বাংলাদেশ, , বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

হাতে ফুল বা থালাবাসন নয়, থাকুক বই

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-১২ ০৯:৪০:৫০  

আলোকিত কক্সবাজার ডেক্স॥

বিশ্ব শিশু দিবসের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুদের জন্য পড়াশুনা ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলেছেন। কিন্তু এ দেশের অনেক শিশুকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হচ্ছে। যে বয়সে তাদের স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সে এই শহরেই এসব শিশুদের কেউ কেউ হয়ত ফুল বিক্রি করছে, কেউ কারখানায় কিংবা বাসা বাড়িতে বা অন্য কোথাও শিশুশ্রমে নিয়োজিত। তাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্নের কথা বলেছেন, তারা হয়ত কোনোদিন তা জানবেই না।

ছয়-সাত বছরের শিশু রুবেল কারওয়ান বাজার এলাকায় ফুল বিক্রি করে। গাড়ি এলেই ফুল নিয়ে দৌড়ে জানালার কাছে যায়। ফুলগুলো তার শতছিন্ন বস্ত্রের মতোই মলিন, কেউ কিনছে না। দুয়েক জন হয়ত তার হাতে দুই টাকা বা পাঁচ টাকা দিয়ে বিদায় করেন।
রুবেলের মতোই আরেকজন হলো সুফিয়ান। বয়স কেবল দশ ছুঁয়েছে। সে কাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিমের হলের ক্যান্টিনে। ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে তার থালা-বাসন ধোয়াসহ শিক্ষার্থীদের খাওয়ানোর কাজে সহযোগিতা। সুফিয়ান একা নয়, তার সঙ্গে কাজ করছে মিজান, সেলিম, রিপন, ফারুক, নাসির। অথচ এ বয়সে ওদের থাকার কথা ছিল স্কুল বা সহপাঠীদের সঙ্গে খেলার মাঠে।

জীবন ধারণের জন্য হাতে ফুল কিংবা থালা-বাটি নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়তে ওদের হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা। কিন্তু দারিদ্রতা, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বহীনতায় এসব ছোট্ট শিশু রাস্তায় রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে কিংবা করছে অন্য কোনো ভারি কাজ।

পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করতেই সুফিয়ানের উত্তর, ভাইয়া আন্নেরা তো হড়া-ল্যাহা (পড়ালেখা) কইচ্ছেন, আরা (আমরা) গরিপ মানুষ হড়াল্যাহা কইরা কী করমু। আরা কাম করি, আন্নেরা (আপনারা) হড়াল্যাহা করেন। অর্থাৎ তার ধারণা সে যেহেতু দরিদ্র, তার পড়াশোনার দরকার নেই। পড়াশোনা করবে বিত্তবানরা। আর আমরা যেহেতু পড়াশোনা করছি, তার না করলেও চলবে।

তার উত্তর আমাদের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত, সচেতন, দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে দাবি করি, তারা আদৌ তা কি না? কিংবা এই যে রাষ্ট্রীয় টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করেছি, তা-ই বা আমাদের কী শিখিয়েছে?

যেখানে এসব শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র কিংবা আমাদের মতো দায়িত্ববান সচেতনদের নেওয়ার কথা, সেখানে উল্টো এসব শিশুই আমাদের জন্য কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও চাইলে কিন্তু পারতাম তাদের স্কুলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করতে। প্রতিটি হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১৫০০ জন সচেতন শিক্ষিত মানুষ বাস করছে, যারা প্রতি মাসে ১০ টাকা করে দিলেই এ রকম ১০টি শিশু যেতে পারত স্কুলে। কিন্তু আমরা শিক্ষিতরা সেই দায়িত্বটুকু নিইনি। আর রাষ্ট্রও এসব শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি।

দেশের প্রচলিত শিশুশ্রম আইনানুযায়ী, ১৪ বছরের নিচের শিশুদের দিয়ে কাজ করানো দণ্ডনীয় অপরাধ। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব শিশুর জন্য রাষ্ট্র অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ বিধান প্রণয়ণ করতে পারবে। সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী কোনোকিছু করাও আইনত সিদ্ধ নয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের আমাদের মতো দরিদ্র দেশে এসব কথা তোলাও কঠিন। এসব শিশুর কাজ না করলে হয়ত তাদের না খেয়েই থাকতে হবে। কিন্তু এ রাষ্ট্র বা সমাজের একটা ক্ষুদ্র উদ্যোগেই এদের ভবিষ্যত হতে পারত উজ্জ্বল।

বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোনোভাবেই শিশুদের ওপর নির্যাতন মেনে নেওয়া যাবে না। এটা বন্ধ করতে হবে। শিশুদের দিয়ে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। শিশুদের কাজ পড়াশোনা করা।

শিশুদের শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে আমাদের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে। এ দুই মন্ত্রণালয়কে আমি নির্দেশ দিচ্ছি, একটি শিশুও রাস্তায় ঘুরবে না। একটা শিশুও মানবেতর জীবনযাপন করবে না।

সূত্র-বাংলা নিউজ


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা