বাংলাদেশ, , শনিবার, ১ অক্টোবর ২০২২

৭’মার্চের ভাষণ ছিল স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতির নির্দেশনা

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০২২-০৩-০৭ ১৩:৫৩:১৪  

ফাইল ছবি- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

প্রায় দুই শত বছর শাসনের নামে শোষনের পর ১৯৪৭ সালে ভারত বর্ষকে দুইটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে স্বাধীনতা দেন বৃটিশ সরকার। বাঙ্গালীদের ভাগ্যাকাশ থেকে ধীরে ধীরে মেঘ সরে গিয়ে নতুন সূর্যোদয় হতে থাকলো। স্বাধীন জাতি হিসেবে নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে থাকে এ জাতি। কিন্তু বাঙ্গালীর স্বপ্নের নেশার ঘোর কেটে যায় ১৯৫২’ সালে ভাষার প্রশ্নে। বাঙ্গালীরা বুঝতে পারে তাদের ভাগ্যাকাশের মেঘ সরেনি। বরং আরো বেড়ে যেতে থাকে। শোষকের হাত বদল হয়েছে মাত্র। বৃটিশরা এসেছিলো বাণিজ্যের কথা বলে, পাকিস্তানিরা এসেছে ধর্মের আবরন নিয়ে। হতাশাগ্রস্ত এ জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আসেন টুঙ্গি পাড়ার খোকা ‘শেখ মুজিব’। তরুন মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন মুসলিম লীগের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব না। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্টা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ। কারাগারে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তরুন মুজিবের সুযোগ্য নেতৃত্বে বেসামাল হতে থাকে শোষক  পাকিস্তানিরা। তাই প্রতিবাদের ভাষা রুদ্ধ করতে বারবার সামরিক শাসন জারি করেন। গ্রেফতার করেন স্বাধীনতাকামী মুজিবসহ দলের শীর্ষ নেতাদের। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে প্রায় চৌদ্দ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন মুজিব। কিন্তু তাকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ৬’দফা দাবি উত্থাপনের পর ৮’মে শ্রমিক সমাবেশ থেকে বাড়ি ফিরেই গ্রেফতার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। তিব্র আন্দোলনের ‍মুখে পাকিস্তান সরকার মুজিবসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ছাত্র জনতার পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন শুধু প্রতিবাদ আর আন্দোলন করে এদেশের মানুষের অধিকার আদায় করা সম্ভব না। তাই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। যুদ্ধের জন্যও এদেশের মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে। তাই ১৯৭০’সালে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরষ্কুশ সংখ্যা গরিষ্টতা পান বাঙ্গালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা মুজিব। পাকিস্তানি সরকার বাঙ্গালীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হননি। এক মুজিবই এদেশের মুক্তি পাগল মানুষকে মুক্তির মোহনায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তার নির্দেশনার অপেক্ষায় জাতি চাতক পাখির মতো বসে আছে। কখন নির্দেশ দিবেন নেতা। ৭’মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিবেন বঙ্গবন্ধু। কি বলেন, কি নির্দেশ দিবেন তা নিয়ে হৈ ছৈ পড়ে যায়। দুপুর দুইটার সময় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকে সমাবেশ স্থলে আসতে থাকে সব শ্রেণী পেশার মানুষ। বঙ্গবন্ধু হয়তো স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। অধীর আগ্রহে বসে আছে জনতা। জনসমুদ্রে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে আছে। অনেকে আতংকিত হয়ে বসে রয়েছেন। কি হয়, বঙ্গবন্ধু কি বলেন হাজারো প্রশ্ন উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে উত্তাল জনসমুদ্রে।

মঞ্চে দাড়িয়ে বলেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’। জনগণ বঙ্গবন্ধুর কথায় সম্মতি প্রকাশ করে।

তিনি বলেন, দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর–নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস’।
ভাষণের একপর্যায়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পাকিস্তানিদের কাছে অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, ‘অ্যাসেম্বলি কল করেছে। আমার দাবি মানতে হবে প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল উড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে’। উত্তাল জন সমুদ্র চিৎকার করে এক সাথে সমর্থণ জানান।

 

চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।

 

‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

 

ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরে আর কোন কথা থাকতে পারে না। তার ঐতিহাসিক এ ভাষনের প্রতিটি কথামালায় ছিল দৃঢ়তা, ছিল সাহস, ছিল দেশ প্রেম।
চূড়ান্তভাবে প্রস্তুতি নিতে ভাষনে তিনি বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
যে সংগ্রামের ডাক মুজিবের অনুপস্থিতি বুঝতে দেয়নি মুক্তিকামী জনগণকে। মুজিবের নামে তারা অস্ত্র ধরেছেন। জীবনবাজি রেখেছেন। বেঁচে থাকার লালিত স্বপ্ন গলা টিপে হত্যা করেছেন। সর্বশেষ ১৯৭১’ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশকে শত্রু মুক্ত করেছেন।
লেখক-ওয়াহিদ রুবেল, সাবেক সভাপতি, কক্সবাজার সরকারি কলেজ। 

পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা