এমপিদের এক সফরে ব্যয় ৯৫ লাখ টাকা

এমপিদের এক সফরে ব্যয় ৯৫ লাখ টাকা

ভাগ

জাতীয় ডেস্ক

সংসদ সদস্যদের (এমপি) সবচেয়ে ব্যয়বহুল সফরগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন। ১২৪তম সম্মেলনে অংশ নিতে জাতীয় সংসদের ব্যয় হয় ৯৫ লাখ ১৮ হাজার ২৭৭ টাকা। মধ্য আমেরিকার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে ১৫ এমপি অংশ নেন।

এছাড়া আইপিইউ’র ১২০তম সম্মেলনে অংশ নিতে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা, ১২১তম সম্মেলনে প্রায় ৪৫ লাখ, ১২২তম সম্মেলনে প্রায় ২৬ লাখ, ১২৩তম সম্মেলনে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হয় সংসদের। ওই পাঁচ ব্যয়বহুল সফরের তিনটির নেতৃত্ব দেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। একটিতে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং অপরটিতে সাবেক প্রধান হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ নেতৃত্ব দেন।

জাতীয় সংসদের ইন্টার পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্স (আইপিএ) অধিশাখা ১ ও ২, হিসাব এবং সেবা শাখা থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে তিন মাস অনুসন্ধান চালানো হয়। আজ থাকছে এর দ্বিতীয় পর্ব।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নবম জাতীয় সংসদ গঠনের পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সংসদ সদস্যদের বিদেশ ভ্রমণ শুরু হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই তিন বছরে মোট ১১৩টি প্রতিনিধি দল ছাড়াও শুধুমাত্র সংসদের কর্মকর্তারা একবার বিদেশ সফর করেন।

জাগো নিউজের হাতে আসা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আইপিইউ সম্মেলনে যোগ দেয়া প্রতিনিধিদের পেছনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ২০১১ সাল। ওই বছরের ১৫ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পানামা সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় আইপিইউ’র ১২৪তম সম্মেলন। সেই সম্মেলনে সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর নেতৃত্বে ১৫ জন এমপি অংশ নেন। ওই সম্মেলনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের হামিদা বানু শোভার অংশ নেয়ার কথা থাকলে শেষ পর্যন্ত তিনি যাননি। সম্মেলনে আওয়ামী লীগের আটজন, বিএনপির একজন, জাতীয় পার্টি ও জাসদের একজন করে মোট ১১ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এছাড়া সংসদের কর্মকর্তা ছিলেন চারজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইপিইউ একটি বৃহৎ সংগঠন। এ সম্মেলনে যোগ দেয়ার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং এর সমাধান করা যায়। নীতিনির্ধারণীমূলক অনেক প্রস্তাব বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে সেগুলো নিজ নিজ দেশে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।’

‘অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ গেলে ব্যয় তো একটু হবেই’- যোগ করেন তিনি।

তবে এ অভিজ্ঞতার প্রয়োগ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন বিশেষজ্ঞরা। সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব ভ্রমণের বেশির ভাগই রূপ নেয় আনন্দ ভ্রমণে। অভিজ্ঞতা অর্জনে এমপিরা বিদেশ সফরে গেলেও বাস্তবে সে ধরনের কোনো নজির স্থাপন চোখে পড়েনি।’

জাতীয় সংসদের হিসাব শাখা সূত্রে আরও জানা যায়, আইপিইউ’র ১২০তম সম্মেলনে অংশ নিতে সংসদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয় ৫৪ লাখ ৫১ হাজার ৫৬ টাকা। ২০০৯ সালে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ৫ থেকে ১০ এপ্রিল ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দরিদ্রপীড়িত দেশটিতে যেতে বিমান ভাড়ার পেছনেই বেশি টাকা ব্যয় হয় বলে সংসদের এক কর্মকর্তা জানান।

১৫ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলেরও প্রধান ছিলেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। সম্মেলনে আওয়ামী লীগের আটজন, বিএনপির দু’জন, জাতীয় পার্টি ও জাসদের একজন করে মোট ১২ জন এমপি অংশ নেন। সংসদের কর্মকর্তা ছিলেন তিনজন।

তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয় আইপিইউ’র ১২৩তম সম্মেলনে। সেখানে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের পেছনে সংসদের ব্যয় হয় ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৯৮৭ টাকা। ২০১০ সালে ৪ থেকে ৬ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয় ওই সম্মেলন। সম্মেলনে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী নেতৃত্ব দেন। সেখানে আওয়ামী লীগের ১০ জন এবং বিএনপির একজন প্রতিনিধি অংশ নেন। অন্যরা ছিলেন সংসদের কর্মকর্তা।

আইপিইউ’র ১২১তম সম্মেলনে ব্যয় হয় ৪৫ লাখ ৪২ হাজার ১২৫ টাকা। ১২ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সাবেক প্রধান হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। ২০০৯ সালের অক্টোবরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তিন দিনব্যাপী চলা ওই সম্মেলনে একজন এমপির পেছেনে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৩৪৩ টাকা খরচ দেখানো হয়। উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের পেছনে খরচ দেখানো হয় এর দ্বিগুণ অর্থাৎ তার পেছনে ব্যয় হয় ছয় লাখ ১১ হাজার ২৫৫ টাকা।

সংসদের হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ সফর শেষে এমপিরা বিমান টিকিটের কপিসহ সব খরচের ভাউচার জমা দেন। সেই সময়ে প্রধান হুইপও তাই করেন। কেন তার পেছনে বেশি খরচ হলো- এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘পদাধিকার বলে আমি কিছু বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। এজন্য বেশি খরচ হয়েছে।’

ওই প্রতিনিধি দলে আওয়ামী লীগের সাতজন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একজন করে এমপি অংশ নেন। সংসদের কর্মকর্তা ছিলেন তিনজন।

তবে ২০১০ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইপিইউ’র ১২২তম সম্মেলনে সংসদের সবচেয়ে কম টাকা ব্যয় হয়। ওই সম্মেলনে অংশ নেয়া ১৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলের পেছনে ব্যয় হয় ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৪৪ টাকা। এখানেও নেতৃত্ব দেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী।

ওই প্রতিনিধি দলে আওয়ামী লীগের ১০ জন, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। সংসদের কর্মকর্তা ছিলেন চারজন।

আইপিইউ’র সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ফোরামে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন এমপি বিভিন্ন কমিটিতে আছেন। তাদের সম্মেলনে যেতে হয়। সম্মেলনগুলোতে যোগ দেয়ার জন্য কিছু টাকা আয়োজক সংস্থাও দেয়।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এমপিরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে বিদেশ যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা কী করেন- সেটা আমরা জানি না। এসব ভ্রমণ যাতে আনন্দ ভ্রমণে পরিণত না হয় সেজন্য সংসদ তাদের কাছে একটি প্রতিবেদন চাইতে পারে।’

‘আর দেশে এসে অর্জিত অভিজ্ঞতা কী কাজে লাগবে বা লাগানো যাবে, সে বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকলে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না’- যোগ করেন তিনি।

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ