বৃহস্পতিবার, ২৫ Jul ২০২৪, ১০:১০ অপরাহ্ন

দেশে ফিরে কারাগারের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন তারা

দেশে ফিরে কারাগারের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন তারা

অনলাইন বিজ্ঞাপন

 

 

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল।।

মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি থাকা ১৭৩ জন বাংলাদেশী নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন। বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে তাদের বহন করা একটি মিয়ানমারের জাহাজ থেকে তাদের কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডাব্লিউটিএ ঘাটে নিয়ে আসা হয়। দেশে ফিরে এসে কারাগারের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন তারা। ফিরে আসা এসব বাংলাদেশীদের সিংহভাগই দালালের খপ্পরে পড়ে উন্নত জীবনের আশায় কেউ হেঁটে, আবার কেউ সাগর পথে মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর হাতে আটক হয়ে তাদের অবস্থান হয় কারাগারে। এদিকে যে জাহাজে বাংলাদেশি বন্দিরা এসছেন সেই জাহাজেই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাবেন রাখাইনে চলমান সংঘাত হতে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২৮৫ জন মিয়ানমার বিজিপি ও সেনা সদস্যরা।

ফেরত আসা বাংলাদেশী নাগরিক উখিয়ার মনখালী গ্রামের বদিউল আলমের ছেলে সালা উদ্দিন ও একইগ্রামের শাহ আলমের ছেলে মো: ফারুখ জানায়, মিয়ানমার কারাগারে তাদের উপর চালানো হতো নিয়মিত নির্যাতন। দিনে এক বেলা খাবার দেয়া হতো, তা-ও আবার খাওয়ার অনুপযোগী। কোন কথা বলা যায়না। বললেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হতো। এভাবেই অন্ধকারে কেটেছে আমাদের দশটি বছর।

তারা আরও বলেন, মিয়ানমারের কারাগারে আরও অনেক বাংলাদেশী কারাগারে বন্দি রয়েছে। এদের বেশির ভাগই সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে কারান্তরিণ। তারাও ফিরে আসার আকুতি জানিয়েছেন।

এরআগে মঙ্গলবার সকালে মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দর থেকে তাদের নিয়ে মিয়ানমারের একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। জাহাজটি বুধবার সকালে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় পৌঁছান। উক্ত জাহাজ থেকে বাংলাদেশী জাহাজে করে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর মোহনায় নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে পৌঁছলে ১০জন করে দলবদ্ধ ভাবে তাদের জাহাজ থেকে নামিয়ে ঘাটে তৈরী প্যান্ডেলে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় বিজিবি এবং পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ছিলো বিআইডাব্লিউটিএ ঘাট এলাকা। নিখোঁজের দীর্ঘদিন পরে প্রিয়জনকে ফিরে পেয়ে আবেগ আফ্লুত হয়ে উঠেছেন স্বজনরা।

জেলা প্রশাসন সূত্র মতে, মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা ১৭৩ জনের মাঝে ১২৯ জনের বাড়িই কক্সবাজারে। বাকিদের মাঝে ৩০ জন বান্দরবানের, ৭ জন রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ির। এছাড়াও নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, নরসিংদী ও নীলফামারী জেলার রয়েছে একজন করে। ফেরত আসা ১৭৩ জনের মধ্যে ১৪৪ বাংলাদেশি বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে মিয়ানমারে বন্দি ছিলেন। তাদের সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে আগেই। বাকি ২৯ জনের সাজার মেয়াদ শেষ না হলেও এই ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের সময় তাদেরকে বিশেষ ক্ষমার আওতায় আনা হয়। বিকেল চারটা নাগাদ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও যাদের স্বজনরা আসেনি তাদের জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। সেখান হতেই তাদের ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে।

উখিয়ার পালংখালী মধ্যম ফারিরবিল এলাকার ফরিদা খাতুন বলেন, আমার ছেলে আরফাত হোসন (২০) অটোরিকশা চালাত। দালালের খপ্পরে পড়ে ১৪ মাস আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। ৯ মাস পরে তার চিঠি পেয়ে নিশ্চিত হয়েছি সে মিয়ানমারের কারাগারে রয়েছে। নিকট আত্নীয়ের মাধ্যমে খবর পেয়েছি মিয়ানমার থেকে তাদের আনা হচ্ছে। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি।

কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং বাজার এলাকার বাসিন্দা হাসান আলী বলেন, ‘ছেলে রিদুয়ানকে (১৯) আমি মুরগী ও মাছের খামার করে দিয়েছিলাম। সেসব নিয়ে তার ভালো মতোই দিন কাটছিল। কিন্তু অকস্মাৎ একদিন ছেলে আমার উধাও! সব জায়গায় খুঁজেও তারে আর পাচ্ছিলাম না। তার শোকে কাতর হয়ে উঠে মা-ভাই-বোনসহ অন্য স্বজনরা। আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, ছেলেকে আর ফিরে পাবো না। এভাবে কেটে যায় এক বছর। হঠাৎ বিদেশী একটি নাম্বার থেকে কল আসে। ও প্রান্ত থেকে রিদুয়ান বলছিল সে মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি। মালয়েশিয়া যাবার পথে আটক হয়েছিল সেসহ আরো বেশ কয়েকজন। কবে ফিরতে পারবে সেটা অনিশ্চিত ছিল। কিন্তু দৈবক্রমে বন্দি সময়ের ১৮ মাসের মাথায় আজ (বুধবার) ফিরে এসেছে রিদুয়ান। তারে পেয়ে মনে হলো, জীবনের ডুবে যাওয়া সূর্য মেঘমুক্ত আকাশে আবার উদিত হয়েছে। সরকারের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।’

এদিকে, নানা ভাবে নিখোঁজ প্রিয়জন ফিরছে জেনে তাদের কাছে পেতে বুধবার সকাল থেকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট এলাকায় অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন পিতা-মাতা-ভাইবোনসহ নিকট স্বজনরা।

সেখানে কথা হলে-টেকনাফের হ্নীলার খারাংখালীর বাসিন্দা ছেনোয়ারা বেগম বলেন, ১২ বছর আগে আমার ভাই খোরশেদ আলম (৩০) নিখোঁজ হন। মঙ্গলবার খবর পেয়েছি মিয়ানমার কারাগার থেকে অনেক বাংলাদশিকে আনা হচ্ছে। তাই ভাইয়ের জন্য অপেক্ষায় আছি। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে শোকে আমার মা মারা গেছেন। একযুগ পর ভাইকে ফিরে পেয়ে আমরা আবেগআপ্লুত।

টেকনাফের বাহারছরার হাজমপাড়ার নুরুল ইসলামের ছেলে নুরুল আলম বলেন, আমার ছেলে নুরুল আলম (২০) দালালের খপ্পরে পড়ে প্রায় দুই বছর আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। ৯ মাস পরে তার চিঠি পেয়ে নিশ্চিত হয়েছি সে মিয়ানমারের কারাগারে রয়েছে। নিকট আত্নীয়ের মাধ্যমে খবর পেয়েছি মিয়ানমার থেকে তাদের আনা হচ্ছে। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি।

এদিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তারা বিভিন্ন সময় মিয়ানমারে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়েছিলো। যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়ার পরই তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। যে জাহাজে বাংলাদেশি বন্দিরা এসছেন সেই জাহাজেই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাবেন রাখাইনে চলমান সংঘাত হতে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা ২৮৫ জন মিয়ানমার বিজিপি ও সেনা সদস্যরা।

সোমবার প্রধানমন্ত্রীর থাইল্যান্ড সফর নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, কারান্তরিণ বাংলাদেশিদের নিয়ে যে জাহাজটি দেশে পৌঁছাবে তাতে করেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM