কক্সবাজারে ট্রলার ডুবি, পাহাড় ধ্বস ও গাছ চাপায় রোহিঙ্গাসহ ৬ জনের মৃত্যু

কক্সবাজারে ট্রলার ডুবি, পাহাড় ধ্বস ও গাছ চাপায় রোহিঙ্গাসহ ৬ জনের মৃত্যু

ভাগ

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল॥ 
কক্সবাজারের পাহাড় ধ্বস, গাছ চাপা ও ট্রলার ডুবিতে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাসহ ৬জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১২ জুন) মহেশখালী ও উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধ্বস ও গাছ চাপার পৃথক ঘটনায় ২জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া মাতামুহুরী নদীর কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভেসে গেছে এক যুবক। ভারি বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে জেলার নিম্নাঞ্চাল পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ।
জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে আজ মঙ্গলবার সকালেও ২টি ট্রলার ডুবে গেছে। এ নিয়ে শনিবার রাত থেকে এপর্যন্ত অন্তত ২০টি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। ট্রলার ডুবির ঘটনায় ৩জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে।
উখিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছেন, আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে উখিয়ার ইনানীর সী পার্ল পয়েন্টে সমুদ্রে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভেসে আসা লাশ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। পরে পুলিশকে খবর দিলে ইনানীর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা লাশটি উদ্ধার করে। ধরাণা করা হচ্ছে মাছ ধরার ট্রলার ডুবির ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে।
উখিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) আবুল খায়ের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, সমুদ্র সৈকতে একটি লাশ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা আমাদের খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তবে এখনো লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে সোমবার রাত ১১টার দিকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সী গাল পয়েন্টে আজ্ঞাত আরো ১ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ। এটিও ট্রলার ডুবির ঘটনায় মৃত্যু হতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (অপারেশন) মাঈন উদ্দিন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
অপরদিকে ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৬জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও আরো অন্তত ২৫জন জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বোট মালিক সমিতির নেতারা। নিখোঁজদের উদ্ধারে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। উদ্ধার হওয়া দুটি লাশের এখনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, টানা বর্ষণে পাহাড়ী ঢলের পানিতে কক্সবাজারের মাতামুহুরী ও বাকঁখালী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাতামুহুরী নদীতে লাকড়ি সংগ্রহের সময় এক যুবক ভেসে গেছে। এখনো তার সন্ধান মিলে নি।
মহেশখালী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোর রাতে মহেশখালী হোয়ানক ইউনিয়নের পানিরছড়া এলাকায় পাহাড়ে চাপাপড়ে বাদশা মিয়া (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত বাদশা মিয়ার হোয়ানক পানিরছড়া এলাকার মৃত চান মিযার পুত্র।
ওসি বলেন, সোমবার সারা রাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে বাড়ির অদুরে নিজের সবজি খেত দেখতে যান তিনি। যাবার সময় রাস্তার পাশের ভাঙ্গা পাহাড়ের একটি অংশ ধসে বাদশা মিয়ার উপরে পড়ে। এতে মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান তিনি। উপজেলা প্রশাসন থেকে ২০ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে ভোরে উখিয়া উপজেলার জামতলী এলাকায় গাছ চাপা পড়ে এক রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অন্তত কয়েক শত ঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে আরো কয়েক হাজার ঘর। মঙ্গলবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্ষতিগ্রস্থদের দেখতে ক্যাম্প এলাকায় যান ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের হিসেবে মতে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবার অতিরিক্ত ঝুঁকিতে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে টানা বৃষ্টিতে মঙ্গলবার ৬টি ক্যাম্পে ক্ষতিগ্রস্থদের উপর জরিপ চালানো হয়। এতে ৯৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ১৩০টি ঘর একেবারে ধ্বসে যায় বলে নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। এছাড়া অন্যন্য সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে  আরো ২ হাজার ৩’শ ৫০ রোহিঙ্গা পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
সরজমিনে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্লাকের শতাধিক বসতি পাহাড় ধ্বসের কবলে পড়েছে। এতে সিংহভাগ নষ্ট হয়েছে। আর বাকিগুলো আংশিক নষ্ট হয়েছে।
ডি ৫ ব্লকের নুর বশর মাঝি বলেন, ‘আমার ব্লকে প্রায় ২৫টি ঘরের উপর পাহাড় ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্থরা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেক বাড়ির আংশিক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি লোকজন এসে দেখা করেছে। তবে এখনো নতুন করে ঘর করে দেয়ার কথা বলে নি।
একই ব্লকের জিয়াবুল হক বলেন, বৃষ্টির পানিতে রাতে আমার বাড়িতে পাহাড় ধ্বসে পড়ে। আমার আত্মীয় আব্দু রশিদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। এখানে গাদাগাদি করে থাকতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।
কক্সবাজার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, গত তিন দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। এত বাতাস আর বৃষ্টিতে কিছু ক্ষতি হতেই পারে। তবে যে পরিমাণ ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। আমাদের পূর্ব প্রস্তুতির কারণে ব্যাপক ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও মানুষের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, পাহাড় ধ্বস নিয়ে রোহিঙ্গাদের আগে থেকে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। তাই টানা বৃষ্টিতে তারাও নিজেদের মতো সতর্ক ছিল। আমরা গত তিন মাস বর্ষায় পাহাড় ধসের মৃত্যু এড়াতে কাজ করেছি বলেই, মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলা করতে আমরা সব প্রস্তুতি নিয়েছি।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট নি¤œচাপে আরো কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ