শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৭:১১ অপরাহ্ন

ভারতকে তুষ্ট করতে জামায়াত ছাড়তে পারে বিএনপি

ভারতকে তুষ্ট করতে জামায়াত ছাড়তে পারে বিএনপি

অনলাইন বিজ্ঞাপন

আলোকিত কক্সবাজার ডেক্স॥
বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ‘ছাড়’ দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপি। জানা গেছে, দলটি এ জন্য প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে দিতেও রাজি। পাশাপাশি দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নে ভারত যাতে সন্তুষ্ট থাকে এমন নীতি বা অবস্থান গ্রহণেও বিএনপি প্রস্তুত বলে জানা গেছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, গত প্রায় ৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এক রকম বাধ্য হয়েই ভারতমুখী অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। দলটির নেতাদের মতে, এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই তাঁদের সামনে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই সব দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছে। এমনকি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ওই দেশগুলো পর্যবেক্ষক পর্যন্ত পাঠায়নি। কিন্তু এতেও নির্বাচন ঠেকানো যায়নি শুধু ভারত আওয়ামী লীগের পাশে থাকায়। এখনো দেশটির সমর্থন আছে বলেই বর্তমান সরকার টিকে আছে বলে বিশ্বাস করেন দলটির নেতারা। সব মিলিয়ে বিএনপির উপলব্ধি হলো, ভারতের সমর্থন না হোক, অন্তত বাংলাদেশ প্রশ্নে দেশটি ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান না নিলে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়।
ফলে ভারতের মনোভাব বুঝতে দেড় বছর ধরে গবেষণা চালাচ্ছে বিএনপি। দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি কূটনীতিক ও ‘ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র’ বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রশ্নে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমেও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে বিশেষ ‘বার্তা’ দেওয়া হয়েছে। সূত্র মতে, ওই সব বার্তায় ভারত বুঝিয়েছে, তাদের মূল উদ্বেগ হচ্ছে নিজেদের নিরাপত্তা এবং এ প্রশ্নে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হুমকি বলে তারা মনে করে তাদের সঙ্গ ছাড়তে হবে বিএনপিকে।
অবশ্য দেশটির নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে যেসব সমস্যা রয়েছে সে বিষয়ে ভারতকে সরাসরি ওই দলটির সঙ্গেই কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছে বিএনপি। কোনো কোনো ইস্যুতে সমস্যা থাকলে সেটি জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে নিজেরাই সমাধান করতে পারবে বলে ভারতকে আশ্বস্ত করছে বিএনপি। পাশাপাশি বিএনপি এও বলছে, নিবন্ধন বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের সূত্র ধরে সরকারই ইচ্ছা করলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। কিন্তু সরকার তা না করে রাজনৈতিক ‘গেমের’ অংশ হিসেবে বিএনপিকে দুষছে বলে দলটি ভারতের কাছে অভিযোগ করছে।
সূত্রমতে, গত কয়েক বছর ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে চলা এসব ইস্যু দলটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি শুভান্যুধায়ীদের কাছেও অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়।
সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বলা হচ্ছে, সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করেই জামায়াত ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করবে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, এত দিন আলোচনার পর্যায়ে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও সরকারের নানামুখী কৌশল ও তৎপরতায় এখন তাঁরা প্রচণ্ড চাপের মুখে। ফলে রাজনৈতিক প্রশ্নে যেকোনো অবস্থান তাঁদের নিতেই হবে।
সূত্রমতে, দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতার পাশাপাশি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও খালেদা জিয়াকে বুঝিয়েছেন যে বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন এবং পশ্চিমা দেশগুলো চাইলেও সরকারকে চাপে ফেলা যাচ্ছে না মূলত ভারতের কারণেই।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কোন্নয়ন খুব জরুরি। কারণ দেশটি বিশ্বের উঠতি এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বড় অর্থনৈতিক শক্তি। তার এ অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক। ফলে তাকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট রাখা না রাখার বিষয়টি বিএনপির নেতৃত্বের বোঝার বিষয়। এ নিয়ে বাইরের পর্যবেক্ষকদের বলার কিছু নেই।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান জামায়াত ও তারেক রহমান প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন বিএনপির জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে তিনিও মনে করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ভৌগোলিকভাবে ভারতের অবস্থান এমন এক জায়গায় যাকে বাংলাদেশ কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারে না। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে দেশটির ভূমিকা, সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে তার চাওয়া-পাওয়ার মূল্য আছে। তবে সবকিছু সমতার ভিত্তিতে হওয়াই বাঞ্ছনীয়; যোগ করেন সাবেক এই সেনাপ্রধান।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের মতে, ভারতকে ছাড় দেওয়া হবে কিনা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয় হলো, বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী। কেননা তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তা করেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতকে জোটে রাখা নিয়ে নানা ধরনের কথা চালু থাকলেও দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়া এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
আরেক ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকারও প্রায় একই মত। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক থেকে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী জোট আছে। তবে এ জোট থাকবে কিনা সেটি বিএনপির ভবিষ্যৎ নীতি বা কর্মকৌশলের ওপর নির্ভরশীল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। ফলে ভারতের সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে বিএনপির কখনোই সখ্যতা হবে না।
অবশ্য জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের কোনো দূরত্ব নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, লন্ডনে যাওয়ার আগেও জোটনেত্রী তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করে গেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত প্রশ্নে ভারত বা বাইরের কোনো দেশের চাপের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি কী বাইরের চাপে নাকি দেশের জনগণের ইচ্ছায় চলবে? জামায়াত জনগণের জন্য রাজনীতি করছে- দাবি করেন ঢাকা মহানগর জামায়াতের এই নায়েবে আমির।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। সেখানে তাঁর দুটি চোখেরই অপারেশন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অনুমতি দিলে আগামী ২৫ অক্টোবর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
সূত্রমতে, লন্ডনে অবস্থানকালে গত এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে নানা পরামর্শ করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ ছাড়া খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাও।
খোকা দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন। আবদুল আউয়াল মিন্টুও ফিরে গেছেন ব্যাংককে। আর আমীর খসরু এখনো লন্ডনে। গত শনিবার দেশে ফিরেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এসব নেতার ঘনিষ্ঠজনরা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, মা ও ছেলের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁদের জানা নেই। কারণ ওই আলোচনা একেবারেই পারিবারিক পর্যায়ে হয়েছে। তবে দেশে ফিরে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেবেন- এটি তাঁরা বুঝতে পারছেন। এদিকে জামায়াত প্রশ্নে বিএনপি যে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে এটি লন্ডনের পাশাপাশি ঢাকায় অবস্থানকারী নেতারাও জানেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, এ প্রশ্নে ভারত এক রকম কঠোর অবস্থান নিয়েই আছে। ফলে বিএনপি শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে জোটে ধরে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন, জামায়াত প্রশ্নে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এদিকে গত বেশ কয়েক বছর ধরেই কিছু কিছু ইস্যুতে তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে ‘আশ্বস্ত’ হতে চাইছে ভারত। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, দলটি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এবং সে সরকারে তারেক রহমানের কতখানি নিয়ন্ত্রণ থাকবে- এ প্রশ্ন বারবারই ভারতের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে তোলা হচ্ছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানও এ বিষয়ে অবগত। ফলে এ প্রশ্নে মা ও ছেলের মধ্যে এবার আলোচনা হবে বলে ধরে নিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। অনেকের মতে, এ বিষয়টির ওপরই বিএনপির সঙ্গে ভারতের সমঝোতার অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে সাম্প্রতিককালে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন  লন্ডনে অবস্থানকারী এমন একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আগের চেয়ে অনেক ‘বাস্তববাদী’ হয়ে উঠছেন তারেক রহমান। বিশেষ করে কী কারণে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে এবং কী কারণে সরকার টিকে আছে এটি তিনি এখন উপলব্ধি করতে পারছেন বলে ওই নেতারা দাবি করেন। ফলে তাঁদের আশা, এবার ভারতের সঙ্গে সমঝোতা হবেই।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM