বাংলাদেশ, , বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

বিজেপি দাওয়াই–১ ভোটের রাজনীতির হাতিয়ার সংখ্যালঘুরা

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-০৪ ০০:১০:৪১  

সোহরাব হাসান |

সম্প্রতি নেপালের পার্লামেন্ট হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণাসংবলিত বিল নাকচ করে দিয়েছে। গ্রহণ করেছে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। নেপালের সরকার বলেছে, দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অটুট থাকবে।
অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সংখ্যালঘু (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান, শিখ, পার্সি প্রভৃতি) নাগরিকদের সেখানে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে প্রতিবেশী দেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে যাঁরা ভারতে এসেছেন অথবা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে ফিরে যাচ্ছেন না, তাঁদের সেখানে থাকতে কোনো বাধা নেই।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণা এমন সময়ে এল, যখন অভিবাসী সমস্যাটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় চলছে। জাতিগত ও ধর্মীয় কারণে হাজার হাজার মানুষ দাঙ্গা ও যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবিক কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ অভিবাসী নেওয়ার কথা বলেছে।
তবে ভারতের বিজেপি সরকার মানবিক বোধে তাড়িত হয়ে যে এ সিদ্ধান্ত নেয়নি, তা হলফ করে বলা যায়। তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি বিবেচনা কাজ করেছে। এক. বিজেপির রাজনৈতিক দর্শন। দুই. ভোটের রাজনীতি। আগামী বছর আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন হবে। দুই রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর সে ক্ষেত্রে ‘হিন্দু কার্ডই’ হতে পারে মোক্ষম দাওয়াই।
গত বছর অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির নেতারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা জোরেশোরে প্রচার করছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, বিদেশ থেকে আসা অমুসলিম নাগরিকেরা হলেন ‘শরণার্থী’ এবং মুসলিম নাগরিকেরা ‘অনুপ্রবেশকারী’। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী বাহাসের কথাও আমরা ভুলে যাইনি। বিজেপি বরাবর অভিযোগ করে আসছে যে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল-বামফ্রন্ট এবং আসামে কংগ্রেস বহিরাগত মুসলমানদের ভোটার করেছে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের আশায়। আর বিজেপি বহিরাগত মুসলমানদের ভোট তেমন পাবে না বলেই বহিরাগত হিন্দুদের ভোটার করতে চাইছে।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়: আসাম রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি সরকার নির্বাহী ক্ষমতাবলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা সংখ্যালঘুদের আবাসিক অনুমতিপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণমাধ্যমটির মতে, এ ঘোষণা আসামে ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যেখানে আগামী বছর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ১৯৮৫ সালে অসম গণপরিষদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৯৭১ সালের পর যেসব অভিবাসী আসামে গিয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানোর কথা। গত ২৭ এপ্রিল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ আসাম সফরকালে আশ্বাস দেন যে তাঁদের দল রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে আসামের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলীয় মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ মানবিক কারণে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জায়গা দেওয়া হলেও সম্প্রদায়বিশেষের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
ভারতের বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই উদ্যোগের পেছনে হিন্দুত্ববাদী দর্শন কাজ করেছে। ইসরায়েলের আইনে যেমন পৃথিবীর যেখানেই ইহুদি থাকুক না কেন, তারা ইসরায়েলে যাওয়ার অধিকার রাখে, তেমনি বিজেপি মনে করে, হিন্দু জনগোষ্ঠী যেখানেই থাকুক, তারা ভারতে বসবাসের অধিকার রাখে।
আসামের বিজেপির মুখপাত্র শিলাদিত্য দেব বলেছেন, বাংলাদেশি হিন্দুদের গ্রহণ করা ভারত সরকারের দায়িত্ব। দেশভাগ হয়েছে কংগ্রেসের ব্যর্থতার কারণে, সেটি বাঙালিদের (হিন্দু) ব্যর্থতা নয়। কীভাবে ভারত এখন তাদের সাহায্য না করে পারে? নিখিল আসাম বেঙ্গল ইয়ুথ স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কমল চৌধুরীর দাবি, তাঁদের ভোটের কারণেই বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে ১৪টি আসনের মধ্যে সাতটিতে জয়ী হয়েছে। তাঁর আশা, বিজেপি হিন্দুদের পক্ষেই কথা বলবে।
এদিকে জামিয়া মিলিয়ার পলিসি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক সঞ্জয় হাজারিকা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের নাগরিকত্ব আইন ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করতে পারে না। যদি এ ধরনের কোনো আইন করা হয়, সেটি হবে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আইনটি আসামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সারা ভারতের জন্যই প্রযোজ্য হবে; যা ভারতের সেক্যুলার চরিত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আসামের কলাম লেখক সার্গা চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, মোদি অভ্যন্তরীণ সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন; কিন্তু এটি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাদের অবস্থান আরও দুর্বল হবে। কলকাতার ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ জানায়, গত জুনে বাংলাদেশ সফরের সময় মোদি বাংলাদেশি হিন্দুদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকের যে চিন্তাভাবনা করেছিলেন, তা বাতিল করা হয় সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে এই আশঙ্কায়।
নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে শিলচরের রামনগরের সমাবেশে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দুরা হুমকির মুখে আছে এবং তারা আসাম ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের কেউ যখন ভোটব্যাংক রাজনীতির খায়েশ পূরণে আসেন, তখন অন্যরা আসেন বাংলাদেশে সবকিছু হারিয়ে। আমরা যদি ক্ষমতায় যেতে পারি, তাহলে হিন্দু অভিবাসীদের এ দেশে থাকার ব্যবস্থা করা হবে।’
বিজেপির নেতারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বললেও কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে মুসলমানেরা পশ্চিমবঙ্গে আসছেন এবং ভোট বাড়ানোর জন্য তৃণমূল তাঁদের সাদরে বরণ করছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ট্র্যাজেডি হলো, এখন যে অভিযোগ বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে করছে, বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকতে একই অভিযোগ তৃণমূল তাদের বিরুদ্ধে করত।
পশ্চিমবঙ্গের গবেষক শুভনীল চৌধুরী ও শাশ্বত ঘোষ ১০ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজারে লিখেছেন, ‘অনুপ্রবেশের তত্ত্ব আসলে ধাপ্পাবাজি।’ তাঁদের দাবি, ‘অনুপ্রবেশের ফলে এই রাজ্যে মুসলমানদের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাড়েনি; বরং অশিক্ষা বা দারিদ্র্যের কারণেই মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে। একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের লাগাতার প্রচার চলছে, অন্যদিকে এই সম্প্রদায়ের উন্নয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো নতুন দিশা দেখাতে পারছে না। যে রাজনীতি চলছে, তাতে মুসলমানদের উন্নতি অসম্ভব।’
দিল্লির দৈনিক দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়তে বলা হয়: সম্প্রতি স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর দুই দেশের মধ্যে যখন আস্থা গড়ে তোলার সুবর্ণ সময় এসেছে, তখন এ ধরনের দলীয় পদক্ষেপ আবার সেটিকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
আসামের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক পারভিন সুলতানা ‘সিটিজেনশিপ ফর বাংলাদেশি হিন্দুস: সাম কনসার্নস’ নিবন্ধে লিখেছেন, যদিও হিন্দু অভিবাসীর সমস্যাটি শুধু আসামে সীমিত নয়; কিন্তু আসাম রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের কারণেই এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। মানবিক কারণে যদি নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রশ্ন আসে, তাহলে রোহিঙ্গা, চাকমা, তিব্বতি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের যারা নির্যাতিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না কেন? সেক্যুলার দেশ হয়ে ভারত নিজেকে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রকৃতিগত জন্মস্থান দাবি করতে পারে না। তাঁর মতে, বর্তমান নাগরিক আইনে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ডানপন্থী বিজেপি ও সরকারের এই হঠকারী নীলনকশা পরবর্তী সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও উত্তেজনার দিকে নিয়ে যাবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণার বিপরীতে অসম কংগ্রেস অভিবাসীদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের বিরোধিতা করেছে। সব মিলিয়ে কথিত বাংলাদেশি অভিবাসী নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে একটি উতোর-চাপান চলছে।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা