বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ইসলামী অর্থনীতির কেন প্রয়োজন

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ইসলামী অর্থনীতির কেন প্রয়োজন

অনলাইন বিজ্ঞাপন

 

 

মুফতি শাহেদ রহমানী

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আর ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত জুড়ে দিয়েছেন হালাল রিজিক। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে রাসুলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকাজ করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৫১)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা বাকারা : ১৭২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়াতদ্বয় উল্লেখ করার পর এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলিমলিন। সে আসমানের দিকে হাত উঁচু করে বলে, হে আমার প্রভু, হে আমার প্রতিপালক, অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম। এ অবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে! (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৮৯)

এর দ্বারা বোঝা যায়, মানুষের ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য জীবিকা হালাল হওয়া প্রয়োজন। আর জীবিকা হালাল হওয়ার জন্য উপার্জন হালাল হতে হবে। পৃথিবীর সব মানুষ কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক কার্যাবলির সঙ্গে জড়িত। ইসলামী অর্থনীতি মানুষের ইসলামী জীবন ব্যবস্থার এক অপরিহার্য অংশ। ইসলামী অর্থনীতি ইসলামী আদর্শ, জীবন দর্শন ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ইসলামী অর্থনীতি মানুষের সকল প্রকার সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান ও স্থায়ী কল্যাণ সাধন করতে পারে। এ জন্য সমাজে পরিপূর্ণ শান্তি ও আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

সোনালি যুগে ইসলামী অর্থনীতির পাঠ : নবীজি (সা.) ছিলেন মানবজাতির সর্বোত্কৃষ্ট শিক্ষক। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কার আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর ঘরকে শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সেখানে সাহাবিরা নবীজি (সা.)-এর কাছে যাবতীয় প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এ ছাড়া মুসলিমরা পরস্পরকে শিক্ষা দিত। ইসলামী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের আগেই সেখানে একজন দক্ষ শিক্ষক পাঠিয়ে দেন। হিজরতের পর তিনি নিজে সেখানে ‘সুফফা’ নামক একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের শরিয়তের বিধি-বিধান শেখাতেন। (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ২/২৮)

নবীজি (সা.)-এর যুগে ইসলামী শিক্ষার যে বিস্তার ঘটেছিল ইসলামী অর্থনীতিও তার অংশ ছিল। এ ছাড়া হাটবাজারের নিয়মিত লেনদেন ও যেকোনো বিশেষ লেনদেন কিভাবে করতে হয়, তা সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে জেনে নিতেন। ইসলাম আসার আগে সমাজে যত লেনদেন প্রচলিত ছিল ইসলাম আসার পর ধীরে ধীরে তার কিছু পদ্ধতি নিষিদ্ধ হয়, কিছু সামান্য সংশোধন করে চালু রাখা হয়। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ইসলামী অর্থনীতির পাঠদান সম্পন্ন হয়।

আধুনিক সময়ে ইসলামী অর্থনীতি : বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনমাত্রার মান যেমন উন্নত হয়েছে, মানুষের চিন্তার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রযুক্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। নতুন নতুন উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার সৃষ্টি হচ্ছে। বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ইসলামী অর্থনীতির নতুন নতুন ক্ষেত্র, আধুনিক প্রয়োগ, সমকালীন জীবনব্যবস্থার নানামুখী চ্যালেঞ্জ ইসলামী অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক শিক্ষাকে আরো বেশি গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন কেন : বর্তমান যুগে যেকোনো শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি গড়ে নিতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে। যদি তা না হয়, তবে মৌলিক শিক্ষায়ই যথেষ্ট দুর্বলতা থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। যা মানুষ জ্ঞানের জগতে এবং কর্মক্ষেত্রে বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারে না। যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া কেউ ভালো চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হতে পারে না। অর্থনীতির বিষয়টিও অনুরূপ।

যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তার শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করে নেয়, তখন চেষ্টা ও গবেষণার মাধ্যমে সে বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলামী পদ্ধতিতে পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিভিন্ন অভিযোগগুলো ওঠে। এর অন্যতম কারণ হলো, সে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামী অর্থনীতিতে দক্ষ ও সচেতন জনবলের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ আগ্রহ ও বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারা তৈরীকৃত নির্ভুল নীতিমালা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা প্রয়োগ করা যায় না। তাই ইসলামী অর্থনীতির মতো সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে বর্তমান যুগে অর্থনীতি বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অপরিহার্য।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার ক্ষতি : ইসলামী অর্থনীতির মাসআলাগুলো খুব সূক্ষ্ম। পরিভাষাগুলো বোঝা ও মনে রাখা সাধারণ কারো পক্ষে দুষ্কর। তাই এ বিষয়ে পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জন না করে এ অঙ্গনে কাজ করতে গেলে পদে পদে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। একটি ভুল মাসআলা প্রয়োগের কারণে ব্যক্তি শুধু নিজে পাপে লিপ্ত হয় না; বরং বহু মানুষকে হারামে লিপ্ত করার আশঙ্কা থাকে।

ফকীহুল মিল্লাত (রহ.)-এর সুদূর প্রসারী চিন্তা : ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ আলেম। তিনি যখন দেখলেন যে ব্যাংকিং সেক্টরসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের চাহিদা বাড়ছে। দিন দিন এই সেক্টরে মানুষের নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, প্রতিদিন অর্থনীতির নতুন নতুন শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর পরিধি হু হু করে বাড়ছে, তখন তিনি ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে ব্যাপক গবেষণার প্রচলন ঘটানো ও উম্মাহর এসংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়েলের সমাধান দিতে সক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি করতে ‘সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস জাতির বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বহু আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজন করেছে, যেখানে উপমহাদেশের বিজ্ঞ আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। দেশের হাজার আলেম ও ইমাম-খতিবরা সে সেমিনারগুলো থেকে ট্রেনিং গ্রহণ করেছেন। হাজারের বেশি গবেষক সৃষ্টি করেছে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ক জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে। প্রতি বছরই অর্থনীতি বিষয়ক নতুন নতুন গবেষণাপত্র তৈরি করছে। দেশ-বিদেশের বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতি বিষয়ক সমস্যাগুলোর ইসলামী সমাধান দিচ্ছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ইসলামী অর্থনীতির চর্চা ও গবেষণাকে আরো শক্তিশালী ও গতিশীল করা আমাদের লক্ষ্য। দেশের বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইসলামী অর্থনীতিতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বেড়েছে, তাই ভবিষ্যতে ব্যাংকার ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জন্যও ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করার পরিকল্পনা আছে।

লেখক : চেয়ারম্যান, শরিয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও অনুলিখন : মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা ও আতাউর রহমান খসরু

সূত্র-কালেরকণ্ঠ


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM