বাংলাদেশ, , বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে শাহপরীর দ্বীপ

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-০৭ ০০:৫৪:৩৮  

নুরুল হোসাইন টেকনাফ
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাধ ভাঙ্গা। যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত কোন সড়ক নাই। জন নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফাঁড়ি নাই। স্বাস্থ্য সেবার কোন ব্যবস্থা নাই। স্কুলের অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ নাই। শাহপরীরদ্বীপের চারদিকে প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছে শুধু নাই আর নাই। এ থেকে উত্তোরণের উপায়ও জানা নেই দ্বীপের ৩৫ হাজার মানুষের। তবে ক্ষতবিক্ষত আর বিধস্ত দ্বীপটিতে অচিরেই বেড়িবাধ নির্মাণ হবে এমন আশায় আছেন দ্বীপবাসী।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদ সুত্রে জানা যায়, ইউনিয়নে ৯ টি ওয়ার্ডের ৩ টি শাহপরীরদ্বীপে। যার আয়তন প্রায় ১২ হাজার একর । তবে ৩৫ হাজার বাসিন্দার ওই দ্বীপের আয়তন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে।
সুত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে ২২ জুলাই প্রবল জোয়ারে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপের পশ্চিমপাড়ার একাংশের বেড়িবাধ ভেঙ্গে যায়। এরপরে  শাহপরীরদ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় আরো ৩ কিলোমিটার বেড়িবাধ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। সেই থেকে ভোগান্তির শুরু শাহপরীরদ্বীপবাসীর।  তখন থেকে সাগরের কড়াল গ্রাসে হারিয়ে গেছে  ৪ হাজার একর জমি। ডুবে রয়েছে আরো ৪ হাজার একর। আর বাকি জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষে জনবসতি।  নিত্য জোয়ার ভাটার সাথে যুদ্ধ করে তখন থেকেই বেচেঁ আছেন দ্বীপবাসী। ২০১২ সালেই আগষ্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাঙ্গতে শুরু করে দ্বীপটির সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সড়কটি। সাবরাং এর হারিয়াখালি থেকে শাহপরীরদ্বীপ উত্তর পাড়া পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার সড়ক  এখন নেই বললেই চলে। ভেঙ্গে গেছে ওই  সড়কের  মাঝের ৫ টি কালভার্ট। গত প্রায় ৪ বছর ধরে জোয়ারের সময় দুদফা নৌকায় চড়ে এবং ভাটার সময় হেটে চলাচল করছে লোকজন।
এ বিষয়ে সাবরাং ইউনিয়নের ৭ নং ওর্য়াড়ের মেম্বার  নুরুল আমিন জানান, শাহপরীর দ্বীপবাসীর দূর্ভোগের চিত্র চলাচলের ব্যবস্থার দিকে নজর দিলেই দেখা যাবে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরত্বের ওই দ্বীপে আসতে সর্বনি¤œ গুনতে হয় ৮০ টাকা। এছাড়া প্রতিদিনের জোয়ারে আর সাগরের কড়াল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে দ্বীপটি।
টেকনাফ মডেল থানার রাস্তার মোড় থেকে হারিয়াখালি পর্যন্ত যেতে গুনতে হয় ৪০ টাকা। এরপর ভাঙ্গার আধ কিলোমিটার সড়কে হেটে নৌকায় ৫ টাকা দিয়ে পার হতে হয় ২২ ফুটের একটি খাল। এরপর আবারো আধ কিলোমিটার হাটতে হয়। তারপর চড়তে হয় ইঞ্জিন চালিত নৌকায়। ১৫ মিনিটের ওই যাত্রার জন্য গুনতে হয় ২০ টাকা। নামতে হয় উত্তর পাড়ায়। এরপর আবারো সিএনজি করে শাহপরীরদ্বীপ বাজারে যেতে খরচ হয় আরো ১০ টাকা।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১ টায় শাহপরীরদ্বীপ গিয়ে দেখা যায়, দ্বীপটির রাস্তার প্রায়ই অংশ ভাঙ্গা। বেড়িবাধ ভাঙ্গা ৩ কিলোমিটার এলাকায়। জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে গ্রামে। সাগরের পানিতে তলিয়ে গেছে পশ্চিমপাড়া সহ আরো ৫টি পাড়া। পুরো দ্বীপ ঘুরে কোথাও দেখা মিলেনি একজন পুলিশের। খুঁজে পাওয়া যায়নি কোন চিকিৎসা কেন্দ্র কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা। ৬টি প্রাইমারি স্কুল থাকলেও উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র একটি। তবে  শিক্ষকের অভাব ও  শ্রেণীকক্ষ সংকট সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা।
এ বিষয়ে সাবরাং ইউনিয়নের ৯ নং ওযার্ডের মেম্বার আব্দুস সালাম জানান, বেড়িবাধের দোহাই দিয়ে সব সরকারি সংস্থা দ্বীপবাসীকে সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন। এখানে পুলিশের টহল নেই। নামে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এটি প্রায় সময় বন্ধ থাকে। এছাড়া রয়েছে শিক্ষকের অভাব ।
সাবরাং ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাঈল জানান, সরকারি সকল ধরনের  সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দ্বীপবাসী। সরকারের উন্নয়নে যখন কক্সবাজার নতুন পরিচয় গ্রহন করছে ঠিক সেই মুহুর্তে অবহেলায়  শাহপরীরদ্বীপ। তিনি আরো জানান, এখানে জেটি নির্মাণ করা হয়েছিল সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ চলাচলের জন্য। কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে সেটি হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায়  ২০১২ সালে  মাত্র ১৭ দিন চলাচল করলেও  একটি মহল সেটিকে আবারো টেকনাফ নিয়ে গেছে। এখন এ জেটিকে মায়ানমার থেকে আসা গরু-মহিষ উঠা নামা কাজে ব্যবহ্নত হচ্ছে।
সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান জানান, শাহপরীরদ্বীপ বাসীর দুঃখ কষ্ট নিয়ে  একাধিকবার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি মাসিক সভায় দ্বীপের দূর্ভোগের নিত্য নতুন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই এলাকার লোকজনের কষ্ট লাঘবে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সরকার। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়–য়া সাড়ে ৫ কিলোমিটার রাস্তা প্রায় ৪ বছর সময় ধরে চলাচলের অনুপযোগী স্বীকার করে জানান, রাস্তাটির সাথে বেড়িবাধের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তারা সড়কটি পরির্দশন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেড়িবাধ না হলে রাস্তাটি পূর্ণনির্মাণ হবে না। কাজেই আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড বেড়িবাধ নির্মাণ করুক। এরপরই সড়ক নির্মাণের বিষয়টি চিন্তা করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী  মো. সবিবুর রহমান জানান, শাহপরীরদ্বীপের ২হাজার ৬৪৫ মিটার বেড়িবাধ ভাঙ্গা। এর স্থায়ী প্রতিকারের জন্য ১০৬ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। এটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। আগামী একনেকের সভায় বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।। যেহেতু সাবরাংয়ের ইকোনমিক জোনের সাথে শাহপরীরদ্বীপের বেড়িবাধের  স¤পর্ক রয়েছে তাই আশা করা যাচ্ছে দ্রুত এ কাজের বাস্তবায়ন হবে।
তিনি আরো জানান, এবার শাহপরীরদ্বীপের বেড়িবাধ পূর্ণনির্মাণ করার পাশাপাশি সিসি ব্লক দিয়ে প্রতিরক্ষা দেয়াল জোরদার করা হবে।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা