শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

অবরোধ ও অকার্যকর আন্দোলনে বছর পার

অবরোধ ও অকার্যকর আন্দোলনে বছর পার

অনলাইন বিজ্ঞাপন

আলোকিত কক্সবাজার ডেক্স

বিদায়ী বছরের শুরুতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে গুলশানে নিজ কার্যালয়ে আটকা পড়েন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ থাকা অবস্থায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন তিনি। ঘোষিত ওই অবরোধ কর্মসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা না হলেও বর্তমানে এর কোন কার্যকারিতা নেই ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিএনপি। ওইদিন কালো পতাকা মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। এর দুই দিন আগে গুলশান নিজ রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। পরে ৫ জানুয়ারি সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন। প্রথম তিন মাস কার্যকরভাবেই চলে অবরোধ। সেই অবরোধ এখনো চলছে। তবে খালেদা জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন অবরোধের কোনো কার্যকারিতা এখন আর নেই। তারপরও আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়নি।

এদিকে অবরোধের পাশাপাশি দফায় দফায় হরতাল দিয়েও দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয় বিএনপি। ৫ এপ্রিল খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পর চলমান আন্দোলনে গতি হারায় দলটি। পরবর্তী সময়ে দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দিলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দলটি।

প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষাত দেননি খালেদা

নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর খবর পান খালেদা জিয়া। ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মারা যান কোকো। ওই রাতেই খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানতে গুলশান কার্যালয়ের সামনে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুত্র শোকে কাতর খালেদা জিয়া ঘুমিয়ে ছিলেন, তাই প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাত পাননি। কিছুক্ষণ কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষা করে ফিরে আসেন তিনি।

পুনর্গঠনের লক্ষ্য সফল হয়নি

সারাদেশে দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গত ৯ আগস্ট ৭৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কেন্দ্র থেকে চিঠি পাঠায় বিএনপি। এর মধ্যে ৫ মাস পার হয়ে গেলেও দল পুনর্গঠনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে আছে স্থবিরতা, অঙ্গ-দলগুলো এলোমেলো। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর বিএনপিও নিষ্কিয়। রাজপথ আন্দোলনে কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি তারা। ওয়ার্ড, থানা কমিটিসহ কেন্দ্রীয় কমিটিও পূর্ণাঙ্গ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা।

অবরুদ্ধ খালেদার ৯২ দিন, বিদেশে ২ মাস

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকেন খালেদা জিয়া। টানা ৯২ দিন অবরুদ্ধ ছিলেন তিনি। এ সময় তার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডিশ, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপরও খালেদা জিয়া বাসায় ফিরে যাননি।

এ ছাড়া শারীরিক চিকিৎসার জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে খালেদা জিয়া লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। প্রায় দুই মাস পর লন্ডন থেকে ২১ নভেম্বর বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে তিনি দেশে ফিরেন। এ সময় ওইখানে তিনি বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে ঈদ উদযাপন করেন।

মামলার চাপে ফেরারী নেতাকর্মীরা

নাশকতার একাধিক মামলা থাকায় বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই এখনো ফেরারী হয়ে আছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, সেলিমা রহমান, যুগ্ম-মহাসচিব রবকত উল্লাহ বুলু, ঢাকা মহানগরের মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও আজিজুল বারী হেলাল। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল অন্যতম। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

২০১৫ সালের ৮ জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

শমসের মবিনের সরে যাওয়া

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী হঠাৎ করেই সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। গত ২৯ অক্টোবর তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।

এ ছাড়া ১৫ নভেম্বর বিএনপি থেকে আরও একজন পদত্যাগ করেন। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এম শাহরিয়ার রুমী বিএনপির সব পদ থেকে ইস্তফা দেন।

কূটনৈতিক লবিংয়ে ব্যর্থতা

গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন কথা তুলেও এ বছরে তেমন কোনো আলোচনা ছিলেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, ওসমান ফারুক, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ কূটনীতিকদের নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু এ বছর উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি।

সফলতা বলতে, চলতি বছরের ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ১৫ মিনিট একান্তে কথা হয়।

অর্থ কষ্টে বিএনপি

চলতি বছরে বিএনপি কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থ সঙ্কটে পড়ে। দলীয় তহবিল শূন্যের কোটায় নেমে আসে। গত ২৪ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে চলতি বছরে দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয় দলটি। এতে দেখা যায়, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে চলতি বছরে।

ওইদিন দলের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল কমিশনের সচিব মো. সিরাজুল ইসলামের কাছে এ হিসাব জমা দেন।

আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়ে বিএনপির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এ কে এম আমিনুল হক সাংবাদিকদের জানান, ১ জানুয়ারি-২০১৪ থেকে ৩১ ডিসেম্বর-২০১৪ পর্যন্ত দলের মোট আয় হয়েছে দুই কোটি ৮৭ লাখ ৪৮ হাজার ৫৭৪ টাকা। ব্যয় হয়েছে তিন কোটি ৫৩ লাখ তিন হাজার ৫৯০ টাকা, অর্থাৎ ৫৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৬ টাকা ব্যয় বেশি হয়েছে। এই অতিরিক্ত টাকা গত বছরের ব্যাংক হিসাব থেকে মেটানো হয়েছে।

সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ফলাফল শূন্য

চলতি বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিবার্চনে অংশ নেওয়ার কথা বললেও মাঝপথে সরে দাঁড়ায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। ফলে খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হলে দলীয় সমর্থিত প্রার্থীদের। সিটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, কারচুপির অভিযোগ তুলে মাঝপথে সরে দাঁড়ায় বিএনপি।

পৌর নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি

উপজেলা নির্বাচন, সিটি নির্বাচনে অংশ নিলে সংসদীয় কোনো উপ-নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দলটি। ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় জন্য মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তুতি চলছে। দলীয়প্রধান নেতাদের সেইভাবে মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এই নিয়ে খালেদা জিয়ার দলের স্থায়ী কমিটি, সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। দলের নেতাও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

নেতারা যা বলেন গত এক বছরের বিএনপির সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে জানতে চাইলে— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘একটি বছর গোটা বাংলাদেশ দুর্যোগের মধ্যে ছিল। আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে আমরা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি দল। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি, এটা আমাদের অর্জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আশা করি এখানেও অর্জনের কিছু আছে। তাই বছরের শেষে এটাকেও আশার আলো হিসেবে দেখছি।’
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আহমদ আহম খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সরকারের এত অত্যাচার নির্যাতন, গুম, হত্যা, মামলা-হামলার পর আমরা পৌর নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পেরেছি। শুধু তাই নয়, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরা ৮০ ভাগ পৌর সভায় বিজয়ী হব।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি ব্যর্থ হয়নি। সকল ব্যর্থতা সরকারের। তারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করে আছে। শুধু বিএনপিকে নয়, জনগণকে বঞ্চিত করেছে সরকার। আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। আগামী দিন সাফল্য আমাদের আসবেই।

দ্য রির্পোট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM