বাংলাদেশ, , শনিবার, ১ অক্টোবর ২০২২

পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতারা দায় এড়াতে পারে না ফয়সাল হত্যাকান্ড ছিল পরিকল্পিত...

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০২২-০৭-০৭ ১৭:৪০:১৭  

ফাইল ছবি ফয়সাল। 

 

আমার ছোট বোনের স্বামী ও শাশুড়িকে নিয়ে সোমবার দুপুর থেকে চট্টগ্রামে ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে বন্ধু রিয়াদের ফোন কল। তার সাথে আমার একটি বিষয়ে বসার কথা ছিল। হয়তো এজন্য ফোন করেছে। কিন্তু না..! সে আমাকে যেটি শোনালো তা শোনতে মুঠেও প্রস্তুত ছিলাম না। বললো ফয়সালকে হত্যা করা হয়েছে। কোন ফয়সাল ? আমাদের ছাত্রলীগের ফয়সাল। কারা মেরেছে? আজিজরা..। রাত দশটা নাগাদ চিকিৎসক দেখিয়ে ফ্রি হলাম। তখন থেকে বিভিন্ন জনকে ফোন করে ফয়সাল হত্যাকান্ডের বিষয়টি খোঁজ নিতে শুরু করলাম। পরের দিন জানাজার মাঠে ছিলাম। কথা হয় সম্মেলনে উপস্থিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে।

তারা যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দেয়।

চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে ফোন আসে যুগান্তর পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি জসিম উদ্দিনের। তিনি বললেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের উদাসিনতা আর পুলিশের দায়িত্বহীনতা ফয়সাল খুন হয়েছে। জানতে চাইলাম কিভাবে..? প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জসিম জানালেন, ফয়সালের উপর হামলা হবে এটি নিশ্চিত জেনেও আওয়ামী লীগের কেউ দায়িত্ব নেয়নি। তারা পুলিশকে খবর দেয়। কিন্তু পুলিশ তাকে নিরাপত্তা না দিয়ে একটি সিএজিতে তুলে দেয়। আর খুনিরা নির্মমভাবে খুন করে ফয়সালকে। একই তথ্য জানালেন সংবাদকর্মী মিজান। তার মতে, ফয়সালের উপর হামলা করতে শতাধিক যুবক, কিশোর, নারী, পুরুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলনে। যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই ফয়সালকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।

ঘটনার সময় স্টেজে থাকা ছাত্রলীগের অনেক নেতারাও একই তথ্য জানালেন। তাদের দাবি মতে আওয়ামী লীগের নেতারা ফয়সালকে নিয়ে যেমন ছেলেন উদাসিন তেমনি পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এমন কি হাত গুড়িয়ে নৃশংস হত্যাকান্ড দেখছে পুলিশ। বারবার বাঁচার আকুতি মিনতি করেও কারো সাহায্য পায়নি ফয়সাল। খুনিদের হামলা কতটা ভয়াবহ, কতটা নির্মম, কতটা নৃশংস, কতটা ভয়ংকর ছিল তা চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

আরো পড়ুন-নুরুল হুদা হত্যাকান্ড ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে অপচেষ্টা। 

ফয়সালের সাথে থাকা ও হামলায় আহত রমজান বলেন, ফয়সাল চেয়েছিল দলের নেতারা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাক। যখন কেউ নিলো না তখন পুলিশ অফিসারকে হাতে ধরে নিরাপত্তা চেয়েছিল। সে পুলিশ অফিসার রায়হানকে বলেছিল প্রয়োজনে একজন অপরাধী হিসেবে তাকে যেন পুলিশ ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কোন আবেদন মন গলেনি পুলিশের কর্মকর্তা রায়হানের। পরে পুলিশ অফিসারের নির্দেশে আমরা সিএনজিতে উঠি। আমাদের বহন করা গাড়ি যখন স্কুলের মাঠ ছেড়ে রাস্তার উঠে তখন চারদিক থেকে একযোগে হামলা শুরু হয়। মাত্র কয়েক ফুট দুরে ছিল পুলিশের গাড়ি। তারা গাড়ি থেকেও নামেনি। কিরিচের আঘাতে আমার মাথা কেটে যায়। পালিয়ে কোন রকম রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না ফয়সালের। সে ভয়াবহতা এখনো চোখের সামনে ভেসে উঠে।

সাবেক ছাত্রনেতা আলিম উদ্দিন বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক মুকুল যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন আজিজ মঞ্চের সামনে লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। এক পর্যায়ে বলে উঠে “এখানে আমার ভাতিজা নুরুল হুদার খুনি আসছে তাকে আমাদের তুলে দিন।” সম্মেলনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি হবে জেনে আমরা কয়েকজন দ্রুত তাকে সমাবেশ স্থল থেকে সরিয়ে দিই। এর কয়েক মিনিট পর ১০/১২ জন কিশোর লাঠি হাতে মঞ্চের পেছনে এসে ফয়সালের নাম ধরে গালি দেয়। তখন সাবেক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনসহ দলের নেতাকর্মীরা মিলে তাদের তাড়িয়ে দিলে তারা রাস্তায় শসস্ত্র অবস্থান নেন। প্রায় শতাধিক কিশোর, যুবক, নারী পুরুষ লাঠি, দা, কিরিচ, হকি স্টিক এবং অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতারা পুলিশকে ফোন করে ফয়সালের নিরাপত্তার জন্য বলেন। পুলিশের এসআই রায়হান এসে ফয়সালের সাথে কথা বলেন। তিনি দলের নেতাদের আশ্বাস্ত করেন ফয়সালের নিরাপত্তা তারা দেখবেন। এমন সময় নিহত নুরুল হুদার মা, বাবা, চাচাি, দাদি চিৎকার করে করে কান্না করতে থাকে। আর ফয়সালকে হত্যাকারী হিসেবে দাবি করে। এ সময় পরিস্থিতি কিছুটা আবেগময় হয়ে উঠে। এদিকে নেতারা পুলিশের এ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে যার যার মতো চলে যান। এর কিছু পরে পুলিশ অফিসার কোন অবস্থায় ফয়সালকে তাদের সাথে নিতে রাজি হন নি। আমরা তাকে অনেক রিকুয়েষ্ট করেছি। বলেছি বড় দূর্ঘটনাও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু তিনি আমলে নেননি। আমরা এও বলছি অন্তত বাড়িতে পৌঁছাতে সহযোগিতা করতে। এত অনুনয় বিনয় করেও মন গলেনি এসআই রায়হানের। পরে সিএনজি নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বৃত্তরা চারদিক থেকে হামলা করে। আমরা দুরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমাদের করার কিছুই ছিলো না। অথচ পুলিশ চাইলেই ফয়সালের মৃত্যু হতো না।

তিনি বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আজিজ গ্রেফতার হয়েছে। তার কল লিস্ট ধরে তদন্ত করলে হয়তো পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা যাবে।

যে অভিযোগের ধোঁয়া ছিল ফয়সালের বিরুদ্ধে।

গেল ২০২১ সালের ২৮ জুলাই রাতে খুরুশকুলে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন নুরুল হুদা নামে এক যুবক। এ ঘটনায় নিহত নুরুল হুদার পিতা মনিউল হক বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দাযের করেন। মামলা নং ৫২/৪৭৮। মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে খুন করা হয় ছেলে নুরুল হুদাকে। এ ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সেলিম প্রকাশ ফাল্টু সেলিম ও শাহেদকে আটক করে। গ্রেফতারকৃত সেলিম এবং টমটম চালক আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দিও দেন। জবানবন্দিতে ফয়সালের নাম ছিলো না। অথচ নিহত ফয়সালের নাম কেউ বলেন নি। অথচ নুরুল হুদা হত্যাকান্ডে ফয়সালকে জড়াতে জোর চেষ্টা চালায় আজিজ। তার দাবি ছিলো ফয়সাল পরিকল্পিতভাবে ভাতিজা নুরুল হুদাকে হত্যা করেছে। মামলার চার্জসীটে ফয়সালের নাম না দেখে অখুশি ছিলেন আজিজ। এরপর থেকে ফয়সালের স্ত্রীর সাথে তার ভাতাজা নুরুল হুদার প্রেমের একটি গল্প তৈরি করেন। প্রেমের বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে সন্ত্রাসী ভাড়া করে নুরুল হুদাকে খুন করে ফয়সাল। এমন একটি অলিক তথ্য প্রচার শুরু করেন। এ সংক্রান্ত নুরুল হুদা হত্যাকান্ডের অন্যতম আসামী শাহেদের একটি ফোন কল প্রচার করেন আজিজ। এ অডিওটি পরিকল্পিত বলে দাবি করেছিলেন ফয়সাল।

নুরুল হুদার হত্যা ও আজিজের তৎপরতাঃ

নুরুল হুদা খুন হওয়ার পর থেকে মামলা পরিচালনা করতেন আজিজ সিকদার। মামলায় ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালকে আসামি করতে মরিয়া ছিলেন তিনি।কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরুল হুদা হত্যাকান্ডের সাথে ফয়সালের সম্পৃক্ততা না পেয়ে তাকে চার্জসীটে অন্তর্ভুক্ত করেন নি। ফয়সালকে মামলায় জড়াতে ব্যর্থ হয়ে হামলার পরিকল্পনা করতে থাকে আজিজ। শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলন শেষে তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে আজিজ কেন ফয়সালকে নুরুল হুদা হত্যা মামলায় আসামি করতে চেষ্টা করেছিলো ? নুরুল হুদা হত্যা নিয়ে আজিজের মাত্রাতিরবক্ত তৎপরতার কারণ কি ছিল ? নুরুল হুদার খুনিরা আটক হলেও ফয়সালকে কেন হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো আজিজ ? তার এ ভূমিকার রহস্য কি ছিল ?

আরো পড়ুন-পরিচয় জেনে যাওয়ায় খুন করা হয় কলেজ ছাত্র নুরুল হুদাকে।

পুলিশ অফিসার কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন?

দেশের একজন সাধারণ নাগরিক কেউ নিজের জীবন নাশের আশঙ্কায় কোন পুলিশের কাছে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে তখন তাকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশ আইনত বাধ্য। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯ ধারায় পুলিশকে সে ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের বিষয়ে সে ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তা। উল্টো মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে দায়িত্ব পালনে অবহেলা যেমন করেছেন তেমনি দায়িত্বহীনতার পরিচয়ও দিয়েছেন। তবে অফিসারের অবহেলা ছিল কিনা তা তদন্ত করতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন কেরা হয়েছে। পলিশ অফিসার কি ফয়সাল হত্যার দায় এড়াতে পারেন ?

এদিকে ফেইসবুক লাইভে এসে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক মাহমুদুল করিম মাদু বলেছেন, ফোন করার পর মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে আসেন। মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য দেখে আমি হতাশ হয়েছিলাম। অফিসার নিজ দায়িত্বে বাড়ি পৌঁছে দিবেন বলে আমাকে নিশ্চিত করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের উদাসিনতা কেন ?

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলনে জেলার শীর্ষ এক নেতা বক্তব্য দিচ্ছেন। ফয়সালকে হামলা করতে রাস্তায় শত শত যুবক কিশোর, নারী ও পুরুষ যখন শসস্ত্র অবস্থান করছে তখন ফয়সালকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসে নি ? নেতারা কি সে সময়ের পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারেনি ? নাকি বুঝেও দায় এড়িয়েছেন? পুলিশের উপর তুলে দিলে কি দায়িত্ব শেষ হয় ? শত শত নেতাকর্মী একজন ফয়সালকে নিরাপত্তা দিতে পারলেন না ? এ ব্যর্থতা কার ? কতটা ভয়ংকর হলে আজিজ গ্যং দিন দুপুরে মধ্যযুগীয় কায়দায় খুন হতে পারে? এ মৃত্যু কি এড়াতে পারে দলের নেতারা ? দলের নেতাকর্মীরা কি ফয়সালকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারতেন না ? যে নেতারা একজন কর্মীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না তারা অপদার্থ ছাড়া আর কি হতে পারে ?

নিহত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের ভাই আবুল হাশেম বলেন, গেল ৮/৯ মাস পূর্বে ফয়সাল মুন্নীকে বিয়ে হয়। তার স্ত্রী ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এখন তার অনাগত সন্তানকে কি জবাব দিবো জানি না। এ নিষ্ঠুর হত্যাকন্ড কোনভাবে মানতে পারছি না। আমরা কঠোর শাস্তি দাবি করছি।

তবে খুশির খবর হচ্ছে, ফয়সাল হত্যা মামলার প্রধান আসামী আজিজ সিকদারসহ চারজনকে আটক করেছে।

পরিশেষ, ফয়সাল হত্যা ছিলো একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। খুন হওয়ার পূর্ব পরিস্থিতি অবগত হওয়ার পরও তাকে রক্ষা না করাও একটি অপরাধ। ইতিমধ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলায় নেতৃত্ব দেয়া আজিজসহ চারজন। এবার অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশের পুলিশের চৌকস ভূমিকা। পুলিশের ব্যর্থতার খবর শোনতে চাই না।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা