শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:১৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
আলোকিত কক্সবাজার অনলাইন পত্রিকার  উন্নয়ন কাজ চলছে ; সাময়িক সমস্যার জন্য আন্তিরকভাবে দুঃখিত - আলোকিত কক্সবাজার পরিবারে যুক্ত থাকায় আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

জিয়া ছিলেন খাঁটি পাকিস্তানি সৈনিক !

ওয়াহিদ রুবেল:
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১৯৪ বার পড়া হয়েছে

জিয়াউর রহমান, ফাইল ছবি।

 

বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আড্ডায় অন্যন্য বিভিন্ন বিষয়ের মতো স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে কথা হয়। আসলে কে ঘোষক ? বঙ্গবন্ধু নাকি জিয়া ? বিষয়টি যেন পৃথিবীতে পিতা আগে সন্তানের জন্মের মতো। অনেকে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, আবার অনেকে জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। আমি এক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা যখন তুমি পাঠ কর, তখন তুমি কি কবিগুরু হয়ে যাও ? নাকি শুধুই আবৃতিকার ? বেচারা আমতা আমতা করে বললো, কোথায় ঘোষনা আর কোথায় কবিতা ? আমি আবার বললাম, আরে বেটা টেলিভিশন বা রেডিওতে কোন উপস্থাপক যদি অনুষ্ঠানের সূচী ঘোষনা করেন তাহলে তিনি কি অনুষ্ঠানের পরিচালক কিংবা প্রযোজক হয়ে যাবেন ? জিয়াউর রহমানও ছিলেন তেমন একজন। তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর লেখাটি পাঠ করেছেন। শুধু তিনি নন তার আগেও আওয়ামী লীগে নেতা এম এ হান্নান, বেতার কেন্দ্রের উদ্যোক্তা বেলাল আহম্মদসহ আটজন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পত্র পাঠ করেছেন। এ আটজনকে বাদ দিয়ে নয় নাম্বারে এসে বঙ্গবন্ধুর লেখা পাঠ করে জিয়া কিভাবে সকল কৃতিত্ব নিতে পারেন ? অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধে তার অবদান অস্বীকার করাও যাবে না। তিনি ঘোষণা পত্র পাঠ করার পরে সেনা বাহিনীতে থাকা বাঙ্গালী সৈনিক ও যুব সমাজের মাঝে সাহস বেড়েছে নিশ্চয়।

১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম কালুর ঘাট বেতর কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা বেলাল আহম্মদ’র এর ভাষায় এটি আরো সুস্পস্ট হয়ে উঠে।

তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানকে ডেকে এনে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করনো হয়। তিনি নিজে এসে পাঠ করেন নি। জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল নবম’

১৯৭১’ সালের ২৫’মার্চ রাতে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠি নিরস্ত্র জনগণের উপর অপারেশন চার্চলাইট নামে বাঙ্গালী নিধনযজ্ঞ শুরু করে। রাতেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে দেন। স্বাধীনতা ঘোষনা করার কারণে তাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় ঐতিহাসিক ৭’মার্চ ভাষনের পর।

স্বাধীনতার ঘোষনা ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার সম্পর্কে গণহত্যা ও অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী টিক্কা খান বলেন, “মুুজিবকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, কেননা আমি নিজে মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার স্বকণ্ঠ বাণী শুনেছি’

২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করার আগপর্যন্ত পাকিস্তানের সৈনিক হিসেবে কাজ করেন জিয়া। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মুজিব নগর সরকারের অধীনে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন। আর সে জিয়াকেই স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করা হচ্ছে! জিয়ার আদর্শের বন্ধুরা এ দাবির প্রতি জোরশোরে প্রচারও করেন। বিশেষ করে জিয়া পুত্র তারেক রহমানের আস্থাভাজন হতে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ এমন মিথ্যাচারে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের জন্য আমার দু:খ হয়।

আমাদের মনে রাখা উচিত ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের বেতার কন্দ্রের ঘোষণাপত্র পাঠ করার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধ শুরু হয়নি। বরং ২৫ মার্চ কালো রাত থেকে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের ক্ষমতা ছিল ১০ কিলোওয়ার্ডের। ঘোষণাটি চট্টগ্রামের বাইরে তেমন একটা শোনা যেত না। অথচ ১৯৭১’ সালে সমগ্র বাংলাদেশ এক সাথে মুক্তিযোদ্ধ শুরু হয়। দেশ প্রেমিক সকল সামরিক-বেসমারিক, ছাত্র-যুবক সবাই দেশ মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে কার কথায় যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ? তারা কি জিয়ার সে কণ্ঠ শোনতে পেয়েছিল? নিশ্চয় শোনতে পায়নি। তাদের অনুপ্রেরণা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭’মার্চের যে ভাষনের পর আর কোন কিছুর দরকার পড়ে না। তিনি ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার কথা বলে, যার যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থেকে শত্রুর মোকাবেলার কথা বলেছেন। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। সে ভাষনের পর মুক্তিকামী বাঙ্গালীর রক্তে যে আগুন ধরেছিল তা শান্ত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বারে।

আর চট্টগ্রামে বেতার কেন্দ্রে ২৭’মার্চ বঙ্গবন্ধুর লিখিত বক্তব্য মেজর জিয়া ‘অন বিহাভ অব বঙ্গবন্ধু’ বলে যে লেখা পাঠ করেছেন তা সমগ্র দেশের মানুষেকে এক করা তো দুরের কথা। অধিকন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ভাল মতো ঘোষণা শোনতে পাননি।

এটি আরো সুন্দর করে তুলে ধরেছেন সাবেক সাংসদ প্রয়াত মঈন উদ্দিন খান বাদল। ২০০৯ সালে তিনি মহান জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন মাত্র ১০ কিলোওয়ার্ডের রেডিও স্টেশন। যেটি ভাল মতো ফেনিতেও শোনা যেত না। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ একই সাথে সমগ্র দেশে শুরু হয়েছিল। সমস্ত উত্তরবঙ্গ ফুঁসে উঠেছিল। গর্জে উঠেছিল মেজর জলিল, গর্জে উঠেছিল খালেদ মোশাররফ, কেএম শফিউল্লাহ। উত্তরবঙ্গের মানুষ তারা কোন ভাষনটি শোনেছেন ? উনাদের বুঝতে হবে সমগ্র বাংলাদেশ একসাথে জেগে উঠার পেছনে যে ব্যক্তি মনোমুগ্ধ করেছিল তার নাম উচ্চারণ ব্যতিরেকে ক্ষমাগত অশ্রদ্ধা এই জাতির অধঃপতন ডেকে এনেছে’।

এবার আসি স্বাভাবিক কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। জিয়া পূর্ব পাকিস্তান স্বায়াত্বশাসনের দাবির কোন আন্দোলনে উপস্থিত ছিলেন ? উত্তর-না। জিয়াউর রহমান কোন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম এ বাঙ্গালী জাতির ম্ুিক্তর জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন ? ..না। কখন বাঙ্গালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে একটি ভাষণ দিয়েছেন ? ..না। ১৯৪৮ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত ইতিহাসের কোন জায়গায় পূর্বপাকিস্তানের শায়াত্বশাসনের দাবিতে জিয়াউর রহমান নামের কোন ব্যক্তির নাম লেখা আছে ?..না। কেউ কি সে তথ্য দিতে পারেন ? হয়তো পারবেন না। যদি রেডিওতে এ ঘোষণা প্রচার না হতো তাহলে কি এদেশে মুক্তিযোদ্ধ হতো না ? জিয়া কি মুজিব নগর সরকারের অধীনে চাকুরি করেন নি ? জিয়া কি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে চাকুরি করেন নি ? জিয়াই যদি দেশের ঘোষক বা মক্তিযোদ্ধের নেতৃত্বদানকারী কেউ হতো তবে কিভাবে মুজিবনগর সরকার থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের গঠিত সরকারের অধীনে কেন চাকুরি করবেন ? বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে কেন খেতাব নিতে হবে ? স্বাধীনতা পরবর্তী তার প্রমোশন তো বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে হয়েছিল। এতকিছুর পরও যদি তাকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে বিবৃতি দেয়া হয় তবে বুঝতে হবে তাদের বিবেক বির্বজিত হয়ে পড়েছে। তারা সত্যিই হতভাগা।

 

২৭ মার্চ পর্যন্ত জিয়া কে ছিলেন..?

মূলত ব্যক্তি জীবনে জিয়া ছিলেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একজন সুদক্ষ সংগঠক। তিনি ১৯৫৩ সালে কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্টে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে স্থানান্তরিত হয়ে আসেন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে পেশাদার ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়ে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব¡ লাভ করেন। এসময়ে একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন তিনি। ২৫’ মার্চ জিয়া পাকিস্তানের সৈনিক হিসেবে জানজুয়ার নির্দেশনায় অস্ত্র খালাসের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা সোয়াত জাহাজের দিকে যাচ্ছিলেন। সেদিন যদি ক্যাপ্টেন খালেকের দ্বারা বাঁধাগ্রস্ত না হতেন তবে তার নেতৃত্বে অস্ত্র খালাস হতো। আর সে অস্ত্র ব্যবহার হতো বঙ্গালীর উপর। জিয়া ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। না হলে সেদিন কেন তাকে দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ধরে এনে ঘোষণা পত্র পাঠ করালেন।

একজন মেজর হুট করে সামরিক ক্যু’ করে দেশের ক্ষমতা দখল করতে পারে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা বলেন, যুদ্ধ ঘোষণা বলেন কেবল রাষ্ট্রপ্রধান করে থাকেন।

 

লেখক-ওয়াহিদ রুবেল, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কক্সবাজার সরকারি কলেজ শাখা।

অনলাইন বিজ্ঞাপন

One thought on "জিয়া ছিলেন খাঁটি পাকিস্তানি সৈনিক !"

  1. ধন্যবাদ ভাই আপনাকে,সঠিক ইতিহাস স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

অনলাইন বিজ্ঞাপন

নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Design and Develop By MONTAKIM
themesba-lates1749691102