বাংলাদেশ, , শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

উপজেলার স্বায়ত্তশাসন কতদূর?

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-২৩ ১৬:৪৮:২৩  

সালাহ উদ্দিন টিপু

 সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থার একেবারে নিচের দিকে হলেও দেশের সার্বিক উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন বা পরিষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং কার্যকর করা এখন অনেকটাই সময়ের দাবি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনমান উন্নীতকরণসহ নানা ইস্যুতে উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করতে পারলে সামগ্রিকভাবে দেশের চেহারাটাই বদলে যাবে। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি, উন্নত দেশগুলোর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে তালমিলিয়ে বাংলাদেশের উপজেলা পরিষদকেও শক্তিশালী করা সম্ভব। ১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের অধীনে এক সফরে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, স্পেন ও পর্তুগাল ভ্রমণের সুযোগ হয়। আমি ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বেশ ক’জন কর্মকর্তা এ সফরে অংশ নেন। প্রায় ১৭ দিনের সফরে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশগুলোর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও উন্নয়ন অবলোকন করে নিজের এলাকায় তার বাস্তবায়নের চেষ্টা বা শিক্ষা নেয়া। সেক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতনতা, জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যটন ও ব্যবসার বিকাশ, রাজস্ব প্রদানে স্বচ্ছতাসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে এসব দেশের তারতম্য রয়েছে। শুরুতেই নাগরিক সচেতনতার বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, স্পেন ও পর্তুগাল পাঁচটি দেশে থাকাকালীন সেখানকার নাগরিকদের কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির খবর আমাদের চোখে পড়েনি। যে নাগরিক গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি লেন-লাইন মেনেই ঠিকমতো গাড়ি চালাচ্ছেন। কোথাও ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে বা পুলিশ আটকালে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই চলে যাচ্ছেন। নাগরিকদের সচেতনতার বিষয়ে যখন কথা, তখন আরেকটি বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন, তা হলো পাঁচ দেশের নাগরিকদের পরিবেশ সচেতনতা। তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যেকটি আধুনিক দেশের কোথাও এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি যে, যেখানে সবুজ প্রকৃতি নেই। সবখানে চোখ জুড়ানো নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। সেখানকার প্রত্যেক নাগরিক পরিবেশ-প্রতিবেশকে নিজেদের করে নিয়েছেন বলেই এমন হয়েছে। রাস্তার ধারে, বাড়ির সামনের উঠোনে, দেয়ালে কিংবা বহুতল ভবনের ছাদে সবুজের সমারোহ আসলেই চোখে পড়ার মতো। এখানেই নাগরিকদের সচেতনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর যদি বলি জনসংখ্যার কথা। এক্ষেত্রেও প্রধান সমস্যা সচেতনতা। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল দেশে শিক্ষাই জনসমস্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার একমাত্র উপায়। এক্ষেত্রেও শুরুটা হতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে। শক্তিশালী উপজেলা প্রশাসন কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে তৃণমূলে শিক্ষার প্রসার আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে। উপজেলা পর্যায়ে আমরা এখনও বিনোদনের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এক্ষেত্রে পর্যটন ব্যবস্থা বড় সহায়ক হবে। পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শুধু বিনোদন নয়; আর্থিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন হবে। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায়, তারা শুধু প্রধান শহরে নয়; গ্রাম অঞ্চলেও পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ হতে পারে সুইজারল্যান্ড। আধুনিক ও স্বাতন্ত্রিক উপজেলা কাঠামো গঠন করতে হলে অবশ্যই রাজস্ব প্রদান ব্যবস্থা উপজেলার আয়ের বড় উৎস হবে। এক্ষেত্রেও আমাদের নাগরিকদের রয়েছে সচেতনতার অভাব। তার চেয়ে ঢের বেশি রাজস্ব প্রদানে অনাগ্রহ। এসবকে ছাপিয়ে গেলে সত্যিই হয়তো সম্ভব হবে তৃণমূলে শক্তিশালী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন। এক্ষেত্রে আমাদের গণতন্ত্র ব্যবস্থাও সুসংহত হবে। মূলত আমাদের দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা সঠিক পথে না এগুনোর কারণে আমরা বারবার ব্যাহত হচ্ছি। কেননা গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুইটিই পরস্পরের সম্পূরক। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আসলে একটি কলোনিয়াল এবং আমলাতন্ত্রের হাতে বন্দি। এ আমলাতন্ত্রের সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রয়োজন। যেখানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্বাধীনও করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজেদের মতো করে কাজ করতে দিতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিরা শক্তিশালী হলে স্থানীয় উন্নয়ন ও অংশীদারিত্বে তারা এগিয়ে যাবেন, আর পিছিয়ে পড়বে দুর্নীতি, দারিদ্র্যের মতো নেতিবাচক বিষয়। আমাদের বক্তব্যই তা উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হলে এর গঠনকাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানদের নির্বাহী ক্ষমতা দিতে হবে। উপজেলা পরিষদকে উপজেলার সব কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। উপজেলা হবে উন্নয়নের জ্যোতিকেন্দ্র। মূল কথা, পৃথিবীর কোনো দেশেই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া উন্নয়নের কোনো নজির নেই। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি, মাটি, মানুষ ও আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্বশাসিত ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সালাহ উদ্দিন টিপু : লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান

পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা