বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
আলোকিত কক্সবাজার অনলাইন পত্রিকার  উন্নয়ন কাজ চলছে ; সাময়িক সমস্যার জন্য আন্তিরকভাবে দুঃখিত - আলোকিত কক্সবাজার পরিবারে যুক্ত থাকায় আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

হাসু আপার কাছে যেতে দিল না রাসেলকে

মো. শফিকুল ইসলাম:
  • প্রকাশিত সময় : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০
  • ১৩০ বার পড়া হয়েছে

শেখ রাসেল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে আলোকবর্তিকারূপে জন্মগ্রহণ করেন শেখ রাসেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার সময় নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। ১৫ আগস্ট ইতিহাসের কালো অধ্যায়। যা কোনোদিন কোনো অবস্থাতে মেনে নেওয়া যায় না এবং যাবে না।

আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৫৬ বছর। নরপশুরা এবং বাঙালি জাতির কুলাঙ্গাররা তাঁকে বাঁচতে দেয়নি। তাঁর সেই দিনের আকুতি ঘাতকদের মনকে বিন্দুমাত্র নরম করেনি! ভাবতেই কষ্ট হয়- এই ছোট শিশুকে মারার সময়ও ঘাতকদের বুক এতটুকু কাঁপেনি। তাঁকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। কী নির্মম মুহূর্ত! আমার খুব ইচ্ছা যে খুনিরা কিভাবে এই শিশুটির শরীরে বন্দুকের গুলি ছুড়েছিল! ঘাতকরা কি মানুষ না অন্যকিছু? রাসেলের একটি কথা আমি মনে করলে শরীর কেঁপে ওঠে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে মেরো না। আমাকে ছেড়ে দাও। আমি হাসু আপার কাছে চলে যাব।’

যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বড় বোন হাসু আপার সঙ্গে রাসেল জার্মানিতে যেতে পারতেন, তাহলেই হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতো। এই নিষ্ঠুর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতেন না শেখ রাসেল। অকালে হারাতাম না আমাদের এক স্বপ্ন শেখ রাসেলকে, রাসেল ছিল এক সম্ভাবনার নাম। কোমল এবং নিষ্পাপ শিশুটিকে পিতা, মাতা, ভাইসহ পরিবারের অন্যদের নিথর দেহের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে দোতলায় নিয়ে যায় নরপশুরা। তখন শেখ রাসেলের মন কেমন করেছিল? কী করেছিলেন রাসেল সেই মুহূর্তে? কী হয়েছিল সেদিন? চোখের পানি কেমন করে ঝরছিল শেখ রাসেলের? ভাবতেও পারছি না সেই মুহূর্তের কথা, কিভাবে এ রকম একটি ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতে পারে মানুষ ? এরা মানুষ নয় অমানুষ এবং নরপশু। তাই তারা এই জঘন্যতম হত্যা ঘটাতে পেরেছিল সেদিন।

শেখ রাসেল পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। শেখ রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানের সময় শেখ মুজিবের নির্দেশে রাসেলকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার সময় ব্যক্তিগত কর্মচারীসহ রাসেলকে সেনা অভ্যুত্থানকারীরা আটক করে। আতঙ্কিত হয়ে শিশু রাসেল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাব, আমি মায়ের কাছে যাব।’ পরবর্তীতে মায়ের লাশ দেখার পর মিনতি করেছিলেন, ‘আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দাও।’

ব্যক্তিগত কর্মচারী এএফএম মহিতুল ইসলামের কথা অনুসারে, ‘রাসেল দৌড়ে এসে তাকে জাপটে ধরে। তাকে বলল, ভাইয়া আমাকে মারবে না তো? শেখ রাসেলের কণ্ঠ শুনে তার অশ্রু ঝরেছিল। এক ঘাতক এসে তাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে ভীষণ নির্যাতন করল। তাকে মারতে দেখে শেখ রাসেল এএফএম মহিতুল ইসলামকে ছেড়ে দিল। বিশ্বাস করতে পারেনি সেই মহিতুল ইসলাম যে ঘাতকরা এত নির্মমভাবে ছোট্ট শিশুটাকেও হত্যা করবে। রাসেলকে ভেতরে নিয়ে গেল এবং তারপর ব্রাশফায়ার! গুলিতে শেখ রাসেলের চোখ বেরিয়ে আসে। মাথার পেছনের খুলি থেঁতলে যায়। কী কষ্টকর ! বেদনাদায়ক! ভাবাই যায় না! এতটা নৃশংসও হতে পারে মানুষ! হানাদার বাহিনীর মতো তারা নির্মম কাজটি সেইদিন ঘটাল। আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে তারা এই শিশুটিকে বাঁচতে দেয়নি।

বুলেটের আঘাতে শৈশবের দুরন্ত এবং অপার সম্ভাবনার সেই শিশুটিকে আর কোনো দিন ফিরে পাব না আমরা। যার ভেতরে আমাদের জাতির পিতার আদর্শ আবার ফিরে পেতাম। যদিও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা তারই প্রতিকৃতি এবং শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তাঁর নেতৃত্বে বাস্তবায়ন করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। ফুল যেমন মিষ্টি হাসি দিয়ে সৌরভ ছড়ানোর অপেক্ষায় থাকে, তেমনি বাঙালি জাতি শেখ রাসেল একদিন সৌরভ ছড়াবে এই অপেক্ষায় ছিল; কিন্তু কী নির্মম ইতিহাস আমরা দেখতে পারলাম ওই নরপশুদের কারণে। যে শিশুর চোখে ছিল অপার সম্ভাবনা, আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বহনকারী নির্ভীক সৈনিক হতেন যদি তিনি বেঁচে থাকতেন। দেশের সম্পদ হতেন নিঃসন্দেহে। বিকশিত হওয়ার আগে যাকে অকালে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হলো। শেখ রাসেল আমাদের ভালোবাসা, আমাদের অকালে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই শেখ রাসেলের নাম রেখেছিলেন। এই নাম তাঁর প্রিয় লেখক বার্ট্রান্ড রাসেলের অনুসরণে রাখা হয়েছিল। বিশ্ব বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য এবং তাঁর প্রিয় সন্তানের নাম রাখলেন রাসেল, শেখ রাসেল। শেখ রাসেল শৈশবে ছিলেন দুরন্ত এবং ফুটফুটে, তাঁর পরিবারের সব সদস্যের মধ্যমণি ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁর হাসু আপা তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ে বিস্তারিত রয়েছে।

শেখ রাসেলের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের মাধ্যমে শিশু শেখ রাসেলের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এই লক্ষ্যে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমার মতে শেখ রাসেলের নামে একটি সাধারণ বা ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যেখানে শেখ রাসেলকে নিয়ে গবেষণা হবে এবং তাঁর চেতনা সেখানে অধ্যয়ন হবে। বর্তমান এবং পরবর্তী প্রজন্ম এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখ রাসেল এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা সম্পর্কে জানতে পারবে।

শেখ রাসেল ছিলেন এমন একজন মানুষ, তাঁকে নিষ্পাপ, ফুল এবং পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। উচ্চশিক্ষা মানুষকে বিশুদ্ধজ্ঞানের মাধ্যমে পবিত্র করে তোলে বলে আমি মনে করি। শেখ রাসেল রাজনীতির কোথাও কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত না থেকেও অকালে রাজনীতির কারণে জীবন দিয়েছেন। তাঁকে আমরা সবাই নিষ্পাপ ফুলের সঙ্গেই তুলনা করি। তাই তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োচিত।

শেখ রাসেল শিশুকালে তাঁর পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ জাতির পিতা তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় জেলে থেকেছেন। যার কারণে শেখ রাসেল তাঁর পিতার ভালোবাসাটুকু উপভোগ করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা থেকে জানতে পারি, ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলায় আসামি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখা হয়। ছয় মাস তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের। তাঁরা জানতেও পারেননি জাতির জনক কেমন আছেন, কোথায় আছেন। তখন রাসেলের শরীর খারাপ হয়ে যায়। খাওয়াদাওয়া নিয়ে আরো জেদ করতে শুরু করেন। ছোট্ট বাচ্চা, মনের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারেন না, আবার সহ্যও করতে পারেন না। কী যে কষ্ট বুকের ভেতরে, তা তাঁর হাসু আপাসহ অন্য সদস্যরা বুঝতে পারতেন। কী যে ত্যাগ সহ্য করতে হয়েছে শেখ রাসেলকে।

সর্বোপরি ১৫ই আগস্ট ওই জঘন্যতম হত্যার সঙ্গে জড়িত যারা এখনো দেশের বাইরে আছে, তাদের দেশে এনে বিচারের ব্যবস্থা করলে শেখ রাসেলের আত্মা শান্তি পাবে বলে মনে করি। তাই সরকারকে আরো বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দেশে এনে ফাঁসির ব্যবস্থা করা হবে- এটাই আমাদের কামনা। আজ শেখ রাসেলের জন্মদিনে তাঁর বিদায়ী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক : সাবেক সভাপতি-শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। সূত্র-কালেরকণ্ঠ

অনলাইন বিজ্ঞাপন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

অনলাইন বিজ্ঞাপন

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Design and Develop By MONTAKIM
themesba-lates1749691102