বেপরোয়া কক্সবাজার কলেজ ছাত্রলীগ

বেপরোয়া কক্সবাজার কলেজ ছাত্রলীগ

ভাগ

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার.
কক্সবাজার সরকারি কলেজে বিরোধপূর্ণ জমিতে রাস্তা নির্মাণ প্রশাসন কর্তৃক স্থগিত করে দেয়ায় ক্ষুদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে এবার লাঞ্চিত হয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষসহ শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ভাংচোর করা হয়েছে প্রশাসনিক ভবনের বাইরের বিভিন্নাংশ। এসময় বাইরে থেকে তালা দিয়ে কলেজ অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখে হামলা কারিরা। এ নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিক্ষুদ্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষক লাঞ্চনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন। সোমবার দুপুরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও অধ্যক্ষকের কক্ষে তালা লাগিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সরঞ্জাম ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপকি জাকির হোসেন বলেন, কলেজের রাস্তা নির্মাণের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। ছাত্রলীগের নেতারা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এই নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে আমরা আন্দোলনরতদের শান্ত করি। সেখানে অধ্যক্ষ, শিক্ষক কিংবা কোন শিক্ষার্থী লাঞ্চিত হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন সাধারণ ছাত্র জানান, সকাল ১১টার দিকে কলেজ ছাত্রলীগের ইন্ধনে বহিরাগত কিছু ছেলে এবং কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রশাসনিক ভবনের সামনে মিছিল করে। সে সময় অদূরে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি জাকির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন দাঁড়িয়ে ছিল। মিছিলটি প্রথমে প্রশাসনিক ভবনে ঢুকে ব্যাপকহারে চেয়ার ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে তারা গিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয়। এরপর তারা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপর চড়াও হয়।
ছাত্রলীগের হামলায় আহত জসিম উদ্দিন জানান, আমি রাস্তা নির্মাণে বিরোধীতা করেছি এমন অভিযোগ তুলে কলেজ ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াতের নেতৃত্বে মারধর করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, মিছিলে অংশ গ্রহণকারীরা অন্তত সাতজন শিক্ষককে পাকড়াও ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষক মিঠুন চক্রবর্তী আঘাত পেয়েছেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (অপারেশন) মাইন উদ্দীন জানান, গন্ডগোলের খবর পেয়ে ওসি ফরিদ উদ্দীনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ কলেজ ক্যাম্পাসে যায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষক ও আন্দোলনকারী ছাত্রদের নিয়ে বৈঠক করছেন ওসি। সেখানে জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল করিম চৌধুরী জানান, কলেজ প্রশাসনকে না জানিয়ে কলেজের পূর্বপাশে বিরোধপূর্ণ জমিতে একটি সড়ক নির্মাণ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে ঝামেলা চলছে। আমরা প্রশাসনকে লিখিত অবহিত করেছি। এরপর সাধারণ ও পুরাতন শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিক সমাজ এ নিয়ে রোববার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও স্বারকলিপি দেয়। এরপরই দ্বিতীয় সড়ক নির্মাণের কাজ স্থগিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
তিনি আরো জানান, কলেজের বিরোধপূর্ণ জমিটি দখলে নিতে একটি চক্র ভাড়ায় সড়কটি নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছে বলে খবর পেয়েছি। এদিকে উপজেলা প্রশাসন লিখিত ভাবে কাজ বন্ধ করে দেয়ায় সেই চক্রটি উত্তেজিত হয়ে রাতের মাঝভাগে সেই জায়গায় মাটি ফেলছিল। খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন অভিযান চালিয়ে মাটি ফেলার সময় চারজনকে আটক করে।
কলেজ অধ্যক্ষ আরও বলেন, আটকের বিষয় নিয়ে সোমবার দুপুরের দিকে বহিরাগত ও কলেজের কিছু শিক্ষার্থী মিলে বিশৃংখল পরিস্থিতি তৈরীর চেষ্টা চালায়। তারা প্রশাসনিক গেইটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এতে আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম প্রায় এক ঘন্টা। পরে সদর থানার ওসি আসলে কলেজ ছাত্রলীগ নেতারা তালা ভেঙে উদ্ধার করেন। তবে বিশৃংখলায় কলেজের কোন কোন শিক্ষার্থী ছিল তা নির্দিষ্ট করে না বললেও এতে বহিরাগত কিছু সন্ত্রাসীরাও ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন প্রিন্স বলেন, ওই জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান এবং উক্ত জায়গার উপর আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তাই ওই জায়গায় রাস্তা নির্মাণ করা আইনসিদ্ধ নয়। তাই কাজ বন্ধ রাখতে প্রকল্পের সভাপতির কাছে কাজ বন্ধ রাখতে লিখিত আদেশ পাঠানো হয়েছে। এরপরও দেখি রাতের আধারে তারা ঐ জায়গায় মাটি ফেলছিল। অভিযান চালিয়ে মাটি ফেলার মূল হোতা মো. ইসমাইল (৫৫) ও শ্রমিক জাফর উল্লাহ্ (৩০), ছলিম উল্লাহ্ (২৮) এবং মোহাম্মদ নুরকে আটক করা হয়।
তিনি আরো জানান, সোমবার দুপুরে ভ্রাম্যমান আদালত চালিয়ে তাদের মাঝে মো. ইসমাইল (৫৫) কে পাহাড়কাটা ও প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ জমিতে মাটি ফেলায় পরিবেশ আইনে দু’বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও শ্রমিকদের অর্থদন্ডের জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজার কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, আন্দোলনে কোনো বহিরাগত ছিল না। সবাই কলেজের শিক্ষার্থী। হয়ত কয়েকজন ছাত্রলীগের কর্মী এতে ছিল। এখানে কোনো শিক্ষক লাঞ্চিত হয়নি। বরং আমরা গিয়ে অধ্যক্ষের রুমে তালা ভেঙে উদ্ধার করি। এতে পুলিশও ছিল আমাদের সাথে। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থী ও কলেজ ছাত্রলীগের দাবি হলো, কলেজের দ্বিতীয় সড়ক নির্মাণ দ্রুত বাস্তবায়ন করা, কলেজের মূল গেইট থেকে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আজমের চিহ্ন তুলে ফেলা, কলেজের আশপাশে জামায়াত-শিবিরের দখলে থাকা জায়গা উদ্ধার করা, মসজিদ সংস্কার করা, অধ্যক্ষের রুমে প্রবেশ পথে শিবিরের দলীয় চিহ্ন ভেঙে ফেলা, কলেজের পিছনে কলেজের জমিতে জামায়াত নেতার স্কুল তুলে দেয়াসহ ১২ দফা বাস্তবায়ন।
কক্সবাজার সদর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, কলেজের দ্বিতীয় রাস্তা নির্মাণ নিয়ে কলেজ প্রশাসন ও কলেজ ছাত্রলীগের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছে। এই নিয়ে সোমবার সকালে কলেজ ছাত্রলীগ আন্দোলন করে। এতে আমরা গিয়ে তাদের শান্ত করি এবং প্রশাসনের সাথে বৈঠক করি। হয়ত দ্রুত সময় তা সমাধান হবে।  কলেজ ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে।
ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ