বাংলাদেশ, , বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

প্রথমবারের মতো চকরিয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে উম্মুক্ত গণশুনানীতে ব্যাপক সাড়া

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-১৪ ২১:১৩:৩১  

মনজুর আলম, চকরিয়া ঃ

দেশে প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের চকরিয়ায় গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণশুনানী ও তথ্যমেলা। সরকারী সেবাদানকারী বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে প্রথমবারের মতো চকরিয়ায় অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে ভূক্তভোগী জনতার সঙ্গে এককাতারে বসে আছেন দুদক কমিশনার ড. নাসির উদ্দিন আহমদ।

তার পাশে বসা দুদকের মহাপরিচালক শামছুল আরেফিন, দুদকের চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়া, উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, সংসদ সদস্য মৌলভী মো. ইলিয়াছ, জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আর তাদের সামনের মূলমঞ্চে বসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাহেদুল ইসলাম নাম ধরে ডাকছেন ভূক্তভোগীদের। এর পর চেয়ারে বসিয়ে তার (ভূক্তভোগী) কাছ থেকে শোনা হচ্ছে অভিযোগ। অপরদিকে একইমঞ্চে বসা স্ব স্ব দপ্তরের কর্মকর্তারা ভূক্তভোগীর করা অভিযোগের জবাব দিচ্ছেন। এ সময় উপস্থিত জনতা সংশি¬ষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সন্তুষ্ট না হলে প্রতিবাদও করছেন। অনেকে সংশ্লি¬ষ্ট কর্মকর্তার দেওয়া বক্তব্যকে মিথ্যা বলেও দাবি করছেন উচ্চস্বরে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সচেতন নাগরিক কমিটি, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি চকরিয়া উপজেলা শাখা এবং উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারের চকরিয়ার পুরাতন বিমানবন্দরস্থ বিজয় মঞ্চে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণশুনানী ও তথ্যমেলার চিত্র এটি। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই গণশুনানী ও তথ্যমেলায় ভূক্তভোগী লোকজনের অভিযোগের মুখোমুখি হন প্রথমে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহম্মদ হোসেন ভূঁইয়া, সাব রেজিষ্ট্রার পরিতোষ কুমার দাশ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা মো. আবদুস সালাম এবং কক্সবাজার পল¬ী বিদ্যুৎ সমিতি চকরিয়া জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. আশরাফ উদ্দিন খাঁন। অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহম্মেদ হোসেন ভূঁইয়া, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নোমান, সচেনত নাগরিক কমিটির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, টিআইবির সি. প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোছাম্মৎ ফজিলা খানম ও এ কে এম রেজাউল কবির আকাশ, চকরিয়া এরিয়া ম্যানেজার ইকবাল হোসেন। তবে চকরিয়া সাব রেজিষ্ট্রারের বিরুদ্ধে সাহারবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবদুল হাকিম নিজের করা একটি অভিযোগ শেষপর্যন্ত প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। জমি রেজিষ্ট্রি করতে গিয়ে তিনি জনৈক দলিল লেখক ও দালাল টিপুর কথা বললেও এই নামের কোন দলিল লেখক চকরিয়া সাবরেজিষ্ট্রার অফিসের অধীনে কর্মরত নেই বলে জানা গেছে। এমনকি দুদক কমিশনারের উপস্থিতিতে জেলা ও উপজেলাপ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কথিত দলিল লেখক টিপুকে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির করতে বললেও সাহারবিল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবদুল হাকিম শেষপর্যন্ত ওই টিপুকে হাজির করতে না পেরে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

এ বিষয়ে সাব রেজিষ্ট্রার পরিতোষ কুমার দাশ বলেন, ‘আমি তাৎক্ষণিক খোঁজ নিয়েছি, টিপু নামের কোন দলিল লেখক তার দপ্তরের অধীনে কর্মরত নেই। আমি এও জেনেছি, অভিযোগকারী সাহারবিল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম নিজেই একটি জায়গা দাতা হিসেবে বিক্রি করেছেন। তাই নিয়মানুযায়ী জমি বিক্রেতার পক্ষে কোথাও একটাকাও দেওয়ার বিধান নেই। সেখাকে কিভাবে একজন জমি দাতার কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রশ্ন আসে। আমি মনে করি ওই চেয়ারম্যান দালালের খপ্পড়ে পড়েছেন, তাই বিষয়টি আমার ওপর চাপাচ্ছেন।’

এর আগে সকালে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর একে একে বক্তব্য রাখেন সকল কর্মকর্তা। এর পর অনুষ্ঠানের মূল পর্ব গণশুনানী চলে প্রায় তিন ঘন্টারও বেশি সময়। পরিশেষে দুদক কমিশনার ড. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে বর্তমান সরকারের চাওয়া হচ্ছে সারাদেশে সরকারী সেবা প্রদানকারী দপ্তরগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা। এরই অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগের চকরিয়া উপজেলাকে বেঁছে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চার দপ্তর তথা উপজেলা ভূমি অফিস, সাব রেজিষ্ট্রার অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্স ও পল্ল¬ী বিদ্যুৎ সমিতিকে এই জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল দপ্তরকেও দুর্নীতিমুক্ত করতে এই গণশুনানীর আওতায় নিয়ে আসা হবে।

কমিশনার নাসির উদ্দিন আরো বলেন, ‘আজকের গণশুনানীতে যে সকল ভূক্তভোগী যথাযথ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, সেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। পাশাপাশি আজকের এই গণশুনানীতে যেসব অভিযোগ উত্থাপন হয়েছে এবং ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে কী-না তারও তদারকি করা হবে। এককথায় চকরিয়া উপজেলাকে অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত করতে যা যা করার প্রয়োজন হবে, তাই করা হবে।’ ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সারাদেশে এসব অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বলেও উলে¬খ করে দুদক কমিশনার।

গণশুনানীতে অংশ নিয়ে হাজি বশিরুল আলম অভিযোগ করেন, ভূমি অফিসে একটি নামজারি জমাভাগ খতিয়ান সৃজন করতে গেলে সর্বনিন্ম ৭-৮ হাজার থেকে ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়, চিংড়ি চাষের জমি যারা বরাদ্দ পেয়েছে তারা প্রকৃত চাষি নয়, এখানে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যোগসাজস রয়েছে। এমনকি দুর্নীতি, ঘুষ আদায়সহ এসব অভিযোগের যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় তিনি টিআইবিকেও ব্যর্থ বলে অভিহিত করেন।

চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর লক্ষ্মণ কান্তি দাশ অভিযোগ করেন, চিরিঙ্গা মৌজার বিএস ২৬৫ নম্বর খতিয়ানের মালিক তিনজন। তন্মধ্যে একজন হচ্ছেন সতীশ চন্দ্র দাশ। তিনি মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। কিন্তু একটি প্রতারক চক্র ১৯৯৯ সালের ২৩ মে সতীশ চন্দ্রের নামে একটি ভূয়া দলিল সৃজন করে তার প্রাপ্ত অংশের জায়গা খতিয়ান (যার নম্বর-৬৫০) সৃজন করে। এখন ওই ভূয়া খতিয়ান দিয়ে সতীশ চন্দ্রের ওয়ারিশের ভোগদখলীয় বাড়িভিটেও দখলে নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত প্রতারক চক্রটি।

এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহম্মদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি চকরিয়ায় যোগদানের পর থেকে একজন সেবাগ্রহীতাও প্রমাণ দিতে পারবেন না ব্যক্তিগতভাবে এবং কারো মাধ্যমে একটাকা ঘুষ গ্রহন করেছি। এখানে নামজারি জমাভাগ খতিয়ান সৃজন করতে সংশি¬ষ্ট ব্যক্তি তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করে থাকেন। হয়তো ওই প্রতিনিধিরাই আদায় টাকা আদায় করে থাকতে পারেন। আর মৃত ব্যক্তির নামে ভূয়া দলিল তৈরি এবং সেই দলিল দিয়ে যেসব খতিয়ান সৃজন হয়েছে তাও আমার আমলে নয়। এর পরও এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে আসল মালিকের নামে খতিয়ান সৃজন করে দেওয়া হবে।’ একইভাবে অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারাও তাদের বিরুদ্ধে করা এন্তার অভিযোগের জবাব দেন। গতকাল অনুষ্ঠিত গণশুনানীতে অসংখ্য ভূক্তভোগী মানুষ তাদের অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ পায়।
গণশুনানী শেষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন,‘প্রথমবারের মতো চকরিয়া উপজেলায় দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে এ ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার সকল উপজেলায়ও গণশুনানী অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি চকরিয়ায় যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে সেসব অভিযোগের ব্যাপারে গভীর তদন্ত করা হবে। এখানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা