আত্মশুদ্ধি জরুরী

আত্মশুদ্ধি জরুরী

ভাগ

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল॥

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল ক্ষমতায় আছে ১০ বছর। কিন্তু এখনো দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। দশ বছরেও তৃণমূল কর্মীদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। তবে স্থানীয় সাংসদের আশেপাশের লোকজনের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে রাতারাতি। অভিযোগ রয়েছে এক সময় যারা আওয়ামীলীগ এবং দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিদ্রুপ করতো, তারাই এখন ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। স্থানীয় সাংসদের প্রতিনিধিত্ব কিংবা সরকারি কাজ বাস্তবায়নে তাদের প্রধান্য লক্ষ্যণীয়। ফলে অনেক কর্মীরা এখন প্রকাশ্যে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছেন।

তাদের অভিযোগ, বর্তমানে সরকারের নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে এসেছে। সরকার দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে হাজার কোটি টাকার কাজ করছে। অথচ সরকারের এসব উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড সম্পর্কে জনগণ ওয়াকিবহাল নন। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে কর্মীদের সাথে দুরুত্ব থাকায় সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছে না মাঠের কর্মীরা। এমনকি সরকার দলীয় অনেক নেতাকর্মী জানেনই না সরকার দেশের কি কি উন্নয়ন করছে। সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা এমপি কেন্দ্রীক করে রেখেছেন। তাঁর পাশের লোকজন ছাড়া কেউ জানতে পারে না শেখ হাসিনার সরকার দেশের কি পরিবর্তন এনেছে। আরো কি কি কাজ হাতে নিয়েছেন। অনেক সময় দেখা যায় স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সরকারের উন্নয়নকে নিজের তহবিলের উন্নয়ন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। নিজের ঢাকঢোল পিঠাতে গিয়ে তাঁরা সরকারের প্রধানের কথাও প্রচার করতে ভুলে যান। এমন কি মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কৌশলে দুরে সরিয়ে রেখেছেন সাংসদরা এমনটাই অভিযোগ তাদের। এতে একদিকে যেমন শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন সম্পর্কে জনগণ ওয়াকিবহাল নয়, তেমনি অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের সাথে নেতাকর্মীদের দুরুত্ব বেড়েই চলছে। তাদের দুরুত্ব এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে আগামি দু’মাসে সে দুরুত্ব কমিয়ে আনা কঠিন হবে। এ অবস্থায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উভয়ের মানুষিক দ্বন্ধই প্রভাব ফেলতে পারে চরমভাবে। এমনকি দলের জয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দলের শীর্ষ নেতাদের বিষয়টি উপলব্দি করে দ্রুত আত্মশুদ্ধির পথ বেঁচে নিতে হবে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ২০১৪ সালে নির্বাচন বানচাল করতে বিএনপি-জামায়াত সমগ্র দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ আর আগুণের লেলিহান শিখায় পরিণত হয়েছিলো দেশ। এমনকি নির্বাচনের আগে ভোটকেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করে আগুণ জ্বালিয়ে দেয়। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হত্যাসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে আতংকের রাজ্যে পরিণত করেছিলো তারা। দেশ ও দলের এ কঠিন সময়ে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলো তারাই আজ বঞ্চিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকে কঠিন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে তারাই দলকে ক্ষতায় আনতে ভূমিকা রেখেছে। ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শুরু হলো নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিজস্ব বলয় তৈরির অপচেষ্টা। রাজপথের অকুতোভয় সে কর্মীদের বাইরে রেখে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে নিজের লীগ সৃষ্টি করতে অপতৎপরতা চালায়। শুরু হয় জীবনবাজি রাখা সে কর্মীদের সাথে সুবিধাভূগী এমপিদের দ্বন্ধ। সরকারি প্রতিটি সুযোগ সুবিধা এখন আওয়ামীলীগের কর্মীরা পায় না। এমপি সাহেবদের প্রচন্দের তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে। ফলে গত ৫ বছর সরকারের সুযোগ সুবিধা দলের মাঠের কর্মীদের ভাগ্যে জুটেনি। উল্টো প্রতিনিয়ত অবহেলা, আবজ্ঞা আর বঞ্চিত করে রাখা হয় তাদের। সংসদ সদস্যরা মনে করেন, আওয়ামীলীগের কর্মীরা তো নৌকায় ভোট দিবেই। তাদের এত মূল্যায়ন করার কি আছে। যদি বিএনপি-জামায়াতের কিছু লোককে নিজের লোক করা যায়, তবে নিজের ভোট ব্যাংক সৃষ্টি হবে। তখন আমায় ঠেকায় কে ? তাই স্থানীয় সাংসদরা দু’বারের সরকারের অংশিদার হলেও দলের নেতাকর্মীদের তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে সৃষ্ট দুরুত্ব কমিয়ে আনার কোন সুযোগ হয়নি। উল্টো তাদের সম্পর্ক দা-কুমড়োতে রুপ নিয়েছে। এমনকি কেউ দলের তৃণমূল কর্মীদের অভিমান ভাঙ্গানোর চেষ্টাও করেনি। দলের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে কর্মী এবং সংসদ সদস্যদের মাঝে দুরুত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে। অথচ দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরাই আওয়ামীলীগের প্রাণ। তাদের ত্যাগ আর নিরলস পরিশ্রমই বারবার দলকে ক্ষমতায় আনতে ভূমিকা রেখেছে। তাদেরই সরকারের উন্নয়নের সারথি করা হয়নি। বর্তমান সরকার দেশের আমুল পরিবর্তন করেছেন। উন্নয়ন করেছেন আকাশ, জল এবং স্থল পথের। প্রতিনিয়ত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন আর দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার অনেকগুলো সাহসি পদক্ষেপ বিশ্বের উন্নত রাষ্টগুলোকে অবাক করে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের মান মর্যদাও বিশ্বের কাছে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্ব দরবারে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা আকশচুম্বি। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তা ছাড়া পদ্ধা সেতু এবং রোহিঙ্গা ইস্যুটি নেতৃত্বের অনন্যস্থানে বসিয়েছে শেখ হাসিনাকে। অনেক রাষ্ট্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে আইডল মনে করেন। এত কিছুর পরও কেন নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। উপলব্দি করতে পারেনি এর প্রভাব পড়বে সুদুর প্রসারি। অভিযোগ রয়েছে দিন দিন স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অবহেলা, অবজ্ঞা এবং লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ফলে হাতশায় নিমজ্জিত কর্মীরা আজ মুখফুটে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। তাদের নিজেদের নায্য অধিকারের দাবি তুলেছেন। কিন্তু বিধি বাম। স্বার্থের বেড়াজালে বন্দি সংসদ সদস্যরা অভিমান ভাঙ্গার বদলে উল্টো তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে দুরুত্ব জিয়েই রেখেছেন। অথচ ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগকে কেউ হারাতে পারে না। দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় শুরু করেছেন। বারবার তিনি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন দলের সকল স্তারের নেতাকর্মীদের। বলেছেন “সরকারের উন্নয়ন জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে। এত উন্নয়ন তারপরও ভয় কিসের ? তিনি সাংসদ এবং দলের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনারা দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছেন। নিজের দল ভারি করতে বিএনপি-জামায়াতকে দলে প্রবেশ করাবেন না। এসব অনুপ্রবেশকারীদের ভিড়ে আমার তৃণমূল নেতাকর্মীরা যেন হারিয়ে না যায়। কারণ তৃণমূল নেতাকর্মীরাই আওয়ামীলীগের প্রাণ। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। তারা বরাবরই নিজের দল ভারি করতে গিয়ে উপেক্ষা করেছেন নিজ দলের ত্যাগি ও পরিক্ষিত নেতাকর্মীদের। দলের প্রধান শেখ হাসিনার আদেশ বা অনুরোধ তাঁদের কাছে উপেক্ষিত। দলের প্রধান বলেন, দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী, মাদক ব্যবসায় অভিযুক্ত, সমালোচিত, বিতর্কিত কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। এ অবস্থায় অনেক আসনে নতুন মুখের সন্ধান করছেন দলের ত্যাগী তৃণমূল এসব কর্মীরা। এতে বর্তমান সংসদ সদস্যদের সাথে তাদের দুরুত্ব আরো বেড়ে চলছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সবখানে হাইব্রীড নেতাকর্মীদের জয়-জয়কার। তাদের কারণে আওয়ামীলীগের মূল কর্মীদের দলে জায়গা হয় না। গত ১০টি বছর ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। বর্তমান সংসদ সদস্যদের সাথে তৃণমূল নেতাকর্মীদের এ দুরুত্ব কমানো না হলে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে। নেতাকর্মীদের দাবি “সুযোগ বুঝে হাইব্রীড আওয়ামীলীগ তাদের নিজ গৃহে ফেরত যাবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় ভোট কেন্দ্রে কারা ভূমিকা রাখবে তা ভাবতে হবে। কারণ বঞ্চিত নেতাকর্মীরা আগের মতো ভূমিকা নাও রাখতে পারেন। তবে যা কিছু হউক না কেন, আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ব্যক্তি নয়, নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে বসে থাকতে পারবে না।

স্থানীয় সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে বলেন, “আমাকে ছাড়া নেত্রী কাকে মনোনয়ন দেবন ? আমি গত ৫ বছরে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছি। আমি যদি মনোনয়ন পায়, তবে দলের কর্মীদের কাছে ভোট চাইতে যাবো না। তারাই আমার জন্য ভোট করবে। কিন্তু আমাকে তো দলের বাইরের ভোটগুলো সংগ্রহ করতে হবে। যারা ভোট করে তারাই জানে কিভাবে ভোট নিতে হয়। তাই দলের কর্মীর চেয়ে আমার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কাছে আনা জরুরী”। সংসদ সদস্যদের এমন আচরণে নেতাকর্মীরা আরো ক্ষুদ্ধ। নির্বাচনের আগে দলের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক সময় থাকতে আপনাদের সুযোগ্য নেতৃত্বে দলের তৃণমূল নেতকর্মীদের অভিমান ভেঙ্গে দলের বিজয় নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবেন। কারণ দল হেরে গেলে শেখ হাসিনা হেরে যাবে। শে হাসিনা হেরে গেলে দেশের উন্নয়ন হেরে যাবে, দেশের মানুষ হেরে যাবে। দেশকে আবারো পশ্চাদের দিকে নিয়ে যাবে দেশ বিরোধী চক্র। স্বপ্ন ভ্রষ্ট হবে বাংলার ১৬ কোটি মানুষের। দেশকে অস্থির করতে ষড়যন্ত্র তো লেগেই আছে। তাই সময় থাকতে দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পালন করুন। মনে রাখতে হবে, আপনার যা কিছু, তা’ই আওয়ামীলীগ দিয়েছে। নৌকা ছাড়া আপনার কোন মূল্য নেই। ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে যাবেন এ প্রত্যাশা রাখছি।

…ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, সাবেক ছাত্রনেতা কক্সবাজার। rubelcox11@gmail.com

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ