা শাসকগোষ্ঠী সংশোধিত হলেই সঙ্কটের সিংহভাগই কেটে যায়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ দায় গ্রহণ করতে হবে সততা ও মহত্ত্বের সঙ্গে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কারিগরি, প্রাযুক্তিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে তাদের নিরলস প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা তথা এশিয়ার অনেক দেশই উন্নয়নের শীর্ষে উঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে তাদের উচ্চতর গবেষণা ও গুণগত মানের শিক্ষা। বাংলাদেশকেও মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে চাইলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, এর গুণগত মানের দিকে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ যেভাবে সঙ্কুচিত করা হচ্ছে তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদানের পাশাপাশি মান নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। সামাজিক সুযোগ-সুবিধায়, অর্থনৈতিকভাবে শিক্ষকদের স্বাবলম্বী করে তোলার পরিকল্পিত গাইডলাইন থাকা জরুরি হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে প্রয়োজন শিক্ষা সেক্টরকে জনগুরুত্বপূর্ণ সেক্টর হিসেবে মূল্যায়ন করা। ৬০’র দশকে এ উপলব্ধি নিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এগিয়ে এসেছিল। এরই অংশ হিসেবে তারা ফিরিয়ে এনেছিল পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাদের বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের। সামাজিক মর্যাদা ও আকর্ষণীয় সম্মানীর বিনিময়ে। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান, মালয়েশিয়ার মাহাথির, কোরিয়ায় পার্ক চ্যাং হি একই কাজ করেছিলেন। আমি দক্ষিণ কোরিয়ার কথা উল্লেখ করতে চাই। অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও কারিগরি উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়া শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম আসে। অসম্ভব দুর্নীতিগ্রস্ত কোরিয়া আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনের শক্তি ছিল নিবেদিতপ্রাণ মেধাবী বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পৃথিবীর কোনো উন্নয়ন কর্মকান্ড নেই যেখানে শিক্ষকদের অবদান নেই। হ্যাঁ, এটা সত্য শিক্ষকদের ওপর এ কাজ অর্পিত। কিন্তু তার সম্মান, সামাজিক মর্যাদার হিস্যাটুকুতে যদি অপমান থাকে, অবনয়ন থাকে তাহলে সেই শিক্ষক সামাজিক অবদানে ভূমিকা রাখতে কতটা উৎসাহিত হবেন? এ প্রশ্নটি নিয়ে আমাদের সবাইকে ভাবা উচিত। বিশেষ করে রাষ্ট্র শাসনের সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের। বিপরীত দিকে শিক্ষকদের দায়ের জায়গাটিকে স্বচ্ছ রাখতে হবে, বিবেকের শাসনের মধ্যে আনতে হবে। অন্যায়ভাবে সহকর্মীর প্রমোশন ঠেকানো, অর্পিত দায়িত্ব পালনে ফাঁকিবাজি মানসিকতার বিস্তরণ, রাজনীতির নামে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সৃষ্টি এসব অসৎ কর্মের বিরুদ্ধে শিক্ষকদেরই দাঁড়াতে হবে।

শিক্ষকদের আত্মপ্রচেষ্টার পাশাপাশি রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষকের গুণগত মান বৃদ্ধিতে আরও আন্তরিক হওয়া। তাদের জন্য বহমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে গবেষণা, বৈজ্ঞানিক অবদান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা এসব কিছুকে উৎসাহিত করা। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড রাখা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষক অবদান রাখবেন তাদের দলমত নির্বিশেষ সম্মাননা ও স্বীকৃতি প্রদান করা। প্রকৃত সত্য হলো, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। দুই পক্ষের দায় মেটানোর মধ্য দিয়েই সম্ভব জাতীয় উন্নয়নে এগিয়ে আসা। এ কারণে আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের দায় আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব একই সুতায় গাঁথা, এদের বিচ্ছিন্ন করে দেখা আত্মঘাতী।

ড. আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া : অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা