টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

ভাগ

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল,
চারদিনের টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা এবং নিম্নঞ্চাল প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কিছু গ্রামের রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ। পাহাড়ি ঢলে ভাঙনের কবলে পড়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কও। জেলার চকরিয়ার মাতামুহুরি, ঈদগাঁওয়ের ফুলেশ্বরী ও কক্সবাজারের বাঁকখালীতে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় ভেঙে গেছে ঈদগাঁওয়ের নদীর বাঁশঘাটা ও পোকখালী এলাকার বেড়ি বাঁধ।বৃষ্টির পানি আর পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার কয়েক লাখ মানুষ।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন করেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।
আবহাওয়া অধিদফতর কক্সবাজার স্টেশনের কর্মকর্তা এ. কে. এম নাজমুল হক  জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে শনিবার থেকে কক্সবাজার জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। শনিবার সকাল ৬টা হতে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় ৯৪ মিলিমিটার। আর রোববার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৩০ মিলিমিটার এবং সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয় ১৬ মিলিমিটার। শনিবার থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চারদিনের গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে প্রায় ১১৪ মিলিমিটার। দিনের বেলা বৃষ্টিপাত কম হলেও থেমে থেমে বর্ষণ হয়। সন্ধ্যার পর থেকে রাতে আবারও ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস মতে এভাবে বর্ষণ আরও দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত বৃষ্টিপাত, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বেড়েছে। এ কারণে নামতে পারছে না সমতলের বৃষ্টির পানি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার সদর উপজেলার বৃহত্তর ঈদগাঁওয়ের পোকখালী ও ইসলামাবাদ, গোমাতলী, জালালাবাদ, চৌফলদন্ডি, কালিরছরা, রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি, রাজারকুল, ফতেখারকুল, চকরিয়ার উজানটিয়া, কাকরা, ভেওলা, মানিকচর, কোনাখালী, বরইতলী, খুটাখালী এলাকার কয়েক হাজার পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পানিবন্দ মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছেনি। ফলে অনাহারে দিন কাটছে পসনি বন্দি মানুষগুলোর।
চকরিয়া পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের আমান চর, কাজির পাড়া,২নং ওয়ার্ডের জেলে পাড়া, হালকাকারা, মৌলভীর চর, ৩নং ওয়ার্ডের তরছ পাড়া, ও ৮নং ওর্য়াডের নামার চিরিংগা, কোচ পাড়া, ও ৯নং ওয়ার্ডের মৌলভীর কুমসহ অনেক স্থানে বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। মালুমঘাট, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, ফুলছড়ি, ইসলামপুর ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি থৈ থৈ করছে।
বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার বলেন, পানির প্রবাহ বাড়ায় ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, ডেইঙ্গাকাটা, রসুলাবাদসহ একাধিক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।
কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার ও বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাংগীর আলম বলেন, তাদের ইউনিয়নে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  নুরুদ্দিন মোহাম্মদ শিবলি নোমান বলেছেন, পানিবন্দি এলাকায় পরিদর্শন করেছি। একটি পৌরসভা এবং দশটি ইউনিয়নে ১৫ হাজারের মতো পরিবার পানিবন্দি আছে। আমরা তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া দু’একটি বেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জরুরী সমধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর যেসব সুইজগেইট রয়েছে রাতে তা খুলে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অব্যাহত বৃষ্টির পানিতে কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোন, ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া, খরুলিয়া, দরগাহপাড়া, পোকখালীর মধ্যম পোকখালী, গোমাতলী, নাইক্ষংদিয়া, চৌফলদন্ডী, নতুনমহাল, ঈদগাঁও বাজার এলাকা, কালিরছড়া, রামুর উপজেলার ধলিরছরা, রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম মেরংলোয়া, চাকমারকুল ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর ছিদ্দিক জানান, ভারি বর্ষণে ঈদগাঁও নদীতে তীব্র বেগে ঢল নেমেছে। রোববার বিকেলে বাঁশঘাটার কাঠের সাঁকোটি ঢলে ভেসে যায়। আর সোমবার ভোরে ভাঙনের কবলে পড়ে ঈদগাঁও-গোমাতলী সড়ক কাম বাঁশঘাটা এলাকার নদীর বাঁধ। এতে বেশকিছু দোকানপাট তলিয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন রয়েছে সড়ক যোগাযোগ।
উপকূলীয় পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ বলেন, ঢলের তীব্রতায় পশ্চিম পোকখালীর সাহেবানির চর এলাকার বেডিবাঁধ ভেঙে বিশাল এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: নেমান হোসেন প্রিন্স বলেন, পানি উন্নয় বোর্ডের সদস্যসহ প্রশাসনের কর্মকর্তার প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বৃষ্টির পানির চেয়ে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেড়িবাঁধ। তবে ক্ষতির পরিমাণ নগণ্য দাবি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, উপজেলার পোকখালী ও আশে পাশের ২’শ পরিবার পানি বন্দি রয়েছেন।  তাদের জন্য জন্য জরুরী শুকনো খাবার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে  জানান তিনি। তবে প্লাবিত এলাকায় সংস্কারের জন্য কাজ করছেন এলজিইডি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান জানান, চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর তীরের কন্যারকুম, কইজ্যারদিয়া, পুরুত্যাখালী এলাকার বেড়ি বাঁধের কিছু অংশ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, অতিবর্ষণে পাহাড় ধস বা যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে স্থানীয়দের রক্ষার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ