রোহিঙ্গা ইস্যুতে নেপিডোর ওপর চাপ বাড়াল ঢাকা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে নেপিডোর ওপর চাপ বাড়াল ঢাকা

ভাগ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানসহ সংখ্যালঘু অন্য সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার বিশেষ অধিবেশনে বসছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ। জেনেভায় এ অধিবেশনে রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান চাপ কাটাতে মিয়ানমার গত মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছে মিয়ানমার। তবে চুক্তি হলেও সংকট সমাধানে নেপিডোর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে শর্ত সাপেক্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকেই বড় করে দেখাতে চাচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া এই সংকটের একটি অংশ মাত্র। এর বাইরে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান, সমাজে অন্তর্ভুক্তি, সমান অধিকার নিশ্চিত করার মতো অনেক বিষয় আছে, যেগুলো ওই দেশকেই করতে হবে। এ জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ থাকা অত্যন্ত জরুরি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, নিয়মিত অধিবেশনের বাইরে এ ধরনের বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। বাংলাদেশ তা জয় করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, এমন অধিবেশন আয়োজনে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্যের সমর্থন পেয়েছে। এই বিপুল সমর্থন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাদের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই আজ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশন হচ্ছে। এর ফলে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো দৃশ্যমান হবে। আর এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ।

ওই কূটনীতিক বলেন, জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরগুলোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এম শামীম আহসান গত ২৮ নভেম্বর জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টকে বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখেন। সেই চিঠির সঙ্গে তিনি বিশেষ অধিবেশন আয়োজনে বাংলাদেশের প্রস্তাবকে সমর্থন দেওয়া মানবাধিকার পরিষদের ৩৩টি সদস্য রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেন। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ছাড়াও সমর্থকের তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র, আলবেনিয়া, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা, আইভরি কোস্ট, ক্রোয়েশিয়া, মিসর, এল সালভাদর, জর্জিয়া, জার্মানি, ঘানা, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, জাপান, কেনিয়া, কিরগিজস্তান, লাটভিয়া, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, পানামা, প্যারাগুয়ে, কাতার, উত্তর কোরিয়া, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব, স্লোভেনিয়া, টোগো, তিউনিসিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড।

এর বাইরে মানবাধিকার পরিষদের ৪০টি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র বিশেষ অধিবেশন আয়োজনে বাংলাদেশের প্রস্তাব সমর্থন করেছে। রাষ্ট্রগুলো হলো আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, কানাডা, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, ইরান, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জর্দান, কাজাখস্তান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, লিকটেনস্টাইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাল্টা, নরওয়ে, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, সেনেগাল, স্লোভাকিয়া, স্পেন, সুদান, সুইডেন, তুরস্ক ও ফিলিস্তিন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এম শামীম আহসান বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠানের পক্ষে সমর্থন দেওয়া সদস্য ও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রগুলোর তালিকা দিয়ে মানবাধিকার পরিষদের প্রেসিডেন্টকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬০/২৫১ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনিই ৫ ডিসেম্বর অর্থাৎ আজ বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের অনুরোধ করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার পরিষদ সচিবালয় সবাইকে এ বিষয়ে অবহিত করে আজ বিশেষ অধিবেশন ডাকে। পরিষদ জানায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬০/২৫১ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের জন্য পরিষদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ (১৬ বা তারও বেশি) সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। বাংলাদেশ তা পূরণ করেছে।

জানা গেছে, গতকাল জেনেভায় প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। যৌন সহিংসতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন গত সপ্তাহে বলেছেন, তিনি জেনেভায় বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত থেকে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ওপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ধর্ষণসহ ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরবেন। তাঁর আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত ওই যৌন সহিংসতা যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এদিকে মানবাধিকার পরিষদ রাখাইনের পরিস্থিতি তদন্তে একটি আন্তর্জাতিক দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও নেপিডো তা প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলোর আহ্বান সত্ত্বেও মিয়ানমার ওই দলকে এখনো প্রবেশের সুযোগ দেয়নি। এমনকি তারা এখনো রাখাইনে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কর্মীদের অবাধ প্রবেশেরও সুযোগ দেয়নি। উল্টো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের দেশে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ আজকের অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। এ প্রস্তাব মানার ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে গত ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ১৩৫-১০ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর এ মাসেই তা সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে উঠবে। থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ভোট দেয়নি এমন রাষ্ট্রগুলোকেও আগামীতে ভিন্ন অবস্থান নিতে দেখা যেতে পারে। যেমন—জাপান গত মাসে থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ভোট না দিলেও বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আজ মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ অধিবেশন আয়োজনকে সমর্থন করছে এবং সম্ভাব্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবে বলে জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপে রাখতে জাতিসংঘ তার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মিয়ানমারের কাছে রাখাইনের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চেয়েছেন। বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন আগামী ১২ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মিয়ানমার বাহিনী ও তাদের দোসরদের যৌন সহিংসতার বিষয়ে তথ্য তুলে ধরবেন।কালেরকণ্ঠ

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ