চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

ভাগ

কক্সবাজার :

রোহিঙ্গা আসার পর থেকে দেশী বিদেশী বিভিন্ন এনজিওতে চাকুরি করছে স্থানীয় মহিলারা। বিশেষ করে কলেজ পড়ুয়া নারীরা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। কিন্তু নানা কারণে চাকুরিরত মেয়েদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পেইসবুকে যথেচ্ছা লেখা হচ্ছে। আমি এ বিষয়ে বরাবরই নিরব ছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি মেয়েরা চাকুরি করবে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝে মাঝে আমারও প্রশ্ন জাগে কেন মেয়েদের নিয়ে বিরুপ এমন্তব্য শুনতে হয়। শুনতেই বা হবে না কেন, যখন আবাসিক হোটেলে নারী কর্মীরা (গুটি কয়েক) রাত্রিযাপন কিংবা মধ্যরাত পর্যন্ত ঘরের বাহিরে অবস্থান করে, তখন এসব প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সাথে নারীর চলন বলন এদিকে সেদিক হলেই আমরা আঙ্গুল তুলতে ভুল করি না। কারণ আমরা পৌরুষ! যদিও আমাদের পুরুষত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও আমরা নারীর উপর খবরদারি করতে একটু দ্বিধা করি না। মনে করি নারীরা আসলে পুরুষের দাস। তারা শুধু সংসারের কাজ করবে আর স্বামীর সেবাযতœ করবে। আর মেয়েরাও সে মতে বড় হয়েছে। নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছে। সত্যিকার অর্থে পুরুষ নারীদের ভোগ করবে।

সভ্যতার একবিংশ শতাব্দিতে এসে নামে মাত্র কয়েক নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। সামাজিক নিয়মের ভেতর থেকে নিজেকে চিনতে পেরেছে। তারাই আজ সফল। কিন্তু মেয়েদের ভুলে গেলে চলবে না এটি পুরুষ শাসিত শাসন ব্যস্থা। একটু ঘাড় বাঁকালেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে তারা। তাই সীমানার বাইরে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া বেহায়পনা কিংবা উদাসিনতাকে অধিকার বলা যাবে না। তাই ভেবে চিন্তে যতটুকু সম্ভব নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। আবার এগিয়ে যাওয়ার মানে কি হোটেলে রাত্রিযাপন কিংবা মধ্যরাতে স্টেশনে ঘুরে বেড়ানো ? নারীর স্বাধীনতা বা চাকুরি করাটা যেমন অধিকার, তেমনি সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলাও তাদের দায়িত্ব। নিজেকে সমাজ, সভ্যতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে নিজের অধিকার ভোগ করতে গিয়ে যেন অন্যের অধিকার হরণ না হয়। নিজে যে অধিকার ভোগ করবেন অন্যকেও সে অধিকার ভোগ করতে দিতে হবে। এবার আসি পুরুষদের পৌরুষত্বের কথায়। বলতে পারেন, হোটেল যে নারী কর্মী রাত্রিযাপন করলেন, তার সাথে কে ছিলো ? মধ্যরাত পর্যন্ত যাদের সাথে মেয়েটি স্টেশনে বসে আড্ডা দিয়েছে তারা কারা ছিলো ? আপনি যখন মোবাইল ফোনে কল করে বা এসএমএস করে বলেন, প্রিয়া তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাল লাগছে না। বাসা থেকে বের হবে একটু লং ড্রাইভে যাবো। তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যাবে স্বপ্নের কোন দেশে। সে কবে থেকে তোমার জন্য বসে আছি সাগরের বিশালতার মাঝে। আকাশের সব তারা গুনা শেষ হয়েছে তারপরও তোমার প্রতিক্ষায় বসে আছি। কখন তুমি আসবে। কতই না বাইনা ধরেন। কবিরাও ভাষা হারিয়ে ফেলে আপনাদের সামনে পড়ে। তুমি কি মনে করে তুমিই তাকে ভালবাস? একবারও কি তার মনের খবর নিয়েছো ? সে কি আদৌ তোমাকে ভালবাসে কিনা ? নাকি তোমার সাথে সময় পার করছে ? সে মেয়ের কি মন থাকতে পারে না ? সে কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারে না ? তোমার বুখে মাথা রেখে কি অন্যের কথা চিন্তা করতে পারে না। তুমি যখন যেভাবে কোন সুন্দরি ললনা দেখেই মুখ দিয়ে সুন্দর শব্দটি বের কর, ঠিক সেও কোন সুন্দর সুদর্শণ পুরুষ দেখলেই বলতে পারে “সুন্দর”। তোমার সাথে সময় কাটালে বলবে প্রিয়সি। অন্যের সাথে সময় কাটালে বলবে নষ্ট ! কে বলতে পারো ? আমারও এ প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। ভেবে দেখতো হোটেলে যে পতিতার সাথে সারা রাত্রি মনোরঞ্জন করেছো সে তোমার কাছে কি ছিলো ? নারী না অন্য কিছ ? নারীর বুকে বসে নিষিদ্ধ আঁধারে যৌবনের তৃষ্ণা মিটিয়েছো। সকাল হলেই তুমি সুপুরুষ। আর নারী হলো পতিতা।

যৌবনের লালসা মেঠাতে তুমি তার কাছে গিয়ে যদি সুপুরুষ হতে পারে সে কেন পতিতা হবে ? তোমাকে আনন্দ দিয়েছে হয়তো জীবন বাঁচানোর তাগিদে। আর তুমি টাকার বিনিময়ে তাকে ভোগ করেছে। তফাৎ এখানেই। তাই শুধু মেয়েদের নষ্ট না বলে নিজে কতটুকু সৎ রয়েছো সেটি একবার ভেবে দেখ। এতেই সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। কারণ তুমি আমি যদি নিজের অবস্থান থেকে ভাল কাজ করি। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করি আরো অনেক বন্দুর পথ পাড়ি দেয়া সহজ হবে। তোমার যেমন মন আছে, ভালবাসা আছে, স্বপ্ন আছে। ঠিক সে মেয়েটির মন আছে, স্বপ্ন আছে। কারো প্রতি দুর্বলতা আছে। তাকেও বাঁচতে দিতে হবে। স্বপ্ন পুরণের সুযোগ দিতে হবে। কারণ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে আমরাই একমাত্র পরিবর্তনশীল প্রাণী। সকালে কিংবা রাতে আমরা পরিবর্তন হই। আমাদের চিন্তা শক্তি আছে। অন্য প্রাণীর তা নেই। তাই কে কখন পরিবর্তন হই বুঝা মুশকিল। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে এসব নারীরা কারো কন্যা, কারো বোন, কারো স্ত্রী আবার কারো কাছে ভালবাসার মানুষ। পারিবাকিভাবে আমরা তাদের সচেতন করে তুলি। তাদের মাঝে সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন করি। তারা সহজেই বুঝতে। কারণ সবাই কম বেশি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সমস্যা একটাই তারা এনজিও কর্মী। কেন তারা চাকুরি করবে ? তারা তো এনজিওতে চাকুরি করতে পারে না। এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যদি এনজিওতে চাকুরি না করতো তবে এমন হতো না। আজ মেয়েদের নৈতিক অধ:পতন হয়েছে ! সেটি রক্ষা পেত। ভাবতে পারেন এসব কথা। আমিও মনে করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নৈতিকভাবে তো আপনার ছেলেও অধপতিত হয়েছে ঔ মেয়েটির সাথে চাকুরি করে। নৈতিকভাবে তো আপনিও নষ্ট হয়েছেন আপনার ছেলেকে চাকুরি দিয়ে। কারণ আপনার ছেলেটি মেয়েটির সাথে হোটেলে রাত্রী যাপন করে। এর জন্য আপনিও দায়ি। আপনার ছেলেকে হোটেলে যাওয়া বন্ধ করেন। আপনার ছেলেকে পতিতালয়ে যাওয়া বন্ধ করেন। দেখবেন সেখানে আর পতিতা থাকবে না।

তবে আমি লেখাটি যখন লিখতে বসি তখন পেইসবুকে একটি ভিডিও আমি বারবার দেখেছি। কোন এক নারী এনজিও কর্মীকে মারধর করছেন এক পৌরুষ। হতে পারে তাদের ভালবাসার মাঝে দুরুত্ব হয়েছে। হতে পারে নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। হতে পারে পারিবারিক কলহ হয়েছে। হতে পারে নিজেদের মধ্যে কোন আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অথবা দুজনের যৌবনের লালসার বিপত্তি হয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি..। কিন্তু ছেলেটি মেয়েটির উপর যেভাবে চড়াও হলেন তাতে সত্যিই আমি হতবাক হয়েছি। আমি বুঝেছি সত্যিকার অর্থেই আমি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করছি। ছেলেটি যখন মেয়েটি মারধর করছে তখন আশেপাশের লোকজন তাকিয়ে আছে। তারা সুন্দর একটি শ্যুটিং দৃশ্য উপভোগ করছে। মেয়ে অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের মাথায় নিজে আঘাত করার চেষ্টা করছেন। সত্যি দু:খজনক। ব্যতিত হলেও আমি আশাবাদি সময়টা পরিবর্তন হবে একদিন। নুতন সূর্য উদিত হবে। পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে নয়, আমরা মানুষের সমাজে বসবাস করবো।
তবে যতদিন আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন করতে পারবো না, ততদিন এ সমাজ পরিবর্তন হবে না।

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। এনজিওতে চাকুরি করার দুষে দুষ্ট হয়ে আমরা নারী কর্মীদের অবজ্ঞা করি। বিরুপ মন্তব্য করি। এবার এনজিওর বাইরে শিক্ষাজীবনের গল্প বলি। আচ্ছা আপনি তো কলেজে পড়েন। আপনার সাথে অনেক মেয়েরা পড়ে মনে হয়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে যখন বান্ধবিকে নিয়ে কোন পার্কে বা রেস্তোঁরায়, ঝাউবাগান, দরিয়ানগর, হিমছড়ি,, সেন্টমার্টিন, ডুলাহাজার সাপারি পার্কে বেড়াতে গয়েছিলে তখন সে মেয়েটি এনজিও কর্মী ছিল ? নিশ্চয় ছিলো না। তোমার বোন যখন প্রাইভেটের কথা বলে বয় ফ্রেন্ডের বাসায় আড্ডা দিচ্ছে তখন সে এনজিও কর্মী ছিলো না। তোমার কন্যা যখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে কারো সন্তানের হাত ধরে অজানা স্বপ্নের দেশে পালিয়েছে, তখন সে কিন্তু এনজিও কর্মী ছিলো না। আমরা তা দেখেও দেখিনা। বিভিন্ন পত্রিকার শিরোনাম হয়। হোটেল থেকে অমুক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আটক করা হয়েছে। তারা কি এনজিও কর্মী ? না তারাও এনজিও কর্মী না। তাহলে তাদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কি ? নিজেকে প্রশ্ন করে দেখ তো। বিশ্বাস করেন আর নাই করেন এনজিও কর্মী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখলে একদিন সব পরিবর্তন হবে। পুরো সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। তাই শাসিয়ে নয়, ভালবাসার মানুষকে ভালবেসে পরিবর্তন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তোমার ভালবাসা যখন তার কাছে শুণ্য মনে হবে, তখন সে অন্যের কাছে সুখ খোঁজতে যাবে।

আর এনজিও কর্মী বোনরা মনে রাখবেন, যে সমাজে আপনার/তোমার বসবাস, সে সমাজকে বুঝতে হবে, মানতে হবে। তোমার ইজ্জত, তোমার মা বাবার ইজ্জত তোমাকে রক্ষা করতে হবে। এ সমাজে তুমি এখনো নারী। মানুষ হতে পার নি। যে দিন মানুষ হবে, সে দিন তুমি বদলে যেও। তোমরা যারা পুরুষ তোমরা নারীর কাছে যেও না। নারী শুধু ভোগের জন্য নয়। সে তোমার বেঁচে থাকা আর এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। তাকে বাদ দিয়ে তোমার জীবনের পুর্ণতা আসতে পারে না। তাই তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

……..ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, সংবাদকর্মী, ৩০ আগস্ট ১৮ ইং

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ