বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

মনে হচ্ছিলো, সত্যিকারের যুদ্ধক্ষেত্রে আছিজয়া-আহসান (অতিথি লেখক)

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-১০-০৩ ০৯:৪৩:১৪  

বিনোদন ডেক্স॥সৃজিত মুখার্র্জির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০১৩ সালে। ওই সময় সিঙ্গাপুরে দর্পণ চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছিলাম, ওখানে তিনিও ছিলেন। আগে থেকেই আমি সৃজিতের ভক্ত। তাকে সামনাসামনি দেখার আগে থেকেই। তার ছবি আমার সবসময়ই প্রিয়। এরপর ধীরে ধীরে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে যাই। ‘রাজকাহিনী’ সম্পর্কে তিনি সিঙ্গাপুরেই আমাকে বলেছিলেন। দেশভাগ নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন মতামতও। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওটা ছিলো একটা ট্র্যাজেডি। শুধু দেশটাকেই যে টুকরো করে ফেলা হয়েছিলো তা তো নয়, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানিও হয়। আমরা যারা বাংলাদেশের বাঙালি, তাদের কাছে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর ও আবেগের।

যখন আমি ‘রাজকাহিনী’র গল্প প্রথম শুনি, তৎক্ষণাৎ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম, এই ভাবনার সঙ্গে লেগে থাকুন। পরের বছর সৃজিত বাংলাদেশে আসেন। তার গল্পে যে চরিত্র আর স্থানগুলো ছিলো, দেশটিকে ভালো করে জানার পর, তিনি নতুন করে চিত্রনাট্যটি লেখেন। ওই সময়ই আমাকে ছবিটিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।

স্ক্রিপ্ট পড়া, ওয়ার্কশপ- এগুলো হয়েছিলো ঋতুদির (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) বাড়িতে। ওই অধ্যায়টি আমাকে যে চোখই খুলে দিয়েছে, তা নয়। ব্যাপারটা উপভোগ্যও ছিলো। কিন্তু সেটে গিয়ে সৃজিতকে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। ওই সৃজিত আবার একেবারেই আলাদা। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মানুষ। তখন সে আমার বন্ধু নয়, একজন পরিচালক! ভীষণ কঠিন, উদ্যমী। আমার ধারণা, পৃথিবীর প্রতিটি বিখ্যাত পরিচালকই নিষ্ঠুর। মনে পড়ে, ছবির প্রথম শুটিংয়ের দিনটার কথা। প্রথম শট ওকে, কিন্তু শেষ হয়েছিলো হাতে এক গভীর ক্ষত দিয়ে। কিন্তু পরিশ্রম, ব্যথা, বিশ্বাস, বন্ধুত্বের সেটা ছিলো শুরু। বুঝতে পেরেছিলাম, ছবিটিতে আমার যে চরিত্র, সেটা চারপাশে ছড়ানো। আর সৃজিত সেটাকে তার দারুণ দক্ষতা দিয়ে বের করে এনেছেন।

পরবর্তী দুই মাস ছিলো এক ধরণের মানসিক আচ্ছন্নতা। এগারোজন নারী একটি বৃহৎ শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই যুদ্ধ অস্তিত্বের জন্য, একটি পরিচয়ের জন্য। আমার মতো অভিনেত্রীর জন্য এটা তো আরও আবেগের জায়গা, যার বাবা ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে! একটি ঐতিহাসিক দলিল জন্ম নিচ্ছিলো, যাতে আমি আছি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। এটা একটা সিনেমার চেয়েও বেশি কিছু! আমার রক্তে এটা ছিলো। ‘রাজকাহিনী’তে যে সময়টা কাটিয়েছি, সেটি আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়। ঝাড়খন্দ সীমান্তর কাছাকাছি একটি প্রায় বিচ্ছিন্ন জনপদে দৃশ্যধারণ হয়েছিলো। ডিসেম্বরের শীত শীত ভাবটা শেষ হয়ে আসছে, আর আমরা আছি যুদ্ধক্ষেত্রে! এগারোজন নারী খালি পায়ে, শুধু শাড়িতে শরীর মোড়ানো, দিন নেই রাত নেই; কাজ করে চলেছি। এটা খুব কঠিন, কিন্তু আমরা যারা অভিনয় করেছি, তারা এটাকে নিয়েছিলাম চ্যালেঞ্জ হিসেবে। একটা সময়ে গিয়ে আমরা সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে, এটি একটি সত্যিকারের যুদ্ধ!

বন্দুক ও লাঠি চালানোসহ যুদ্ধের আরও যে কৌশলগুলো আছে, আমরা শিখে নিয়েছিলাম। দেশভাগের ভয়াবহতার যে সাইকোলজি, সেটিও আমাদেরকে বোঝানো হয়েছে। এ সবকিছুই আমাদেরকে গেন সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। বিষয়টি আমাদের কাছে মনে হয়েছিলো, একটি পরিবার অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। এসবের মধ্যে, তাদের কেউ-ই আমাকে বুঝতে দেয়নি, ওদেশে আমি একজন ‘বিদেশি’।

শুটিংটা ছিলো খুব কঠিন। কিন্তু কোনোকিছুই বিচ্ছিন্ন ছিলো না। আর্ট প্রপস থেকে খাবার, পোশাক থেকে মেকআপ, প্রোডাকশন টিম- সবাই, সবসময় ছিলো প্রস্তুত। চিত্রগ্রাহক অভীকদা (অভীক মুখার্জি) আর তার টিম অবশ্যই বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন। অভীকদা তো অবিশ্বাস্য! আর সবই যিনি সম্ভব করেছেন, তিনি সৃজিত মুখার্জি। আপোষহীন এবং কঠোর সৃজিত আমাদের সবার ভেতর থেকে সেরাটুকু টেনে বের করে এনেছেন।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা