টানা বর্ষণে পানিবন্দি লাখো মানুষ : সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টানা বর্ষণে পানিবন্দি লাখো মানুষ : সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

ভাগ

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল,

মঙ্গলবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণ আর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কক্সবাজারে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বন্ধ রয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক যোগাযোগ। ঘর থেকে বের হতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষগুলো। এছাড়া পাহাড়ী ঢলে ভেঙ্গে গেছে লোকালয়ের রাস্তাঘাটও। অতিবর্ষণে পাহাড় ধ্বসে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একই পরিবারের ৪জনসহ ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পানিতে ভেসে আসা অজ্ঞাত যুবকের লাশ।

এদিকে কক্সবাজার পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্নস্থানে পাহাড় ধ্বসে অনাকাংখিত মৃত্যু এড়াতে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। এ অবস্থায় পানিবন্দি এলাকায় শুকনো খাবারের ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তভূগীরা।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, বুধবার (২৫ জুলাই ) যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে গত ২ বছরের কক্সবাজারে এমন বৃষ্টিপাত হয়নি। বুধবার ৪৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। আরো কয়েকদিন এ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী

আবহাওয়াবীদ আব্দুর রাহমান। তিনি জানান, আরো কয়েকদিন হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভবনা রয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান বলেন, মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অতি বর্ষণে বুধবার সকালে কক্সবাজার শহরের বাচামিয়া ঘোনা এলাকায় একই পরিবারের ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমরা শোকাহত পরিবারকে ১লাখ টাকা সহযোগিতা করেছি। এছাড়া ঘটনার পর থেকে পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা বসবাসকারীদের সরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করে মাইকিং করা হচ্ছে।

জানা যায়, ২৪ জুলাই বিকেল থেকে কক্সবাজারে একটানা বর্ষণ শুরু হয়। একই সাথে সাগরে জোয়ারের পানিও বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় পাহাড়ী ঢল আর জোয়ারের পানিতে কক্সবাজারের কয়েক লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। প্লাবিত হয়েছে নিম্নঞ্চাল। অতিরিক্ত পানির কারণে বিছিন্ন হয়ে পড়েছে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি এবং উখিয়া-টেকনাফ সড়কে যোগাযোগ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী এবং দিনমজুর।

খোঁঝ নিয়ে জানা যায়, রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি, রাজারকুল, ফতেখাঁরকুল, কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, চাকমারকুল, জোয়ারিয়ানালা, কাউয়ারখোপ সহ ১১টি ইউনিয়নে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব পানিবন্দি মানুষগুলোর নাওয়া খাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। বুধবার দক্ষিণ মিঠাছড়িতে পাহাড় ধ্বসে মোর্শেদ আলম নামে ২ বছরের এক শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া বাঁকখালী নদীর পানিতে ভেসে আসা অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. লুৎফুর রহমান জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করেছে অনেকে। বর্ষার সময় আমরা তাদের নিরাপদে সরে যেতে নির্দেশ দিই বারবার। কিন্তু তারা ঘর ফেলে কোথাও যায় না। গতকাল বুধবার (২৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯ টায় মিঠাছড়ি ইউনিয়নের জাকের হোসেন নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে পাহাড় ধ্বসে পড়ে। এতে তার শিশুর করুন মৃত্যু হয়। এছাড়া নদীতে এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোক্তভোগী পরিবারকে ২০ হাজার টাকার সহযোগীতা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি বলেন. অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কিছু ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এখনো বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ অবস্থা আরো পাহাড় ধ্বসের আশংকা করা হচ্ছে। এজন্য তিনি পাহাড়ের নিচে বা পাদদেশে বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

একই সাথে উপজেলা ক্ষতিগ্রস্থ ৮টি ইউনিয়নকে ১০ হাজার করে এবং অপর ৩টি ইউনিয়নকে ৫ হাজার টাকা করে তাৎক্ষনিক ত্রান সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় উপজেলা প্রশাসন থেকে। সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এ নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়াও দূর্গত লোকজনকে উপজেলার ৩৫ টি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, হোয়ানকসহ ৬টি ইউনিয়নের নিম্নঞ্চাল প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যাতায়ত ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বেড়ি বাঁধ না থাকায় একটু বর্ষা কিংবা জোয়ারের পানিতে মাতারবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যায়। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মাতারবাড়িতে পানি এসেছে। ভাটা হল্ইে পানি নিচে নেমে যাবে। এতে তেমন কোন সমস্যা হবে না।
চকিরয়া উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়ন নিম্নঞ্চাল হওয়াযয় কাকরা, কৈয়ারবিল, মানিক পুর, লক্ষ্যারছর, বরইতলী, শাহার বিল, বদরখালী, ফাসিয়াখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নঞ্চাল প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ের ঢল এবং জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

তবে উপজেলায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি বলে দাবি করেছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলী নোমান।

তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি হলেও আমার এলাকায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি। তবে জোয়ারের পানি কমে গেলে লোকালয়ে প্রবেশ করা পানি নেমে পড়বে।

কক্সবাজার সদর উপজেলায় ঝিলংজা, পিএমখালী, ভারুয়াখালী, পোকখালী, চৌফলদন্ডি, ইসলামপুরসহ বেশ কিছু ইউনিয়নের নি¤œঞ্চলের মানুষ পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে। রবারডেম বন্ধ থাকায় পাহাড়ী ঢলের পানিতে এসব এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সাথে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সহজে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার শহরের বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন নিরাপদে সরে যায়। কিন্তু এ নির্দেশ তারা অগ্রাহ্য করায় বুধবার একটি দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে। একই পরিবারের ৪ শিশু মারা যাওয়া কোনভাবে কাম্য নয়। তাই পাহাড়ে বসবাসকারী সবাইকে আমরা নিরাপদে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। বুধবার থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। নিহত পরিবারকে ২৫ হাজার করে এক লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব এলাকায় রবারডেম রয়েছে তা খুলে দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আশা করি পানি বৃদ্ধি পেলেও তা জোয়ার কমে গেলে পানিও কমে যাবে।

তবে পাহাড় ধ্বসে অনাকাংখিত মৃত্যু এড়াতে হলে স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার আহবান জানান তিনি।
এদিকে পাহাড়ী ঢলে বুধবার বিকেল থেকে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে। দক্ষিণ মিঠাছড়ির চেইন্দা এবং লিংকরোড় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এলাকায় অতিরিক্ত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সড়কে সম্পূর্ণ যোগযোগ বন্ধ থাকে।

কক্সবাজার বাস মিনিবাস গ্রুপের কর্মকর্তা আব্দুল কাইউম জুয়েল জানান, গত বুধবার রাত থেকে বাঁকখালী নদীতে প্রবল বন্যা নামলে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের চেইন্দা, বাংলাদেশ বেতারের কক্সবাজার কেন্দ্র গেইট, ও কাঁঠি রাস্তার মাথা পয়েন্টসহ কয়েকটি স্থানে প্রায় কয়েক কিলোমিটার সড়ক প্রায় কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ ছাড়াও উখিয়া উপজেলার থাইংখালী ও বালুখালী পয়েন্টেও সড়কের উপর পাহাড়ী ঢলের পানি উঠে পড়ায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। রাস্তা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় উভয় পার্শ্বে শত শত যানবাহন আটকা পড়েছে। এ সময় দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত নারী এনজিও কর্মীরা।
পানিতে আটকা পড়া ট্রাক ড্রাইভার হামিদ সিকদার জানান, টেকনাফ বন্দর থেকে লোড নিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে চেইন্দা এসে ভোর থেকে বসে থাকতে হয়েছে। এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ