বাংলাদেশ, , শনিবার, ১ অক্টোবর ২০২২

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৭-০৮-০৮ ২০:৫৬:১০  

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল॥

বাংলা ও বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস মানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদেশের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় পাতায় এই একটি নাম উজ্জল হয়ে জ্বলছে। আমৃত্যু ইতিহাস তাঁর পিছু ছাড়েনি। ভবিষ্যতও ছাড়বে না। কারণ মুজিব মানেই ইতিহাস। মুজিব মানেই বাংলার মানুষের ভাগ্যের নির্মাতা। যার হাত ধরেই হাজার বছরের হতাশাগ্রস্থ জাতিকে একই মোহনায় নিয়ে এসেছিলেন।

যার একটি আঙ্গুলের ইশারায় ক্ষতিবিক্ষত হয়েছিল পাকিস্তানের শাসক গোষ্টির ক্ষমতার মসনদ। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লাখ শহীদ আর ৩ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে।

১৯২০ সালে টুঙ্গিপাড়া জন্ম নেয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখতেন বাংলার স্বাধীনতা ও বাঙালির জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠা। শৈশব কৈশোর থেকে তিনি এই আদর্শ নিয়েই বড় হয়ে ওঠেন। তাই নিজেই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেন তিনি। এ কারণেই ইতিহাস তার পেছনে ঘুরে বেড়াতো। বাংলার মানুষের জন্য বির্সজন দিয়েছেন প্রিয় জনের ভালবাসা। যৌবনের উত্তাল সময়গুলো কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টের ভেতর। তারপরও আক্ষেপ ছিল না। কারণ তিনি জানতেন একদিন অমানিশ কেটে আসবে ভেরের আলো। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোই ছিল এক মাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ধ্বংস স্তুপের উপর দাড়িয়ে যখন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। কিন্তু মৃত্যুর আগেই ১৯৭৪ সালে ১৮ জানুয়ারি আওয়ামীলীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘শুধু একটি কথা বলে যাইÑ শেষ কথা আমার, যে কথা আমি বারবার বলেছিÑ সোনার বাংলা গড়তে হবে। এটা বাংলার জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের প্রতিজ্ঞা। আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা যখন বাংলার মানুষকে বলি তোমরা সোনার মানুষ হওÑ তখন তোমাদেরই প্রথম সোনার মানুষ হতে হবে। তা হলেই সোনার বাংলা গড়তে পারবা।’

বঙ্গবন্ধু একটি নাম নয়, বঙ্গবন্ধু নিজে একটি ইতিহাস। একটি কাব্য। তাঁকে নিয়ে লেখা শুরু করলে কোথায় শেষ হবে হয়তো লেখক ভুলে যাবে। তারপরও লেখা শেষ হবে না। বঙ্গবন্ধু জানতেন দেশের মানুষকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাই তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন সবাইকে পড়া প্রতি মনোযোগী হওয়ার জন্য বলতেন। শোকের মাসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দৈনিক বাঁকখালীর আয়োজনে আজ দ্বিতীয় পর্ব।
তাঁর শিক্ষা জীবন পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।
১৯২৭ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ বছর বয়সে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। নিজ বাড়ি থেকে সোয়া মাইল দুরে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। নয় বছর বয়সে পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন (বর্তমানে শীতানাথ মথুরানাথ ইন্সটিটিউট নামে পরিচিত)।

স্থানীয় মিশনারী স্কুলে ও তিনি পড়া লেখা করেছেন। মিশনারী স্কুলটি পাকিস্তান আমলে কায়েদ আযম মহাবিদ্যালয় এবং বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পুরুষ এদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতেন বেশি।

১৯৩১ সালে পিতা শেখ লুৎফর রহমান পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে নিজ কর্মক্ষেত্রে নিয়ে এলেন। ভর্তি করে দিলেন মাদারিপুর ইসলামিয়া হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে। ১৯৩৪ সালে মাদারিপুর হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। ডাক্তারের পরামর্শে পিতা লুৎফর রহমান পুত্র মুজিবকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে একটি চোখ অপারেশন করান। এ কারণে তিন বছর পড়াশুনা করতে পারেননি তিনি। যার ফলে ১৯৩৭ সালে পুনারয় অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। একটু বিলম্বিত হলেও পড়ালেখায় মনোযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেছার আনুষ্ঠানিক বিয়ে সম্পন্ন হয়। তাদের সংসারে ৫ সন্তানের জন্ম হয়। দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।

১৯৩৯ সালে বঙ্গবন্ধু মিশন হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এ স্কুলেই নেতৃত্বের বহিপ্রকাশ ঘটে। স্কুলের সকল কর্মকান্ড তাঁর নেতৃত্ব আসে। সে সময় বাংলার মূখ্যমন্ত্রী শে রে বাংলা একে ফজলুল হক এবং তাঁর মন্ত্রী সভার অন্যতম সদস্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শণে আসেন। ঠিক সে সময় লিকলিকে ছেলে মন্ত্রী মহোদয়ের গতিরোধ করে সামনে এসে দাড়ালো। সে তার পরিচয় দিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বললে“ স্যার আমাদের বোডিং নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। ওটা আমরা ঠিক করে দিতে চাই। ছেলেটির কথা মগ্ন হয়ে মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী বললেন“ আচ্ছা টিক আছে তোমাদের দাবি পূরণ করা হবে।
১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাকে গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়।

১৯৪২ সালে শেখ মুজিব মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ বছর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে তিনতলা বাঁদিকের সামনের সারির কোনায় ২৪নং কক্ষে থাকতেন। ছোট্ট কক্ষ, কোন ফ্যান ছিল না তখন। একটি ছোট্ট খাট। পাশেই কাঠের তৈরি পড়ার টেবিল ও চেয়ার। একটি ছোট্ট আলমারীও আছে। বর্তমানে এটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ নামে পরিচিত। তাঁর ছবি ও তাঁর সম্পর্কিত লেখা বইয়ের একটি আলমারিও আছে। পাশের ২৫ নম্বর কক্ষটিও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য রাখা হয়েছে। দরোজার পাশে দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনীও রাখা হয়েছে।
১৯৪৩ সালে ইসলামিয়া কলেজে থাকা অবস্থায় মুসলীমলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং মুসলীমলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৪৪ সালে তিনি আইএ পাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকালে তিনি বিএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক(জিএস) নির্বাচিত হন। এই বছর তিনি নির্ধারিত সময়ে বিএ পরিক্ষা দিতে পারলেন না। পরের বছর ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ৪ঠা জানুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্টা করেন। পরবর্তীতে এই ছাত্রলীগই মুক্তিযোদ্ধ এবং দেশ গঠনে ভূমিকা রাখেন। এসময় ভাষা আন্দোলনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন এবং গ্রেপ্তার হন।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীরা তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে ধর্মঘট ঘোষনা করেন। এসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের ধর্মঘটের প্রতি সমর্থণ জানান। কর্মচারীদের এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ এন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিকভাবে বঙ্গবন্ধসহ ১৫ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারসহ নানা শাস্তির ব্যবস্থা করলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জন মুচলেখা প্রদান করে শাস্তি মাপ পেয়ে যান। কিন্তু বঙ্গবনন্ধু ? তিনি তো শেখ আওয়ালের সপ্তম বংশধর এবং শেখ লুৎফুর রহমানের প্রথম পুত্র। মুচলেখা দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্দান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলেন। যারফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবকে বহিষ্কার করেন। এতে বন্ধ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পড়ালেখা। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগের আগে তিনি বলেছিলেন সসম্মানের আগে আর কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয় পর্দাপন করবেন না। সুদীর্ঘ ২৩ বছর পর ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকসু সম্মিলিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন জানানো হলো বঙ্গবন্ধুকে। তার উপস্থিতিেিত ১৯৪৯ সালে বহিষ্কার আদেশেরে মূল কপি ছিড়ে ফেলা হয় (তথ্য সূত্র-বঙ্গবন্ধুর হত্যার দলিল, মহাপুরুষ)।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা