বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

কালান্তরের কড়চা বিদেশি হত্যার পেছনে কি স্বদেশি ষড়যন্ত্র?

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-০৬ ১৮:৩৬:১০  

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

বাংলাদেশে আবার দুর্র্বৃত্তদের হাতে নিহত হলেন এক জাপানি নাগরিক। ৬৬ বছর বয়সের কুনিও হোশি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি মহিষওয়ালা মোড়ে মুখোশপরা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঢাকায় কিছুদিন আগে ইতালীয় নাগরিক সিজারে তাভেল্লাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, অনেকটা একইভাবে হত্যা করা হয়েছে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে। তিনি রংপুরের ওই এলাকায় দুই একরের ঘাসের জমি ইজারা নিয়েছিলেন এবং একটি প্রজেক্ট তৈরি করে ফান্ড গঠনে সহায়তা দিচ্ছিলেন। মনে হয় এই দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেই রয়েছে একই উদ্দেশ্য।

দুটি হত্যাকাণ্ডেরই দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস। কিন্তু দুজন নিরীহ বিদেশি নাগরিকের এই নিষ্ঠুর হত্যার পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল তা তারা বলেনি। দুজন বিদেশি নাগরিকই ছিলেন ব্যবসায়ী, বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে তাঁরা জড়িত ছিলেন না এবং ধর্ম সম্পর্কেও তাঁরা কোনো মতামত প্রকাশ করেননি। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে কেন দুজন নিরীহ বিদেশি নাগরিককে হত্যা করল?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘ঢাকায় ইতালির নাগরিক হত্যা ও রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যার পেছনে একই উদ্দেশ্য রয়েছে। বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিই এ উদ্দেশ্য।’ কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা বিশ্বাস করেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘এই সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ তাহলে আর কারা দেশে এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র পাকাতে পারে? বিএনপি-জামায়াত জুটি কি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার ঘোষণা প্রকাশিত হওয়ার আগেই ইতালীয় নাগরিক ঢাকায় নিহত হওয়ায় অনেকের মতো আমারও মনে হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডের রায়ের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের হয়তো কোনো সম্পর্ক নেই। পুলিশের উচিত এই হত্যাকাণ্ডের হোতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত করা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় প্রকাশিত হওয়ার পরপরই দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ড- অর্থাৎ জাপানি নাগরিক হত্যা থেকে মনে হয় এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড বহাল থাকার রায়ের সংশ্লিষ্টতা আছে। যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক গোষ্ঠীই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক গোষ্ঠীর নামের তালিকায় প্রথম দুটি নামই আসে বিএনপি ও জামায়াতের। যাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রয়েছে তাদের একজন বিএনপির, আরেকজন জামায়াতের সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতা। ঢাকায় সাংবাদিক মহলে আমার কোনো কোনো বন্ধুর ধারণা, যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড বহাল রাখার রায় ঘোষিত হওয়ার আগে ইতালীয় নাগরিককে হত্যা করা ছিল ওয়ার্নিং শট। অর্থাৎ সতর্কীকরণমূলক গুলি। এই হত্যার বার্তাটি ছিল, দুই যুদ্ধাপরাধীর দণ্ডের রায় বহাল রাখা যেন না হয়। হলে আরো হত্যা। দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডে তথা জাপানি নাগরিককে হত্যার উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা সাধন। বার্তাটি হলো আরো রক্তপাত ঘটানো হবে।

এত দিন বিএনপি-জামায়াত দেশে কম রক্তপাত ঘটায়নি। তাদের সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে স্বদেশিরা। এবার বেছে বেছে বিদেশিদের টার্গেট করা হচ্ছে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতেও খুব কষ্ট করতে হয় না। স্বদেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি দ্বারা অসংখ্য নিরীহ স্বদেশিকে পেট্রলবোমায় হত্যা করেও অরাজকতা ঘটানো যায়নি, সরকারেরও পতন হয়নি। বরং সরকার শক্ত হাতে এই সন্ত্রাস দমন করেছে। জনগণও এই সন্ত্রাসের জন্য বিএনপি-জামায়াতের ওপর বিগড়ে গেছে। বেগম জিয়া ‘শান্তি ও গণতন্ত্রের’ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে তাই বিদেশে গেছেন। এই শান্তি ও গণতন্ত্রের লেবেল লাগানো ঝুলির মধ্যে নতুন ধরনের ষড়যন্ত্রের নীলনকশা থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই। এমনকি বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল বিদেশি মহলেরও এই নীলনকশার সঙ্গে যোগসাজশ থাকতে পারে।

এগুলো অনেকের মতো আমারও অনুমান। এই অনুমান সম্ভবত অমূলক নয়। কোথাও ধোঁয়া উদ্গিরণ হলেই যেমন বোঝা যায় নিচে আগুন আছে; তেমনি ঢাকা ও রংপুরে দু-দুজন বিদেশি হত্যা থেকেও বোঝা যায় এটা অকারণ হত্যা নয়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। এই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য, স্বদেশি মেরে অরাজকতা সৃষ্টি করতে না পেরে এখন বিদেশি হত্যা দ্বারা বিদেশিদের মনে ভয় ঢুকিয়ে তারা দলে দলে যাতে বাংলাদেশ ছাড়ে তার ব্যবস্থা করা। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ও সাম্প্রতিক বিশাল অর্জনগুলো ধ্বংস করা। বিদেশি সহযোগিতায় বাংলাদেশের যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘটছে তা ব্যাহত করা। সবশেষে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ওপর বিদেশের বড় বড় রাষ্ট্রেরও যে আস্থা ও সমর্থন গড়ে উঠেছে, তা নষ্ট করে সরকারের পতন ঘটানো।

বাংলাদেশে আইএস নেই- এ কথা বলা যাবে না। তাদের শক্ত ঘাঁটি এখনো গড়ে ওঠেনি। তার দরকারও নেই। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে জামায়াত ও আরো কয়েকটি উগ্রপন্থী দলের। অতীতে তারা সন্ত্রাস চালিয়েছে। ব্লগার হত্যা করেছে। এখন হয়তো নতুন ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য তারাই বিদেশি নাগরিক হত্যায় তৎপর হয়েছে। কিন্তু পুলিশ ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর জন্য আইএসের নাম ব্যবহার করছে, তাদের নামে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকারের প্রচার চালাচ্ছে।

এই বিদেশি নাগরিক হত্যা যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। ঢাকায় একজন ইতালীয় নাগরিক খুন হতেই পশ্চিমা দেশগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ব্রিটিশ নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিম বাংলাদেশে খেলতে আসেনি। আগেই বলেছি, ষড়যন্ত্রকারীরা হয়তো আশা করছে, এভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর আস্থা ও সমর্থন নষ্ট করে ও হাসিনা সরকারর সাম্প্রতিক বিশাল অর্জনগুলো নস্যাৎ করে দিয়ে তারা দেশটিতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে পারবে।

আশার কথা, হাসিনা সরকার সময় থাকতে এই ষড়যন্ত্রের নতুন ধাঁচটি ধরতে পেরেছে। এখন এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার দায়িত্ব সরকারের। একদিকে বিদেশে গিয়ে এই সরকারকে ব্যর্থ ও অগণতান্ত্রিক সরকার বলে প্রচার চালানো আর অন্যদিকে স্বদেশে আইএসের তকমা লাগিয়ে বিদেশি হত্যা দ্বারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংসের চেষ্টা- এই দুই ফ্রন্টের ষড়যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ ও সম্পৃক্ততা কতটা তা সরকারকে খতিয়ে দেখে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য দেশবাসীকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকারের সব অর্জন ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। দেখবেন এই হত্যাকারীদের ধরা হবে এবং বিচারও করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি আমেরিকায় একটি কলেজে ঢুকে ৯ জনকে হত্যা ও অস্ট্রেলিয়ায় গোলাগুলিতে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে যে কথা বলেননি, তা হলো পশ্চিমা দেশগুলোতে বাংলাদেশের চেয়েও বড় বড় সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলেও তাকে গুরুত্ব না দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে কিছু ঘটলেই কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ রীতিমতো হুলুস্থুল শুরু করে দেয়। এই ভূমিকার দ্বারা কোনো কোনো পশ্চিমা মহল দেশটিতে নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার কাজেও সহায়তা জোগাতে চায় বলে দেখা গেছে।

ঢাকা ও রংপুরের বিদেশি হত্যাকাণ্ড যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তাতে সন্দেহে নেই। শুধু হত্যাকারীদের ধরা নয়, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রও উদ্ঘাটন করতে হবে। তাহলে দূর অথবা অদূর ভবিষ্যতে আরো বিদেশি হত্যার আশঙ্কা নিবারণ করা যাবে। এ দুটি হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আরো বিদেশি হত্যাকাণ্ড দ্বারা দেশে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। দুটি হত্যাকাণ্ডে সরকারের সব অর্জন নষ্ট হয়নি এ কথা সত্য; কিন্তু দুটি হত্যাকাণ্ডের নায়করা যদি অবিলম্বে ধরা না পড়ে ও আরো হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে তাহলে সরকারের ক্রেডিবিলিটি অবশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে এবং সম্প্রতি অর্জিত সরকারের বিশাল অর্জনগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। সুতরাং এই বিদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও তাদের পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।

এ ব্যাপারে আমার নিজের মনের একটি সন্দেহের কথা বলতে চাই। আলজেরিয়া থেকে শুরু করে আরব দেশগুলোতে রহস্যজনকভাবে যে আরব বসন্তের শুরু হয়; তাতে আমেরিকাসহ কোনো কোনো পশ্চিমা দেশকে দেখা গেছে, জঙ্গি মৌলবাদীদের সহায়তা জুগিয়ে সংশ্লিষ্ট আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে তারপর মৌলবাদীদের উৎখাত করার নামে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের ব্যবস্থা করতে। তাতে দেশটিতে শুরু হয় অনাবশ্যক রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ। মিসরে ইসলামিক ব্রাদারহুডের মুরসিকে ক্ষমতায় বসানোর পর তাঁকে উৎখাতের নামে সামরিক জান্তাকে ব্যবহার করে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা করা হয়েছে, তা থেকে এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশের শিক্ষা গ্রহণের রয়েছে।

বাংলাদেশ নিয়েও এই ধরনের কোনো সীমিত তৎপরতা চলছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হাসিনা সরকারকে অনুরোধ করছি। আমেরিকা এক হাতে যাকে পুরস্কৃত করে, অন্য হাতে থাকে তাকেই বধ করার অস্ত্র। এ জন্যই মৌলবাদী বৌদ্ধভিক্ষুদের উস্কে দিয়ে সায়গনে নিজেদের তাঁবেদার প্রেসিডেন্টের পতন ঘটানোর পর যখন আবার বৌদ্ধভিক্ষু দমন শুরু হয়, তখন নিহত প্রেসিডেন্টের শ্যালিকা ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই বলেছিলেন, ‘আমেরিকা যার মিত্র হয়, তার কোনো শত্রুর দরকার নেই।’

লন্ডন,


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা