শনিবার, ১৩ Jul ২০২৪, ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন

বদলে যাওয়া কুতুবদিয়া

বদলে যাওয়া কুতুবদিয়া

অনলাইন বিজ্ঞাপন

ছবি সংগ্রহীত।

 

 

কক্সবাজারে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কুতুবদিয়া দ্বীপ। বাতিঘর হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপে স্বাধীনতার পর থেকে ছিল না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল জাতীয় গ্রিড থেকে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। এতে মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রেও। তবে ব্যবসায়িক চিন্তা ও দ্বীপের মানুষের চাহিদা- এই দুইয়ে মিলে দ্বীপের মানুষের ব্যতিক্রমী একটি পণ্য ‘আইসক্রিম’ এর চাহিদা পূরণ হলো স্বাধীনতার ৫২ বছর পর। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাঁচ ও ১০ টাকার আইসক্রিম বিক্রি হলেও কোনো বহুজাতিক কোম্পানির ভালোমানের আইসক্রিমের দেখা মিলতো না কুতুবদিয়া দ্বীপে।

১৯৮০ সালে জেনারেটরের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ গ্রাহকের মধ্যে সান্ধ্যকালীন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা হয় কুতুবদিয়ায়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুতের খুঁটি ভাঙায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময় স্বল্প আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় এখানে ফ্রিজের ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয়ভাবে তৈরি স্বল্প সংখ্যক সাধারণ আইসক্রিম মাঝে মাঝে পাওয়া গেলেও ভালোমানের কোনো কোম্পানির আইসক্রিম এই দ্বীপে আসতো না। ফলে শিশুসহ সববয়সী মানুষের জন্য প্রিয় একটি পণ্য আইসক্রিম খাওয়া ছিল দ্বীপের মানুষের কাছে দুঃসাধ্য বিষয়।

২০২০ সালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার ‘হাতিয়া দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ ও কুতুবদিয়া দ্বীপ শতভাগ নির্ভরযোগ্য ও টেকসই বিদ্যুতায়ন’ প্রকল্প হাতে নেয়। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে স্বাভাবিক লাইন নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো সুযোগ না থাকায় সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবহার করা হয়। এটি ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনতে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছিল। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি থেকে মগনামা ঘাট পর্যন্ত ৩৩ কেভি রিভার ক্রসিংসহ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান থেকে সাগরের তলদেশে ফাইবার অপটিকসহ পাঁচ কিলোমিটার ডাবল সার্কিট সাবমেরিন লাইন নির্মাণের মাধ্যমে কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ দিতে কুতুবদিয়ায় নির্মিত হয়েছে দুই কিলোমিটার বিতরণ লাইন।

দ্বীপটির প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে প্রায় দুই লাখ মানুষ বসবাস করেন। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও এখানকার মানুষ ছিল অবহেলিত। কিন্তু বর্তমান সরকার জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ায় বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে ওঠা কুতুবদিয়ায় পরিবর্তনের পাশাপাশি তাদের আইসক্রিম খাওয়ার মতো একটি পণ্যের চাহিদাও মিটিয়েছে এই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। জীবনে প্রথম আইসক্রিম দেখেছেন অনেকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ আসবে এটা অকল্পনীয় ছিল। এই এলাকার মানুষ জন্মের পর থেকে ভালো একটা আইসক্রিম খেতে পারতো না। বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন কোম্পানির কোনো আইসক্রিম এই দ্বীপে আসতো না। কেউ কেউ কখনো যদি আনতো তাও সাগরের চ্যানেল পার হয়ে কক্সবাজার থেকে আনতে হতো।

কুতুবদিয়া বড়ঘোপ বাজারের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম ছোটন। ৩০০ থেকে ৩৫০ দোকানের বাজারটিতেই নয়, কুতুবদিয়া দ্বীপে আইসক্রিমের প্রথম ডিলার তিনি। ‘সেবয়’ নামক একটি কোম্পানির ডিলার নিয়ে আইসক্রিমের ব্যবসা করছেন ছোটন। গত জুন মাসে ১০ লাখ টাকার আইসক্রিম বিক্রি করেছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হয় তার। আগে বাজারের সাধারণ একজন দোকানি থেকে এখন আইসক্রিম ব্যবসার বড় ডিলার। জাগো নিউজকে ছোটন বলেন, মে মাসের ২ তারিখে আমি এই আইসক্রিম দোকানে তুলি। কুতুবদিয়ার মানুষ আগে কখনো এই আইসক্রিম দেখেনি। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হয়। খুচরা ক্রেতারাও আসেন আইসক্রিম কিনতে।

কথা বলতে বলতেই বাচ্চাকে নিয়ে নুরুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা আসেন আইসক্রিম কিনতে। আইসক্রিম কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমার বাচ্চাটা আইসক্রিম খুবই পছন্দ করে। তাই কিনতে এলাম। আমরাও পাঁচ টাকা ১০ টাকা দামের আইসক্রিম অনেক খেয়েছি, কিন্তু ভালো কোম্পানির আইসক্রিম ছিল না এই এলাকায়। আগে এই আইসক্রিম চট্টগ্রামে দেখেছি আর এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছে।

এদিকে ছোটনের দেখাদেখি স্থানীয় আরও দুই ব্যবসায়ী এই আইসক্রিম ব্যবসায় নেমেছেন। তাদেরও মাস শেষে বিক্রি হয় আট থেকে ১০ লাখ টাকার আইসক্রিম। স্থানীয় দোকানিরা তাদের কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে বিক্রি করেন মানুষের কাছে।

কুতুবদিয়া বড়ঘোপ বাজার কলেজের মুদি দোকানি মো. আজিজ মিয়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ডিপফ্রিজে ছয় ঘণ্টা ঠান্ডা করে কোমলপানীয় বিক্রি করলেও কোনোদিন আইসক্রিম বিক্রি করেননি এই ব্যবসায়ী। কারও প্রয়োজন হলে কক্সবাজারে সমুদ্রের চ্যানেল পার হয়ে আইসক্রিম খেতে হতো। বর্তমান সরকার সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে কুতুবদিয়া দ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ায় আজিজের মতো মুদি ব্যবসায়ীরও যেন কপাল খুলেছে।

মো. আজিজ বলেন, গত তিন মাস ধরে আইসক্রিম বিক্রি করছি। যেদিন প্রথম আইসক্রিম বিক্রি শুরু করে, সে দিন ১৭ হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি করেছি। এখন দৈনিক সাত থেকে আট হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হয়।

তিনি আরও বলেন, আগে জেনারেটরের বিদ্যুৎ দিয়ে ডিপফ্রিজে স্পিড, টাইগার, কোকাকোলা, সেভেন আপ বিক্রি করতাম। কারণ ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল। সন্ধ্যা ৬টায় দিলে রাত ১১টা কিংবা ১২টা পর্যন্ত থাকতো। এখন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। আইসক্রিম বিক্রিতেই আমাদের ভাগ্য ঘুরেছে।

কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ বাজারে ব্যবসায়ী লিটন বলেন, কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ আসবে এটা অকল্পনীয় ছিল। আইসক্রিম পাওয়াটাও আমাদের কাছে দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু এখন সবই সম্ভব হয়েছে।

কুতুবদিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপঙ্কর তঞ্চঙ্গ্যা জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পাওয়ার পর থেকে এই এলাকার মানুষের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। যেটা স্বাধীনতার পর থেকে ছিল না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার পর থেকে এখানে এখন দুটি ফ্রিজের দোকান হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির আইসক্রিম আগে এই দ্বীপে বিক্রি হতো না। গত দুই মাস ধরে ছোটবড় সব বাজারেই এসব আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে।

সূত্র-জাগোনিউজ


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM