মঙ্গলবার, ১৮ Jun ২০২৪, ০৬:২৫ অপরাহ্ন

পর্যটন জোনের ‘কিং’ কাজী রাসেলকে ছাড়িয়ে নিতে তদবির

পর্যটন জোনের ‘কিং’ কাজী রাসেলকে ছাড়িয়ে নিতে তদবির

অনলাইন বিজ্ঞাপন

বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজার সৈকতের পর্যটন জোনের সবধরণের অপরাধের ‘কিং’ হিসেবে পরিচিত কাজী রাসেল আহমদ নোবেল ওরফে কাজী রাসেল অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন। সোমবার ভোররাতে নারীসহ কলাতলীর সৈকত পাড়ার একটি নির্মাণাধীন বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর থানার অপারেশন অফিসার (ওসি-অপারেশন) মাসুম খান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে তোলা ছবি ছড়িয়ে মন্ত্রীর ভাগিনা পরিচয়ে তিনি পর্যটন এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতারের পর থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিতে জোর তদবির চালিয়েছেন তার ভাই কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজি মোরশেদ আহমদ বাবুসহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা।

গ্রেফতার কাজী রাসেল (৩৩) কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলীর লাইটহাউজ এলাকার মৃত কাজী তোফায়েল আহমদের ছেলে। তিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সদস্য এবং কলাতলী কটেজ মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্বপালন করছেন। তার সাথে আটক আসমা হুসনা মিম (২৭) ঢাকার দোহারের জয়পাড়ার মৃত আবদুল মজিদের মেয়ে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খান জানান, কক্সবাজার পর্যটন এলাকার কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয়ে কাজী রাসেল নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছিলেন। প্রায় সময় তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া যেত। সম্প্রতি মোরশেদ নামের এক যুবককে পিঠিয়ে গুরুতর জখম করে রাসেল। ওই ঘটনায় তাকে এক নাম্বার আসামি করে মডেল থানায় মামলাও হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার ভোরে অভিযান চালিয়ে মিম নামে ঢাকার দোহারের এক কণ্ঠশিল্পীসহ তাকে আটক করা হয়। এসময় তারা ইয়বা সেবন করছিল।

তবে, স্থানীয় সূত্র মতে, কলাতলীর সৈকত এলাকার নির্মানাধীন ঐ বাসাটি দখলের জন্য কাজি রাসেল সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পুলিশ সেই বাসার বাউন্ডারি ডিঙ্গিয়ে ভেতরে ঢুকে রাসেলসহ ছাত্রলীগের চিহ্নিত এক ক্যাডারকে গ্রেফতার করে। এসময় ইয়াবা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়। কিন্তু তদবিরের মাধ্যমে ছাত্রলীগের সেই ক্যাডারকে নিরবে নিস্কৃতি দেয়া হয়েছে। লুকিয়ে ফেলা হয়েছে উদ্ধার অস্ত্রটিও।

কিন্তু কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, কাজী রাসেলকে নারীসহ আটক করা হয়েছে। এসময় অস্ত্র এবং অন্যকিছু পাওয়া গেছে বলে জানাননি সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দ আবু মো. শাহাজান কবির। এরপরও বিষয়টি খবর নেয়া হচ্ছে। কাজি রাসেলের বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে। তাকে আটকের পর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সবকিছু আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কলাতলী পর্যটন জোনের একাধিক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা জানান, কাজী রাসেলের অপরাধের রাজ্য খুবই বিস্তৃত। তার বড় ভাই পৌর কাউন্সিলর কাজি মোরশেদ আহমদ বাবুর তিন শ্যালক মাসুদ, খালেদ ও মাহফুজ এবং অপরাধী ওয়াজেদ, মান্নানসহ ১৫-২০ জনের একটি গ্রুপ নিয়ে ঢাকারবাড়ি, শারমিন, সবুজ, আমীর ড্রিম, সী-টাউন, কমফোর্টসহ আরো বেশ কয়েকটি কটেজে পতিতা সরবরাহ, ইয়াবা এবং বিভিন্ন ধরণের মাদক সরবরাহ দিতেন। কলাতলী সড়কের পূর্বপাশের প্রায় প্রতিটি গেস্ট হাউজে এবং ফ্লাট থেকে কাজি রাসেলের হয়ে নিয়মিত টাকা তুলতেন মান্নান। এভাবে প্রতিদিন প্রায় ৩-৫ লাখ টাকা অবৈধ আয় তার টেবিলে এসে জমত।

তারা আরো জানায়, পর্যটন এলাকায় নির্মাণাধীন বা তৈরী হওয়া অনেক এপার্টমেন্ট এবং ভবন ও হোটেলের কক্ষ, ফ্লাট বা পুরো ফ্লুর দখলে নিয়ে ভাড়া দিত কাজি রাসেলরা। কলাতলী সড়কের পশ্চিম পাশে খালি পড়ে থাকা সরকারি অর্ধডজনাধিক প্লট দখল করে ঘের ও ঝুপড়ি ঘর তুলে ভাড়া দিয়ে আসছেন কাজি রাসেল। ঢাকার ফরিদ খান ইরান নামের এক জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্টতার ফাঁকে তোলা অন্তরঙ্গ ছবি নিজের ফেসবুক ওয়ালে ছেড়ে বা পেস্টুন করে টানিয়ে সবার মাঝে ভীতি সঞ্চার করতো। তার কাছেরজনরা প্রচার করতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ভাগিনা বলে সম্বোধন করেন। মন্ত্রী কক্সবাজার এলে আধুনিক সাজে তাকে বরণ এবং সবসময় পাশে লেগে থাকায় জেলা পুলিশের কর্তাগণ, থানা ও ডিবির ওসি এবং এসআইসহ নানা পদের পুলিশ সদস্য তার সাহচার্য্য পেতে মুখিয়ে থাকতো। নিয়মিত উপঢৌকন দিয়ে পুষে রাখত প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার স্থানীয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীকেও। এদেরই একজন হতে সম্প্রতি ‘নতুন সময়’ নামে এক অনলাইন টেলিভিশনের জেলা ব্যুরোচীফ হিসেবে নিয়োগও নিয়ে আসেন কাজী রাসেল। এর ফল স্বরূপ কাজি রাসেল পর্যটন জোনে অপরাধের অপ্রতিদ্বন্ধি ‘কিং’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয় শোক দিবসসহ নানা দিবসে হোটেল-মোটেল জোনের প্রায় প্রতিটি হোটেল থেকে চাঁদা আদায় করতেন কাজি রাসেলরা। ক্ষমতা পাকাপুক্ত করতে তিনি জেলা এবং শহর স্বেচ্ছাসেবকলীগের পদও ধারণ করেন। সম্পর্ক রেখেছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথেও।

এদিকে, কাজি রাসেল আটকের পর থেকে জেলা গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ওসি মানস বড়ুয়া ও সদর থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খান মিলে কাজি রাসেলকে অন্তরঙ্গভাবে কেক খাওয়ানোর এমন একটি ছবি ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়েছে। এতে অনেকে অনেক ধরণের মন্তব্য করছেন। প্রশাসনের সাথে তার অন্তরঙ্গ এ সম্পর্কের কারণে তিনি যে অপরাধ কর্ম নির্বিঘ্নে করতেন এটি তারই প্রমাণ বলে অভিমত দেন তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টিআকর্ষণ করা হলে, সদর থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খান বলেন, অপরাধী ধরতে গেলে অনেকসময় অপরাধীর সাথেও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়তে হয় আমাদের। এটি এমনই একটি পদ্ধতির চিত্র। তার অপকর্মের খবর পেয়ে তা খতিয়ে দেখতেই তার সাথে আমরা কাছে গিয়ে মেশার চেষ্টা করেছি। ওসি মাসুমকে অনুসরণ করে একই কথা বলেছেন, ডিবির ওসি মানস বড়ুয়াও।

কক্সবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কায়সারুল হক জুয়েল বলেন, অপরাধীর কোন দলের হতে পারে না। দলীয় পরিচয়ে অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। কাজী রাসেলের দায় দল নিবে না। তা বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কাজী রাসেল আটক এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ বিষয়ে জানতে তার ভাই কাউন্সিলর কাজী মোর্শেদ আহমেদ বাবুকে কল ক

কাজী রাসেল আটক এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ বিষয়ে জানতে তার ভাই কাউন্সিলর কাজী মোর্শেদ আহমেদ বাবুকে কল করা হয়। রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা দেয়া হলেও সাড়া দেননি তিনি। তবে, কিছু গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, কাজি রাসেলের চলাফেরা পরিবারবিরোধী থাকায় তাকে আটকের ব্যবস্থা পরিবার থেকেই করা হয়েছে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Desing & Developed BY MONTAKIM