অনুমতি ছাড়া পুলিশের অভিযান নয়

অনুমতি ছাড়া পুলিশের অভিযান নয়

ভাগ

আলোকিত কক্সবাজার :

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল গত ১৮ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর কাফরুলের ‘নিউ ওয়েভ’ ক্লাবে গিয়ে লোকজনের মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা নিয়ে নেয়। পরে চারজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় মিলিটারি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ডিবির ১১ সদস্যের ওই দলটি।

এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্তে বেরিয়ে আসে, ডিবির ওই দলটি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অভিযানে গিয়েছিল।

এ ছাড়া গত ১৯ নভেম্বর ডিবির আরেকটি দল মোহাম্মদপুরে বিল্লাল নামের এক ব্যবসায়ীকে আটক করে ২০ লাখ টাকা আদায় করে। পরে ওই ব্যবসায়ী অভিযোগ করলে তদন্তে দেখা গেছে, এই দলটিও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অভিযানের নামে ওই ব্যবসায়ীকে আটক করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

কেবল এ দুটি ঘটনা নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই পুলিশের অসাধু সদস্যরা ‘উপরি কামানোর’ হাতিয়ার হিসেবে অনুমতি ছাড়াই এমন অভিযান চালাচ্ছেন। রাতেই চালানো হয় এ ধরনের অভিযান।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পুলিশ এসব অভিযান চালায়। টাকা না পেলে মিথ্যা মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়।

অনুমতি ছাড়া পুলিশের অভিযান বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সব রেঞ্জ, সব মহানগর পুলিশ ও ৬৪ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে যে কোনো সদস্য কর্তৃপক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের অভিযানে গেলে তাত্ক্ষণিক বরখাস্ত করা হবে।

সেই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাঁদের বিরুদ্ধে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এই বার্তা অসাধু সদস্যদের নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার চিত্রই তুলে ধরে। তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়মের মধ্যে থেকেই পুলিশ যেকোনো অভিযান চালায়। কাউকে হয়রানি করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে দুয়েকটি ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তা সঠিক। তবে আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। ’ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পুলিশের কোনো সদস্য অভিযানে গেলে তাত্ক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পুলিশ সূত্র জানায়, কাফরুলের ঘটনায় ডিএমপি গোয়েন্দা শাখার সহকারী কমিশনার (পূর্ব বিভাগ) রুহুল আমিনসহ ১১ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশি তদন্তে পাওয়া গেছে, এর আগেও তাঁরা এ রকম একাধিক অভিযান চালিয়েছিলেন। অংশ নিয়েছিলেন। কাফরুলের ঘটনায় তাঁরা ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

পুলিশের এ ধরনের অন্যায় অভিযানের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৭ এপ্রিল চাঁদাবাজির মামলায় পুলিশের উত্তরা পূর্ব থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেন গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা।

এ ছাড়া গত বছরের ১৮ নভেম্বর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল মোড়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন ট্রাফিক পুলিশের এক কনস্টেবল। কিন্তু ওই কনস্টেবল জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর পুলিশ হেফাজত থেকে রুবেল নামের আসামিকে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগ ওঠে বাড্ডা থানার এসআই ইমরান উল হাসান ও এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। তাঁরা মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়ে আসামিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার তথ্য-প্রমাণ মিললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া গত ৬ ফেব্রুয়ারি কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে নিরীহ রিকশাচালক সাজু মিয়াকে গুলি করে আহত করে পুলিশ। এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে পুলিশের সামনেই এক সোর্স চায়ের দোকানি বাবুলকে পুড়িয়ে হত্যা করে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা আগুন নেভানোরও চেষ্টা করেননি।

সর্বশেষ চাঁদাবাজি ও চুরির অভিযোগে বাড্ডা থানার ওসিসহ আটজনের বিরুদ্ধে গত ৩ ডিসেম্বর আদালতে মামলা করেছেন নূরুন নাহার নাছিমা নামের এক নারী।

ঊর্ধ্বতন দুই পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পুলিশ অনুমতি ছাড়াই অভিযানে যাচ্ছে। তবে সবাই এ কাজ করছে না। কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য এসব অপকর্ম করছেন। বিশেষ করে ডিবি পুলিশের কিছু সদস্য অর্থের জন্য নিরীহ লোকজনকে আটক করেন। দেনদরবার করে টাকা পেলেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আর না পেলে তাদের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কিছুদিন আগে মগবাজারে অনুমতি ছাড়াই ডিবির একটি দল অটোরিকশা ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেনকে আটক করে টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে অভিযোগ আসার পর ডিবির পরিদর্শক বাহাউদ্দিন ফারুকী, উপপরিদর্শক পলাশ কুমার নাথ ও কনস্টেবল সাইফুল কবিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি ছাড়া কেউ অভিযানে যেতে পারে না। দুয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সে ব্যাপারে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। ’

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পুলিশের কোনো সদস্যই কোনো ধরনের অভিযান চালাতে পারে না। কাফরুলের ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পুলিশ কমিশনার স্যারের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ’

পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো বার্তার ব্যাপারে দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বার্তাটি এসপিরা প্রতিটি থানার ওসিদের কাছে পাঠাবেন। ওসিরা থানার প্রতিটি সদস্যের কর্মকাণ্ড মনিটর করবেন। আবার ওসিদের কর্মকাণ্ড মনিটর করবেন এসপিরা। আর এসপিদের কর্মকাণ্ড মনিটর করবেন ডিআইজি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে তা সত্য। প্রতিটি অভিযানই তদন্ত করা হয়। বিশেষ করে অর্থ লেনদেনের কোনো বিষয় নিয়ে অভিযোগ উঠলে কঠোরভাবে তদন্ত করা হয়। ’

বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে এক লাখ ৬০ হাজার সদস্য রয়েছে। কালেরকণ্ঠ

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ