বৃহস্পতিবার, ২৫ Jul ২০২৪, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন

কক্সবাজারে পাহাড়ে ঝুঁকিতে বাস করছে তিন লাখাধিক মানুষ

কক্সবাজারে পাহাড়ে ঝুঁকিতে বাস করছে তিন লাখাধিক মানুষ

অনলাইন বিজ্ঞাপন

ফাইল ছবি।

 

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল।।

কক্সবাজার শহর ও একাধিক উপজেলায় পাহাড় কেটে বা পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করছে প্রায় তিন লাখাধিক মানুষ। প্রতি বর্ষার শুরুতে ঝুঁকিতে বাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করে দায়িত্ব শেষ করে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিভিন্ন সময় পাহাড় ধসে অনাকাংখিত প্রাণহানীর ঘটনা ঘটছে। গেল ২০১৫ সাল হতে চলতি বছর পর্যন্ত সময়ে পাহাড় ধসে কক্সবাজারে ৫২ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার (২১ জুন) ভোররাতে কক্সবাজার শহরের বাদশাহঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে স্বামী-স্ত্রীর করুণ মৃত্যু হয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধ করা না গেলে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি পাহাড় ধসে মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র মতে, ২০১৫ সাল হতে চলতি বছর পর্যন্ত সময়ে পাহাড় ধসে কক্সবাজারে ৫২ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। তৎমধ্যে ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০১৬ সালে ৫ জন, ২০১৭ সালে ৪ জন, ২০১৮ সালে ৫ জন, ২০১৯ সালে ৪ জন, ২০২১ সালে ১২ জন, ২০২২ সালে ৫জন।

চলতি মাসের ১৯ জুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং ২১ জুন কক্সবাজার শহরের বাদশাহ ঘোনা এলাকায পাহাড় ধসের ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়। তবে, ২০২০ ও ২৩ সালে পাহাড় ধসে কতজন মারা গেছেন এমন কোন তথ্য জেলা প্রশাসনে সংরক্ষিত নেই। আর চলতি বছরের এ সময় পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু রেকর্ড করেছে তারা। সে হিসেবে গত ৯ বছরে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে, পাহাড় ধসের আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। এইদিন জেলাব্যাপী পাহাড় ধসের ঘটনায় সেনা বাহিনীর ৬ সদস্যসহ ৫২ জনের মৃত্যু হয়। পাহাড় কেটে ঢালুতে বাস করার কারণে এমন দূর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন ওয়াকিবহাল মহল।

কক্সবাজার বন বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি সময় পর্যন্ত জেলায় ৪৭ হাজার ৯১৪ দখলদারের হাতে ধ্বংস হয়েছে ২৫ হাজার ৭ দশমিক ৬৯ একর বনভূমি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস করছে কক্সবাজার পৌরসভায়। পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডে পাহাড় কেটে বাস তাদের। বর্ষা আসলেই ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদের হুমকি দেয় প্রশাসন। কিন্তু উচ্ছেদ তো দুরের কথা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেয়া হয় না। অনাকাংখিত মৃত্যু এড়াতে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের কয়েকজনকে সরিয়ে নিয়ে দায় সারা হয়। এরপর আর কোন বিকল্প কাজ করা হয় না।

একইভাবে চকরিয়া, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া এবং মহেশখালীতেও পাহাড় কেটে ঝুঁকির বাস বাড়ছে। রয়েছে রামু-নাইক্যংছড়ির বাইশারী সীমান্তেও। অনেক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে পাহাড় কেটে আশপাশের বসতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে, ভারি বর্ষণ হলে যেকোন সময় পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশংকা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি সাংবাদিক এইচ এম এরশাদ বলেন, প্রতি বছর জেলায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুধু বর্ষা এলেই শুরু হয়। তাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। সুষ্কমৌসুমে আর কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনা। ফলে অনেকটা বাধাহীনভাবে পাহাড় নিধন করে টাকার বিনিময়ে বসতির ব্যবস্থা করে দেয় প্রভাবশালীরা। এতে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি অনাকাংখিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাই পাহাড় কাটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ দায় এড়ানো অসম্ভব।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারের পাহাড় ও ইসিএ সংরক্ষণে উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন হলে প্রতিবছর এত প্রাণহাণির ঘটনা ঘটত না। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা কেউ নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেনা।

বরাবরের মতোই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে বলে দাবি করেছে জেল প্রশাসন। একই সাথে পাহাড়ের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয়ার কথাও বলছে সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, পৌরসভার অভ্যন্তরে ৫টি ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঝুঁকিতে বাস করছে। শহরের ভেতর যেসব এলাকায় পাহাড় রয়েছে তা দখল করে খন্ড-খন্ড কেটে উপরে বা পাদদেশে বাস করছে হাজারো পরিবার। তাদের সরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রসেস। তারপরও ঝুঁকি এড়াতে কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি জরুরি সভার পর সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের প্রধান করে একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়। কি পরিমাণ মানুষ ঝুঁকিতে বাস করছে তার সঠিক তালিকা তৈরিতে কয়েকটি এনজিও সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান, পাহাড় ধসে মৃত্যু রদে জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় কাটা বন্ধ করতে জনগণকে অনুরোধ জানিয়ে বেশি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন ডিসি।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM