বাংলাদেশ, , শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নামে জঙ্গি প্রশিক্ষণের অভিযোগ

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-১৬ ১৮:৩৬:১৫  

আলোকিত কক্সবাজর ডেক্স:
এবার মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ সাগর পাড়ের বাহারছড়া ইউনিয়নে। অভিযোগ উঠেছে, জঙ্গি সম্পৃক্ত বিদেশি সংস্থার অর্থে এসব বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউনিয়ন সভাপতি নিজের তত্ত্বাবধানেই স্থাপন করছেন এসব। টেকনাফ সীমান্তের এই আওয়ামী লীগ নেতা তালিকাভুক্ত ইয়াবা ও মানবপাচারকারী। তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগটনের সঙ্গে সম্পৃত্ততারও অভিযোগ রয়েছে। আর মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বসবাসের নামে কৌশলে ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণের’ সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
image_269417.a
এর আগে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরসংলগ্ন গহীন অরণ্যে বিদেশি জঙ্গি অর্থায়নে সেমি পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। ওই স্থাপনা নির্মাণের কয়েক কোটি টাকার মিশনের নেপথ্যেও জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির শ্যালক এবং উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরীর বিরুদ্ধে। গত ৫ এপ্রিল কালের কণ্ঠ’র প্রধান শিরোনামে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসব জঙ্গি সম্পৃক্ত স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উখিয়া সীমান্তের এ ঘটনার পরই জঙ্গি সম্পৃক্ত  এনজিওগুলো টেকনাফ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে কাজ শুরু  করে।

তৃণমূলের ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে বিদেশি অর্থের লোভে ফেলে সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের সাগর তীরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নামে মূলত ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশের গুরুত্বপুর্ণ একটি গোয়েন্দা সংস্থা। কয়েকদিন আগে সংস্থাটির দেওয়া এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে একদিকে মিয়ানমারের আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে জঙ্গি কার্যক্রম প্রসারেরও আশঙ্কা করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতরা ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা স্থানীয় ইয়াবা ও মানবপাচারে সম্পৃত্ত কতিপয় লোক বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাটির ওই প্রতিবেদনে।

জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আজিজ উদ্দিনের ব্যবস্থাপনায় ডেইল নামক এলাকায় পাকা খুঁটিতে টিনের ছাউনি দিয়ে একের পর এক বসতি নির্মাণ শুরু করেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজুর রহমান। এরই মধ্যে এলাকাটিতে অর্ধ শতাধিক ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সাগরপাড়ের পাহাড়ি ও অরণ্যঘেরা টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নটির অবস্থান ভৌগলিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছর ধরে এখানে নানা জঙ্গি সম্পৃক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর আনাগোনাও লক্ষ্যণীয়। রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) লোকজনেরও আসা-যাওয়া রয়েছে সাগর পাড়ের অরণ্যঘেরা এলাকাটিতে।

মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা শত শত রোহিঙ্গা আস্তানা গড়ে তোলে এই ইউনিয়নের সাগর তীরের ঝাউবাগানে। রোহিঙ্গা বস্তির  কারণে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল ডিভিশনের নির্মাণাধীন টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজও ব্যাহত হচ্ছিল। তাই দুই মাস আগে বন বিভাগ ও টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন বাহারছড়া ইউনিয়নের সৈকত এলাকার ঝাউ বাগান থেকে উচ্ছেদ করে রোহিঙ্গা বস্তি। এলাকার লোকজন জানান, বাহারছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আজিজ উদ্দিন আগে থেকেই মিয়ানমারের অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের দেখভাল করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি কয়েকটি এনজিও গোপনে রোহিঙ্গাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছে আওয়ামী লীগ নেতা মওলানা আজিজ উদ্দিনের মাধ্যমেই।

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের সদস্য মোহাম্মদ হোসেন এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা মওলানা আজিজ কিছুদিনের মধ্যে তাঁর এলাকার খাস জমিতে বহু সংখ্যক নতুন ঘর নির্মাণ করেছেন। এসবের কিছু ঘরে রোহিঙ্গাদের বসতি হয়েছে। অনেক আগে থেকেই তিনি বিদেশ থেকে ফান্ড এনে রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করেন।” স্থানীয় গ্রাম পুলিশ আবদুল করিম চৌকিদার কালের কণ্ঠকে বলেন, “একদম প্রকাশ্যে মওলানা আজিজ রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর নির্মাণ করছেন। আমি নিজেই একজন নিঃস্ব মানুষ হিসেবে ওনার নিকট একটি ঘর চেয়েছিলাম। ওনি বলেন দরখাস্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা এসব ঘরের বরাদ্দ নিয়ে ফেলেছে। ওনার (মওলানা আজিজ) নিকট রোহিঙ্গা আপনজন  নাকি আমি আপনজন- তা বুঝলাম না।”

টেকনাফ থানার ওসি আতাউর রহমান খন্দকার বলেন, “বাহারছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আজিজ উদ্দিন একজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা ও মানব পাচারকারী। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে ওসি জানান, বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এলাকা পরিদর্শন করে মওলানা আজিজের নির্মিত টিনের ঘরগুলো দেখে এসেছেন। তিনি জেনেছেন সেখানে অনেক রোহিঙ্গা থাকেন। তবে মওলানা আজিজ নাকি তাকে বলেছেন, তিনি এসব ঘর ভাড়া দেওয়ার জন্য বানিয়েছেন। ওসি আরো জানান, বাহারছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আজিজের মতো লোকজনই রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করেন।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, “মাওলানা আজিজ আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতি যেমন সত্য, তেমনি তিনি রোহিঙ্গা ও বিদেশি জঙ্গি সম্পৃক্ত বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার বিষয়টিও সত্য। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে আমরা রীতিমত বিব্রত। তবুও তিনি টাকার জোরে সবই ম্যানেজ করে যাচ্ছেন মনে হয়।”

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা বলেন, “টেকনাফে রোহিঙ্গাদের জন্য আওয়ামী লীগ নেতার ঘর নির্মাণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টির ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেছি। এমনও বলেছি ভাল করে দেখবেন উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়ার সেই রহস্যময় স্থাপনার মতো ঘটনা যাতে না ঘটে।” এদিকে, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের নির্দেশের পরপরই গতকাল মঙ্গলবার টেকনাফ উপজেলার রাজস্ব কর্মীরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন বাহারছড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজুর রহমান ডেইলে মওলানা আজিজের নির্মিত টিনের ঘরগুলো।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো মোহাম্মদ মুসা বলেন, “আমরা ভূমি অফিসের ১০ জন কর্মী সরেজমিন পরিদর্শন করে মওলানা আজিজের টিনশেড ঘরগুলো দেখে এসেছি। এগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকার লোকজন আরো অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা মাওলানা আজিজ উদ্দিন বিদেশি এনজিওর টাকায় রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। এমনকি কোরবানির সময় বিদেশি জঙ্গী অর্থায়নের টাকায় রোহিঙ্গাদের নামে শত শত গরু কিনে বিতরণ করেন গোপনে। এবারও তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য গরু কিনবেন বলে এলাকায় কানাঘুষা চলছে। এরকম শতাধিক গরুসহ টেকনাফ থানা পুলিশ মওলানা আজিজকে একবার আটকও করেছিল। রোহিঙ্গাদের জঙ্গী সংগটন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এর সঙ্গেও মওলানা আজিজের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথাও জানিয়েছে এলাকাবাসী।

এসব ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা মওলানা আজিজ উদ্দিন বলেন, “আমি মাত্র আটটি ঘর করেছি। এলাকার আজিজুর রহমানের ছেলেদের নিকট থেকে জমি কিনেছি। জমির দখলসত্ত্ব নিশ্চিত এবং ভাড়া দেওয়ার জন্য ঘরগুলো করা হয়েছে। অন্য ঘরগুলো স্থানীয় লোকজনের নির্মাণ করা। আমি জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত নই।” সূত্র-কালেরকন্ঠ


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা