বাংলাদেশ, , শনিবার, ১ অক্টোবর ২০২২

“আল ফুয়াদ হাসপাতালের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তার স্ট্যাটাস ভাইরাল” আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০২১-০৩-১৫ ২১:০৬:৪৮  

গেল ৫ মার্চ কক্সবাজার শহরস্থ ফুয়াদ আল খতিব হাসপাতালে গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে ভর্তি থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা কর্মচারির অসৈজন্য আচরণের শিকার হয়েছেন সেবা গ্রহীতা। বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। তার লেখা স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। পাঠকের সুবিধার্থে তার লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো।..
৫ মার্চ থেকে প্রায় ৭৫ ঘন্টার জন্য কক্সবাজার শহরস্থ ফুয়াদ আল খতিব হাসপাতালে স্বেচ্ছাবন্দি ছিলাম। আবেগ, অনুভূতি, টেনশন আর ব্যস্ততায় কেটেছে সময়টা। সম্ভাব্য সকল অসুবিধা মোকাবেলা আর জয় করার মানসিক আর শারীরিক প্রস্তুতিও নিয়ে নিছিলাম। এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে এরকম কয়েকজনকে প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক হাজির হওয়ার জন্য প্রস্তুতও রেখেছিলাম।
আলমামদুলিল্লাহ, কোনপ্রকার অসুবিধা ছাড়াই এ সময়টা পার হয়েছে। এজন্য মহান রবের কাছে শোকরিয়া। যারা সহযোগীতা করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যারা পাশে ছিলেন, খবরা-খবর নিয়েছেন তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।
মিতু আর আমি দ্বিতীয় সন্তানের মা-বাবা হয়েছি। পৃথিবীতে এসেছে আমাদের রাজকন্যা। আমার জন্মদাত্রী আর আমার সন্তান মুহম্মদ সাহাল ফারুকের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছাস আমাদের পাওয়াটাকে পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছে। আশ-পাশের সবার মন জয় করা আমার কন্যার পৃথিবীতে আগমনে তার মা পেয়েছে মাতৃত্বের পূর্ণ স্বাদের সবশেষ বিন্দু। আমি পেয়েছি অকল্পনীয় স্বর্গীয় অনুভূতি।
এসব আমার ব্যক্তিগত আবেগ। এবার আসি মূল কথায়-
৭ তারিখ দুপুরের পর আমি কেবিনেই বসা ছিলাম। হাসপাতালের একজন কেবিনে এসেই আমাকে হাসপাতালের নার্স স্টেশনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। এক মিনিটের মধ্যেই আমি নার্স স্টেশনে উপস্থিত হলাম। এ কক্ষে চারজন নার্স বসা। কম সময়ের মধ্যেই আমাকে সদ্যজাত শিশুদের বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ করার উপযোগী একটি ডায়রী ও একটি জন্মসনদ দিলেন। সিনিয়র নার্স এটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
– হাসপাতালের পক্ষ থেকে এটি আপনার জন্য উপহার।
আমি যথারীতি বিনীতভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে কেবিনে ফিরে আসলাম। আমার কন্যার জন্য উপহার পাওয়া ডায়রীটি আমার সন্তান মুহম্মদ সাহাল ফারুকের হাতে তুলে দিলাম। সে তার আত্মার অপর পৃষ্ঠা ছোট বোন উমাইজা হেলাল (আমার কন্যার জন্য তার মায়ের দেওয়া নাম এটি) এর উপহারটি পেয়ে যারপর নাই খুশি। আমার সন্তানের খুশি দেখলে আমি স্বর্গীয় সুখ অনুভব করি।
এ হাসপাতালে আসার পর থেকে ডা. ফাতিমা জিন্নাত এঁর ব্যবহার আমাকে বিমুগ্ধ করেছে। আমার সদ্যজাত শিশু সন্তানের জন্য একটা ডায়রী উপহার পেয়ে এ হাসপাতালে মানুষদের আচরণের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ বেড়ে গেলো। এটা উল্লেখ না করলে খুব খারাপ বিষয় হবে, ডা. ফাতিমা জান্নাত যত বারই কেবিনে এসেছেন প্রত্যেকবার আমি সালাম দেওয়ার আগে তিনিই স্পষ্ট আর শুদ্ধভাবে সালাম প্রদান করে কেবিনে প্রবেশ করেছেন। ভদ্রমহিলা দায়িত্বের প্রতি বেশ সজাগ, পর্দানশীন আর গুণবতী। এদিন দুপুরের রাউন্ডে তিনি পরেরদিন মানে ৮ মার্চ আমাদের ছাড়পত্র দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন।
সব ঠিক থাকলে পরেরদিন ছাড়পত্র দিবে এটা মাথায় রেখে এ দিনই আমি আমার কন্যাকে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ দিয়ে চেক করানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। পরামর্শ নেওয়ার জন্য কেবিন থেকেই ইন্টারকমের মাধ্যমে নার্স স্টেশনে ফোন করলাম-
– আস্সালামু আলাইকুম, আমি…. নং কেবিন থেকে। আমি আমার শিশু সন্তানকে একজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটু দেখাতে চাচ্ছি।
আমার কথা শেষ করতে দিলেন না। তাৎক্ষণিক অপরপ্রান্ত থেকে বলে দিলেন,
– আপনি আমাদের এখানে এসে কথা বলুন। বলেই লাইন কেটে দিলেন।
একই তলায় নার্স স্টেশন, এক মিনিটের মধ্যেই সেখানে হাজির হলাম। কক্ষের ভিতরে দরজার পাশেই আমি দাঁড়ালাম। এ কক্ষে একজন সিনিয়র নার্সসহ তিনজনকে চেয়ারে বসা, আর একজনকে দাঁড়ানো দেখতে পেলাম। তারা ছাড়াও দু’জনকে দেখতে পেলাম বসা সিনিয়র নার্সের সাথে কথা বলতে। উভয় পক্ষের কথোপকথনে বুঝতে অসুবিধা হলো না, অন্য দু’জন লোক কোন রোগীর স্বজন হবেন। দু’মিনিটের মধ্যেই তাদের আলাপচারিতা শেষ হলো। রোগীর স্বজনরা বের হয়ে গেলেন। আমি এক কদম সামনে অগ্রসর হয়ে সালাম দিয়ে বললাম-
– আমি…. কেবিনের। একজন শিশু বিশেষজ্ঞ দেখাতে চাইছিলাম। ইন্টারকমে ফোন করলে এখানে আসতে বললেন। আজকে আপনাদের এখানে এরকম ডাক্তার কে আছেন?
– আপনি অভ্যর্থনা কক্ষে কথা বলুন।
– কত তলায় এটি?
– দ্বিতীয় তলায়।
– কত নাম্বর কক্ষ একটু বলবেন?
– ওখানে গেলেই পাবেন। যান এখন।
– কক্ষ নাম্বার জানালে আমার জন্য একটু সহজ হয়।
– ওখানে গিয়ে বললেই হবে।
– সেটাইতো, ওখানে কত নাম্বারে যাব?
– যান ওখানে পেয়ে পাবেন।
খুব রূঢ় আর কর্কশভাবেই তিনি কথা গুলো বললেন। নিজেকে সেবা গ্রহীতার বদলে এ হাসপাতালের সেবাদাতা মনে হলো, যে কিনা যথাযথ সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্যই এমন আচরণের স্বীকার হতে হলো।
কথা আর দীর্ঘায়িত করতে রুচিতে ধরল। নার্স স্টেশন নামীয় কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলাম। আমার জন্মগত স্বভাবজাত কারণে তিন সেকেন্ড এর মধ্যেই এ কক্ষে আবার প্রবেশ করলাম।
– আপনারা ব্যবহারটা ভালো করেননি। আমি সেবা পেতে আসছি, টাকার বিনিময়ে সেবা। আপনারা যেহেতু টাকার বিনিময়ে সেবা দিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে ব্যবহারটা আরও সুন্দর আর মার্জিত করা উচিত। সিনিয়র নার্স কিছু একটা বলতে চাইলেন। আমি কড়া ভাষায় তার মুখ বন্ধ করে দিয়ে দ্বিতীয় তলায় চলে গেলাম। এখানের অভ্যর্থনা কক্ষে হাজির হয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাওয়ার বিষয়ে তাদের পরামর্শ কামনা করি এবং একই সাথে উপরের তলার নার্স স্টেশনে ঘটে যাওয়া ঘটনাও অবহিত করি। এখানে ডেস্কে বসা ভদ্রলোক আমার কথা শুনে আমাকে বললেন নীচ তলায় যেতে।
– উপরতলা থেকে এখানে পাঠালেন, এখন আপনি নীচ তলায় যেতে বলতেছেন। আসলে অসুবিধা কি একটু বলবেন?
– কোনো অসুবিধা নাই, কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কোনদিন আসেন এটা মূলত নীচের তলার অভ্যর্থনা কক্ষেই লিপিবদ্ধ থাকে, তারাই এটা দেখেন।
– তো আমাকে এ কথাটা উপর তলা থেকে বলেননি কেন? তারা বললে তো আমাকে এখানে আসতে হতো না।
– ওরা হয়তো জানে না।
– ভালো কথা, না জানলে বলবে জানে না। ভুয়া কথা বলবে কেন?
কথা বাড়ানো অপ্রেয়োজনীয় মনে করলাম। চলে গেলাম নীচ তলায়। এখানের অভ্যর্থনা ও তথ্য কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। দু’জন বসা আছে এখানে। একজনকে দেখলাম ল্যাপটপে কাজ করতেছেন। অপরজনকে কর্মমুক্ত দেখলাম। দ্বিতীয়জনকেই আমার প্রয়োজন আর এর অব্যবহিত পূর্বে দু’টি ডেস্কে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিলাম। তিনি মাঝেমধ্যে বিরতি দিয়ে কমবেশি ২ মিনিট আমার সাথে কথা বললেন।
– আপনি ডাক্তারের বিষয়টি তৃতীয়তলার কর্তব্যরত ডাক্তারের কক্ষে বলেন।
তাকে আবারও তৃতীয় তলা আর দ্বিতীয় তলায় আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা অবহিত করে তাদের আচরণ সস্পর্কে বললাম। ভদ্রলোক উপরের তলার নার্স আর অন্যান্যরা ভুল করেছে দাবি করলেন।
– তারা যদি সঠিক তথ্য দিতে না পারে তো তাদের এখানে বসাই রাখছেন কেন?
– আপনি বিষয়টা তৃতীয় তলাতেই বলেন।
– আমাকে যে এতক্ষণ ঘুরালো তা কৈফিয়ত কে দিবে? দায় কে নিবে? আপনারা নার্সের সার্ভিস চার্জ নেন না?
– নেওয়া হয়।
– তো এরকম আচরণ কেন করলো? এখানে ব্যবসা করবেন আর মানুষকে হয়রানী করবেন, এটা কেমন আচরণ?
ততক্ষণে হাসপাতালের আরও ৪/৫ জন কর্তাব্যক্তি উপস্থিত হলেন। ভদ্রভাবে যতদূর কথা বলা যায় বলে ফেললাম। এখানে কেউ প্রতিবাদ বা প্রতিউত্তর করলেন না। আবারও তিন তলায় চলে গেলাম। এখানে কর্তব্যরত ডাক্তারের কক্ষ বন্ধ। এ কক্ষের সামনেই তদারকি ডেস্ক। এখানে একজনকে বসা দেখলাম। তাকে আমি এ হাসপাতালের কেবিনের ভাড়াটিয়া এটা জানিয়ে গত ১০/১২ মিনিটের ঘটনার বিবরণ দিলাম। তার কাছেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বিষয়ে পরামর্শ চাইলাম। তিনি সব শুনে বললেন,
– আপনাকে নার্স স্টেশনে যেতে হবে। এটা তাদের কাজ।
আমি এ ভদ্রলোককে আবারও পুরো ঘটনার বিবরণ দিলাম। তৃতীয় তলার নার্স স্টেশনের নার্সের আচরণ, দ্বিতীয় ও নীচ তলার কর্তাব্যক্তিদের কথা আর আচরণ সব বলার পর তিনি আবারও আমাকে নার্স স্টেশনে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন,
– ওখানে একটা কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে। ডাক্তার…… যথাসময়ে কেবিনে এসে দেখে যাবেন।
এবার একটু কড়া হলাম।
– কাগজে স্বাক্ষর নিতে হলে আমার কেবিনে পাঠিয়ে দেন। আমি আর ওই স্টেশনে যাব না। আমার কথা পছন্দ না হলে আপনাদের পরিচালককে বলেন আমি কাগজ কেবিনে পাঠাতে বলেছি। এ কাজটা যত দ্রুত করবেন ততই ভালো। অন্যতায় ভুগতে হবে। তিন মিনিটের বেশি আমি সময় দিতে পারব না। অনেক হয়রানী করেছেন, ঘুরাইছেন। এবার আমার দেখার পালা।
আমি কেবিনে চলে গেলাম। দুই মিনিটের মধ্যে তদারকি কর্মকর্তা কাগজ নিয়ে কেবিনে হাজির হলেন। আমি যথাস্থানে স্বাক্ষর করে কাগজটি ফেরত দিলাম। এদিনের বিবরণ আপাতত শেষ করি।
৮ মার্চ দুপুর ১২.৩০ টার দিকে আমি কেবিনেই অবস্থান করতেছি। এসময় হাসপাতালের হিসাব শাখা থেকে খবর দেওয়া হলো আমার বিল রেডি, আমি যেন বিল শাখায় গিয়ে যোগাযোগ করে বিল পরিশোধ করি। বিলম্ব না করেই চারতলায় বিল শাখায় গেলাম। যথারীতি কেবিনের পরিচয় দিয়ে বিলের বিষয়ে জানতে চাইলাম। প্রায় সাত মিনিট দাঁড় করাই রেখে এখানে থাকা একজন আমাকে বিলের কাগজটা দিলেন এবং আগে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে ডাক্তারের বিল পরিশোধ করতে বললেন। এ হাসপাতালে ডাক্তারের বিল আলাদা দিতে হয় জানতাম না। যা হোক, তাদের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতা আমার নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত বিলটি দেখতে দেখতে দ্বিতীয় তলায় নামতেছি।
বিলের এক জায়গায় গতদিনে আমার নবজাতক কন্যার জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া ডায়রীর দাম ধরা হয়েছে ৩০০/- টাকা। ঔষধ খাতে একসাথেই লেখা আছে ১১,০৭৬/-। কোন ঔষধ কতোটি দিয়েছেন, কোনটা দাম কতো এ সস্পর্কিত কোন তথ্য বিলে উল্লেখ নাই। অন্যখাত বিষয়ে আর বর্ণনা করা অর্থহীন। নবজাতকের জন্য দেওয়া ডায়রীটি দেওয়ার সময়ই তারা বলেছিল এটি তাদের পক্ষ থেকে উপহার। এটির দাম উঠালো ৩০০/- টাকা। অথচ, আমি ডায়রীটি চেয়ে নিইনি বা আমি প্রয়োজনীয়ও ছিলো না। জন্মসনদের দাম লিখলেন ১৮০/- টাকা। মাথা গরম হতে হতে ঠান্ডা করলাম। এটি আমার স্বভাবের সাথে যায় না। কর্মস্থলে মাথা গরম মানুষ হিসেবে আমার কু-খ্যাতি আছে। আজ মাথা গরম না করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেছি।
বিল পরিশোধ করার আগে চলে গেলাম ছয়তলায়, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে। এ কক্ষের একেবারে পশ্চিমপাশে একটি বড় টেবিল নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে একজন বসে আছেন। তাঁকে আমি চিনি, তিনি এ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনুমতি নিয়ে এ কক্ষে প্রবেশ করে তাঁর টেবিলের সামনে উপস্থিত হলাম। সালাম দিলাম। টেবিলের সামনের দু’টি চেয়ারের একটিতে একজন বসা, অপরটি খালি। দাঁড়িয়েই বলা শুরু করলাম-
– অনুমতি দিলে আমি একটু কথা বলতে চাই।
– বলেন।
– আমি আপনাদের হাসপাতালের….. নং কেবিনে আছি গত তিনদিন ধরে, আজকে আমাকে ছাড়পত্র দিয়েছেন। বিলও দিয়েছেন। আমি বিলটা পরিশোধ করেই হাসপাতাল ত্যাগ করবো। প্রথমেই বলে নিই, আমি বিলের টাকা মওকুপের জন্য আপনার কাছে আসিনি।
এরপর তাঁকে শিশু বিশেষজ্ঞের খোঁজে আগেরদিনের সব কাহিনী বললাম। ইন্টারকম থেকে নার্স স্টেশনে ফোন করা থেকে সবশেষ আমার কেবিনে এসে স্বাক্ষর নেওয়া পর্যন্ত সব দুই মিনিটের মধ্যে বলে ফেললাম। তিনি শুনে নিজে নিজেই তাঁর কার্যালয়ের লোকদের উপর বেশ বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
– আপনি বসুন।
– না, আমি আপনার কাছে অভিযোগ করতে আসিনি। আমার বাড়ি এ অঞ্চলেই, আমি চাই আপনাদের সুনাম বৃদ্ধি পাক। মানুষ এখানে এসে যেন মনের সন্তোষ্টি নিয়ে ফিরে যায়। তাই পরবর্তীতে যারা আসবেন তাঁরা যেন আমার মতো বিব্রতকর অবস্থায় না পড়ে কেবল এ অনুরোধটাই করতে এসেছি। এটা মনে করা অন্যায় হবে যে, মানুষ এখানে ঠেকায় পড়ে আসে। মানুষ আসে সেবা নিতে। যিনি আসেন তিনি যেনো সন্তুষ্টি নিয়েই হাসপাতাল ত্যাগ করেন, বাইরে গিয়ে যেন হাসপাতালের বিষয়ে ইতিবাচব তথ্য বলতে পারেন। নেতিবাচক কিছু বলার যেনো সুযোগ না পায়, না দেন।
– আমি আপনার সাথে একমত হতে পারলাম না। আমরা মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্যই বসে আছি। কোনভাবেই বিব্রত বা বিরক্ত হবে না।
– মানুষকে সেবাই যদি দেন তো আমাকে বলেন নবজাতকের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া ডায়রীর দাম ধরলেন কেন? কেন জন্মসনদের দাম যোগ করলেন? ঔষধের বিস্তারিত বিবরণ আর মূল্যতালিকা না দিয়ে কেন একদাগে একটা সংখ্যা লিখে দিলেন। ডায়রীর দামই যদি ধরেন তো বইয়ের দোকান দেন। চুরি করার একটা সহজ হিসেব হচ্ছে বিবিধ খাত, অন্যান্য খাত নামে টাকা দাবি, বিবরণ ছাড়া মোটা অংকে টাকা দাবি, যেটা ঔষধের দাম হিসেবে লিখেছেন।
এবার তিনি চেয়ার থেকে ওঠে গেলেন, টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে থাকা মানুষটিকে লক্ষ্য করে আমাকে বললেন,
– আপনি এসব বিষয়ে উনাকে নোট দেন।
– আমি তো আপনাকে বলতে এসেছি।
– উনাকে বলেন।
– আপনি তো আপনার নার্সের মতো আচরণ করতেছেন।
– আপনি আমাকে চিনেন? আমার এসব শুনার সময় নাই। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।
– আপনাকে আমি ভালোভাবেই চিনি।
– আমরা সরবরাহ করা ঔষধের বিস্তারিত বিবরণ এমনিতে না চাইলে কাউকে দিই না। আপনার এখানে চিকিৎসা নেওয়ার আগে এসব খোঁজ নেওয়ার দরকার ছিল।
– আপনি আমার কাছ থেকে দাবিকৃত পুরো বিলের বিবরণ দিতে বাধ্য।
– ঠিক আছে, আপনি এখন যান। আমার নীচে কাজ আছে।
– এই হাসপাতালের ডাক্তার ছাড়া অন্য লোকজনের আদব- কায়দার অভাব আছে।
তাঁর মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না। বজ্রপাত পড়ার মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছেন।
– আমি আপনাদের হাসপাতাল থেকে মন খারাপ করেই যাচ্ছি, অনুরোধ করছি কাউকে যেন আমার মতো করে যেতে না হয়। ক্ষমা করবেন, কথাগুলো আপনাকে আমার বলা উচিত মনে করেছি, তাই বলেছি।
অতপর—
দ্বিতীয় তলায় ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে তাঁর বিল পরিশোধ করলাম। তাঁর পক্ষে বিল আদায় বাবদ একটি খসড়া ভাউচার দিলেন। পরক্ষণেই হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য আবারও চারতলায় গেলাম। ডাক্তারের বিল পরিশোধের ভাউচারসহ তাদের বিলটি বিল শাখায় দিলাম। সাথে বিলে দাবিকৃত টাকা। এই- সেই করতে লাগলেন বিল ব্যবস্থাপক। বিলের কাগজ দিলাম, টাকা দিলাম। রিসিভ ভাউচার বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ফাইল ফেরত দেয় না। প্রায় আট মিনিট পর জানতে চাইলাম, ঘটনা কি? বললেন,
– ফাইল এখনও নীচ থেকে এখানে আসেনি। একটু বিলম্ব হবে।
– আমাকে তো বলা হলো, ফাইল আর বিল প্রস্তুত। আপনিওতো বলেছেন। আগে ডাক্তারের বিল দিয়ে আসতে বললেন। এরপর এখানের বিল দিয়ে ফাইল নিতে বললেন।
– ফাইল আসেনি এখনও, অপেক্ষা করুন।
– তো ফাইল প্রস্তুত করে তারপর আমাকে ডাকলে ভালো হতো না?
– আপনাকে অপেক্ষা করতে বলছি, অপেক্ষা করুন। না হলে যা খুশি করুন।
– কথা ভদ্রভাবে বলুন।
– অভদ্রতা এখনও করিনি, বেশি কথা বললে করবো।
– ভাই আমি আপনাকে আবারও বলতেছি, ভদ্র আচরণ করুন। আমি আপনার গ্রাহক। অতএব, সেভাবে কথা বলুন।
– আপনি কে? আপনার সাথে এতো ভদ্রভাবে কথা বলতে হবে?
– আমি কেউ না। আমি আপনাদের গ্রাহক, সে হিসেবে আমি ভদ্র আচরণ পাওয়ার হকদার।
– যান এখান থেকে। পরে আসুন।
– পরে কখন?
– আপনার যখন ইচ্ছা।
– আমাকে তো এখন আসতে বলা হয়েছে, তাই এসেছি।
এ লোকের সাথে কথা না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। অল্প সময় পর ফাইল আসলো, হাসপাতালের বিল পরিশোধের রিসিভ ভাউচার আর ফাইল আমার হাতে তুলে দিলেন। সব ঠিক আছে কি-না দেখতে লাগলাম। এক্ষণে অাবিষ্কার করলাম, ডাক্তারের কাছে বিল দেওয়ার পর আমাকে যে খসড়া ভাউচার দিয়েছিল সেটা এখানের বিল ব্যবস্থাপক রেখে দিয়েছেন। আমাকে ফেরত দেননি।
– ভাই ডাক্তারের কাছে দেওয়া বিলের ভাউচারটি দেননি।
– ওটা দেওয়া হবে না।
– আমি টাকা দিলাম, ভাউচার দিবেন না?
– নীচ থেকে আরেকটা নিয়ে যান।
– এটাতো আমাকে নীচ থেকেই দেওয়া হয়েছে। আমি আবার নিব কেনো? আপনাদের দরকার হলে আপনারা নীচ থেকে নিয়ে নেন, আমারটা ফেরত দেন।
– যেটা বলছি এটা করুন।
– আমি টাকা দিয়ে রিসিভ ভাউচার নিয়েছি। আমার ভাউচার আমাকে অবশ্যই ফেরত দিবেন। টাকা নিবেন রিসিভ ভাউচার দিবেন না?
অবশেষে তিনি এটা দিলেন। আমি ভাউচার আর ফাইল নিয়ে বিল শাখার ডেস্ক ত্যাগ করতেছি, ঠিক এ মূহুর্তে তিনি বলে ওঠলেন,
– এক মাঘে শীত যায় না। পরে আবার আসতে হবে। মনে থাকে যেনো।
– এই বেয়াদব, আর একটি কথা বললে এখান থেকে লাথি মেরে মেরে নীচতলা নিয়ে যাব।
এবার থামলেন। মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না।
আমি কেবিনে চলে আসলাম। তিন মিনিনিটের মধ্যে বের হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করলাম। পিছনে কয়েকজন আসলেন। তবে, কেউ কিছু বললেন না। কেবল আমার পরিচয় জানার জন্যই তাদের আগ্রহ দেখলাম। আমার বলতে কেবল আমার। একজন সেবাগ্রহীতার নয়।
সবকিছুর পর আমি যেটা বুঝেছি,
মানুষ এজন্যই এটিকে আল ফুয়াদ বলে, চিনে। ফুয়াদ আল খতিব চিনে না। না চেনাই ভালো। এতো অশুদ্ধতার মধ্যে কেবল নামের শুদ্ধতা থাকে কেমনে?
জি, আমাদের জাগতেই হবে। না জাগলে সকাল হবে কেমনে?

পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা