বাংলাদেশ, , শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

চীনে মুসলিম আবাস–২ ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে বিধিনিষেধ না থাকা নয়

আলোকিত কক্সবাজার ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৫-০৯-৩০ ১০:৩৪:৪০  

শিনচিয়াংয়ের কাশগরের সড়কদ্বীপে মুসলিম ঐতিহ্যপ্রশ্ন করতেই ভদ্রলোক বললেন, ধর্ম সম্পর্কে তিনি তাঁর মনোভাব জনসমক্ষে প্রকাশ করেন না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে পড়েছেন। এখন পেশায় দোভাষী। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। কিন্তু তিনি নিজে এর সদস্য হতে আগ্রহী হননি। বললেন, ‘আমি আমার ধর্মবিশ্বাস সমাজে ফলাও করে প্রচার করি না, কিন্তু সেটা আইনের ভয়ে নয়। আইনে বাধাও নেই। কিন্তু আমি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল।’ চীনের সরকারি অফিস-আদালতে যত ধরনের ফরম পূরণ করতে হয়, তার কোথাও চীনা নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মবিশ্বাস প্রকাশ করতে হয় না। ১৮ বছর বয়সে যে-কেউ তাঁর ধর্ম পরিবর্তন করতে পারেন।
২ সেপ্টেম্বর চীনের মুসলিম-অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ শিনচিয়াংয়ের ইনস্টিটিউট অব এথনোলজি অ্যান্ড সোসিওলজির পরিচালক অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশের ২৩ জন জ্যেষ্ঠ মিডিয়া প্রতিনিধির সামনে চীনের ধর্মীয় নীতি ও মুসলিম-অধ্যুষিত শিনচিয়াংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে একটি নিবন্ধ পেশ করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে চীন এমন এক নীতি অনুসরণ করছে, যার মূল কথা হলো, ‘চীন ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তাই বলে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন ধর্মের প্রশ্নে কারও ওপর জোরাজুরি করতে পারে না। ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে বিধিনিষেধ না থাকা নয়। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস থাকুক আর না-ই থাকুক, তা নিয়ে কোনো বৈষম্য চলবে না। এ বিষয়ে কোনো ব্যত্যয় বা আইন লঙ্ঘিত হওয়া মাত্রই তার প্রতিকার হতে হবে।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৫ সালের বার্ষিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক প্রতিবেদন বলেছে, ‘চীনা সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আছে। তবে পাঁচটি (বৌদ্ধ, তাও, ইসলাম, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট) নিবন্ধিত ধর্মের অনুসারীরা ধর্মকর্ম পালন করতে পারেন। এর বাইরের ধর্মাবলম্বীরা বেশি দুর্বল। চীনা সরকার ও পার্টির সদস্যসহ ৭০০ মিলিয়নের বেশি লোকের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই। কিন্তু ধর্মানুসারীরা শক্তিশালী এবং সংখ্যায় বাড়ছে। চীনে লোকধর্ম অনুসারী ২৯৪ মিলিয়নের বেশি, বৌদ্ধ ২৪০ মিলিয়নের বেশি, খ্রিষ্টান ৬৮ মিলিয়ন এবং প্রায় ২৫ মিলিয়ন মুসলমান।’
চীনের মোট মুসলিম জনসংখ্যার অর্ধেকের বাস শিনচিয়াংয়ে, প্রদেশটির ২ কোটি ১৮ লাখ লোকের মধ্যে দেড় কোটি উইঘুর মুসলিম। ইসলাম ছাড়া সেখানে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক, প্রাচ্যদেশীয় খ্রিষ্টধর্ম বা ইস্টার্ন অর্থোডক্সি ও তাওধর্ম রয়েছে। অধ্যাপক দিলমুরাতের ভাষায়, শিনচিয়াং ধর্মের পাঁচ প্রকৃতি: যৌথতা, নৃতাত্ত্বিকতা, ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিকতা ও মিশ্রতা। তাঁর বর্ণনায়, শিনচিয়াং ইসলামের সাতটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ১. দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে মিশেছে ঐতিহ্যগত জাতিগত সংস্কৃতি, ২. সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম, ৩. সমাজ রক্ষণশীল ও বদ্ধ, ৪. ধর্মীয় ইস্যু রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ৫. বিশিষ্ট আলেম ও উলামারা স্থানীয় মুসল্লিদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। ৬. ধর্মীয় ইস্যু সর্বদাই জাতিগত ইস্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ৭. সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উইঘুর জাতিগত সংখ্যালঘু গঠনে ইসলাম অসামান্য ভূমিকা রেখেছে।
উইঘুরদের সম্পর্কে মার্কিন প্রতিবেদন বলেছে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে তারা প্রদেশটিতে মুসলিমদের ওপর ‘নিগ্রহ’ (দ্য ইকোনমিস্টও ‘নিগ্রহ’ শব্দটি ব্যবহার করে) বাড়িয়েছে। সেখানে সহিংস উইঘুর প্রত্যাঘাত (রিপ্রাইজাল) বাড়ছে। এই প্রতিবেদনে এ কথাও আছে, ‘উইঘুর, তিব্বতের বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানরা নজিরবিহীন পীড়নের শিকার।’
গত মার্চে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টার বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ২৫টি দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতার চিত্র এঁকে বলেছে, চীন ও ভারতে উচ্চমাত্রায় নিপীড়ন চলে, যুক্তরাষ্ট্রে ও বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রশ্নে সামাজিক বৈরিতা বেড়েছে। গত ১১ জুলাই দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘চীন যদিও রোজা নিষিদ্ধ না করার দাবি করেছে; কিন্তু তারা সত্যিই উইঘুর সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে, সে তার আমলা, শিক্ষক ও ছাত্রদের রোজা না রাখতে বলেছে।’ চীন পশ্চিমা মিডিয়ার এই প্রতিবেদনকে পাশ্চাত্যের ‘রোগ’ হিসেবে দেখে থাকে। গত আগস্টে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত মা মিংশিয়াং প্রথম আলোর দপ্তরে বলেছিলেন, এই রোজা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি একটি নির্জলা অসত্য প্রচারণা। আরেক চীনা কূটনীতিক প্রতিবেদককে বলেন, পশ্চিমা মিডিয়ার দাবিমতে এটা শিনচিয়াংয়ে ঘটেছে, তাহলে চীনের অবশিষ্ট মুসলমানরা কী করে নির্বিঘ্নে রোজা রাখেন? অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর জানান, শিনচিয়াংয়ে তাঁর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন রোজা রেখেছেন। গত জুনে আল-জাজিরা, সিএনএন, ব্রিটেনের টেলিগ্রাফসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছিল যে শিনচিয়াংয়ে রোজা রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। চীন তাৎক্ষণিক তা অসত্য বলে নাকচ করেছে। তবে এই খবর চীনা কর্মকর্তাদের এখনো পীড়িত করে। এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর অবশ্য উল্লেখ করেন, ‘কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানের সুযোগ নেই।’
উল্লেখ্য, শিনচিয়াং জনসংখ্যার মধ্যে উইঘুর ৪৭ শতাংশ। আর মুসলমানদের মধ্যে তারাই ৮০ শতাংশ। বাকি ২০ শতাংশ হলো অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। এরা হলো কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক, তাতার, দংশিয়াং, পাওয়ান ও সালার। এদের বেশির ভাগই সুন্নি। তবে তাই বলে তাদের সংস্কৃতি ও রীতিনীতি কিন্তু মোটেই এক নয়। এমনকি তাদের মসজিদের গঠনশৈলীতেও ভিন্নতা আছে। দশম শতাব্দীতে ইসলাম এসেছে শিনচিয়াংয়ে। শিনচিয়াংয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি উইঘুর মুসলিমরা অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুর চেয়ে উন্নতি কতটা করেছে—এর উত্তরে বলা হয়েছে, উন্নয়ন নিয়ে তারা তুলনামূলক আলোচনা করে এলাকার সঙ্গে এলাকার, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের নয়। চীনা কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে উইঘুর-অধ্যুষিত দক্ষিণ শিনচিয়াং উত্তরাঞ্চলের হানদের চেয়ে অনগ্রসর। চীনাভাষী হানরা প্রদেশটির জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। কর্মকর্তরা এ–ও স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো একটি ধর্মের লোক সংখ্যায় বেশি হলেও তারা পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। চীনে ৫৫ জাতিগত সংখ্যালঘুর বাস, কমবেশি সবারই আবাস রয়েছে শিনচিয়াংয়ে।
সরকারি নীতি হলো, সবার আগে মানুষ পরিচয়। অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর ব্যাখ্যা করলেন এভাবে: ‘ধর্মীয় নেতা ও ধর্মীয় অনুসারীরা সবার আগে চীনের নাগরিক হবেন। তাঁরা জাতি ও জনগণের স্বার্থ সবার ওপরে স্থান দেবেন এবং সংবিধান, আইন ও নীতির প্রতি তাঁরা তাঁদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।’
এক কোটির বেশি মুসলিমের প্রদেশ শিনচিয়াংয়ে মসজিদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। চীনের অন্য অঞ্চলের মুসলিমদের চেয়ে তাদের ধর্মকর্ম পালনের আলাদা রীতিনীতি স্পষ্ট। চীনা সরকারের উন্মুক্তকরণ ও সংস্কারনীতি বাস্তবায়নের শুরুতে মসজিদ ছিল দুই হাজার, এখন তা ২৪ হাজার ১০০। মুফতির সংখ্যাও তিন হাজার থেকে ২৮ হাজারে উন্নীত হয়েছে। তবে যে-কেউ যেকোনো স্থানে চাইলেই মসজিদ বানাতে পারেন না। এ বিষয়ে সরকারি বিধিবিধান আছে। সেটা মেনে দরখাস্ত করতে হয়। সরকারি পরিদর্শকের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু তা নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয় হয় না। যদিও সরকারের বিশেষ বরাদ্দে মসজিদের উন্নয়ন ঘটে। মসজিদ ও তার স্টাফের বেতন স্থানীয়ভাবে মুসল্লিরাই বহন করেন। অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থ খরচ করা হয় না, কারণ চীন রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক্করণের নীতি অনুসরণ করে থাকে।’ তবে মুফতিরা বেশ প্রভাবশালী। মুসল্লিদের ওপর তাঁদের প্রভাব যথেষ্ট। মসজিদের খুতবার বক্তব্য কঠোরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে ধর্মের প্রশ্নে তাঁরা খুতবায় সরকারি নীতি কী, সেটা ব্যাখ্যা করে থাকেন। ফতোয়াবাজি নেই। ফতোয়ার কারণে শাস্তিভোগ নেই। তবে অধ্যাপক দিলমুরাত ওমর ইঙ্গিত দেন, কট্টরপন্থীদের কেউ কেউ ফতোয়া দেওয়ার কিছু চেষ্টা চালিয়ে থাকেন।
১৪৪২ সালে নির্মিত কাশগরের ঈদগাহ মসজিদে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার মুসল্লি নামাজ পড়েন। শুক্রবার মুসল্লির সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যায়। বৃহত্তম উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদগাহ মসজিদে কমপক্ষে ৩০ হাজার লোক নামাজ আদায় শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এই মসজিদের সামনেই বর্ণাঢ্য উৎসবমুখর পরিবেশে তিন দিন ধরে চলে দলগত সামা নৃত্য। গত ৫ সেপ্টেম্বর এই মসজিদ পরিদর্শনকালে এর চত্বরে একটি মাত্র মাইক চোখে পড়ল। মাইকে আজানের ধ্বনি নির্দিষ্ট মাত্রায় ভেসে আসে। এই মাত্রা আইন দ্বারা নির্দিষ্ট করা আছে। আজানের ধ্বনি আশপাশে যাঁরা নিয়মিত নামাজে আসেন, তাঁরাই কেবল শুনতে পান বলে উইঘুর নারী দোভাষী উল্লেখ করলেন। তবে মসজিদ-সংলগ্ন বাজারে যথারীতি টুপি ও তসবির দোকানের কোনো কমতি নেই।
উল্লেখ্য, ধর্মীয় উগ্রতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় শিনচিয়াং প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ‘বিজ্ঞানসম্মত পাঁচটি প্রধান কর্মকৌশল’ গ্রহণ করেছেন। এর আওতায় ধর্মীয় আইনের উদ্দেশ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, লোকজ রীতি সংরক্ষণ, নির্দিষ্টভাবে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সে অনুযায়ী সমাধান দেওয়া, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ দেখানো ও তা উপলব্ধিতে নেওয়া এবং সরকারি আদেশ দিয়ে পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার নীতি পরিহার করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আগামীকাল পড়ুন: বেশি বাকস্বাধীনতাই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
                                       
ফেইসবুকে আমরা