রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা সন্তুষজনক নয় : জাতিসংঘ মহাসচিব

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা সন্তুষজনক নয় : জাতিসংঘ মহাসচিব

ভাগ

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল॥

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা সন্তুষজনক নয় দাবি করে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনি গুতেরেস বলেছেন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে জাতিসংঘ। সেভাবেই কাজ করছি আমরা। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হেয়ালিপনায় দ্রুত এগুনো সম্ভব হচ্ছে না।

সোমবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলার পর বিকেলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনি গুতেরেস এসব কথা বলেছেন।

এসময় তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রিত জীবন বড়ই কষ্টকর। তারা যে পরিস্থিতির মুখে পড়ে মিয়ানমার ছেড়েছে সভ্যতার যুগে তা কল্পনাও করা যায় না। বাংলাদেশ চলমান সময়ের শ্রেষ্ট মানবিক আচরণে তাদের ঠাঁই দিয়েছে। কিন্তু চলমান বর্ষায় আশ্রিতদের নিরাপদ রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া দরকার। প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২ লাখ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। প্রাণে বাঁচতে সহযোগিতা যখন দিয়েছি তখন বর্ষায় তাদের আশা ভাসিয়ে দেয়া উচিত হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে মতামত দেন জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে ক্যাম্পে আসা বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও। তিনি অবস্থানকরা রোহিঙ্গার তুলনায় এখানের জন্য আসা সহায়তাকে অপ্রতুল বলেই দাবি করেন। তাই তিনি রোহিঙ্গা সহায়তায় আরো বেশি সহযোগিতা দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানান। পাশাপাশি ঘোষণা দেন, একসাথে এস সংখ্যক লোককে আশ্রয় দিয়ে শ্রেষ্ট মানবিক আচরণ করা বাংলাদেশ সরকারকে আগের ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ছাড়াও স্বল্প সুদে নতুন ৩ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেয়া হবে।

নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জীবনাচরণ পরিদর্শনে সোমবার ক্যাম্পে আসেন জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। বেলা ১১টার দিকে ক্যাম্পে পৌঁছে তারা রাখাইনে শিকার হওয়া নির্মমতার বর্ণনা শুনে রোহিঙ্গাদের আকাঙ্খার কথা শুনতে চান।

তাঁরা প্রথমে উখিয়ার রোহিঙ্গা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত টিভি রিলে কেন্দ্র এলাকায় পৌঁছান। এর আগে বেলা ১০টার দিকে সৈকত পারের কলাতলীর তারকা হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্ট থেকে তাদের গাড়ি বহর বের হয় এবং মেরিন ড্রাইভ হয়ে সড়ক পথে উখিয়ার পথে রওয়ানা হন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আসা টীম ইউএনএইচসিআর’র বালুখালী ট্রানজিট ক্যাম্প, কুতুপালং মেইন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং মহিলাদের আলাদা জায়গা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া চরম দুর্দশার কথা শুনেন।

তিনি আরো জানান, কথা বলা শেষে অ্যান্তোনিও এবং কিমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহযোগিতা দেয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার ত্রাণ কেন্দ্র, চিকিৎসা সেন্টার ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে কুতুপালং এক্সটেনশন ক্যাম্পের ডি-ফাইভ ব্লকে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন তিনি।

সোমবার সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া খানেমসহ জাতিসংঘের অধীন বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ডজন খানেক এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছার পর ভারি বর্ষণ শুরু হওয়ায় বিশ্বের শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান প্রধান বিমান বন্দরেই কিছুক্ষণ অবস্থান নেন। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সৈকত পারে হোটেল সায়মনে। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

সংক্ষিপ্ত এ সফরে কক্সবাজারে বৈশ্বিক সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন অ্যান্তোনিও এবং ইয়ং কিম। জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট আলাদা ফ্লাইটে ঢাকা এলেও তারা বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে এক সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। বিকেলে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।

সূত্র জানায়, এর আগে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র প্রধান থাকাকালীন ২০০৮ সালের ২৭ মে গুতেরেস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশে এটাই তার প্রথম সফর। তবে বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম দুই বছর আগেই একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। এর আগে দুদিনের সফরে শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। আর তিনদিনের সফরে শনিবার বিকেলে ঢাকায় আসেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।

উল্লেখ্য, বিগত কয়েক দশকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে ৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আর গত বছরের ২৫ আগস্ট এমনই এক অভিযানের মুখে রাখাইন থেকে নতুন করে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফে অবস্থান করছে। আর জতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে শুরু থেকেই ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আসছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার গত বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করলেও তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ