কালান্তরের কড়চা-দিল্লি বৈঠকের শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্বেষা সফল হবে কি?

কালান্তরের কড়চা-দিল্লি বৈঠকের শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্বেষা সফল হবে কি?

ভাগ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

দিল্লি বৈঠক শেষ হয়েছে। শেখ হাসিনা একটি সফল বৈঠক শেষে আজমির শরিফে গেছেন। সেখান থেকে আজ (সোমবার) দেশে ফিরছেন। কথায় বলে, সব ভালো, যার শেষ ভালো। দিল্লি বৈঠকের শুরু ও শেষ দুটিই ভালো। শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনির্ধারিতভাবে বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। বৈঠকে যেসব সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের অনমনীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার নমনীয় হয়ে দিল্লি এসেছেন। এখনই তিস্তা চুক্তিতে সম্মত হতে না পারলেও একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মতো বাংলাদেশের সঙ্গে পানি সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবেন। শেখ হাসিনার ধৈর্য ও প্রজ্ঞার রাজনীতি সফল হবে।

ভারতের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বলেছেন সে কথা। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘তাঁদের সরকারের (তাঁর ও হাসিনার সরকার) আমলেই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ’ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই চুক্তি সম্পাদনে তাঁর যে আন্তরিকতা ও আগ্রহ আছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর উপর্যুক্ত প্রতিশ্রুতি ও অন্যান্য কথাবার্তায়। তিনি প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, ‘তাঁর মতো (হাসিনার) মানুষ আর হয় না। পিতামাতা-ভাই—সবাইকে হারানোর পরও তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে খাড়া আছেন এবং দেশকে তাঁর পিতার কাঙ্ক্ষিত দেশে পরিণত করার কাজে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। ’

kalerkantho_com-11-04-17-71শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রশংসা নয়, ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও শেখ হাসিনা একটি বড় উপহার পেয়েছেন। সেটি হলো বাংলাদেশে তাঁদের ৯০০ কোটি ডলার লগ্নির চুক্তি। এই অর্থলগ্নি সহায়তা বাংলাদেশের উন্নয়নে বিরাট সহায়কের ভূমিকা নেবে। এই অর্থলগ্নিতে বাংলাদেশের নিজস্ব শ্রমের বাজারের পরিসর বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমের বাজার সংকুচিত হলে নিজস্ব বাজারের পরিসর বৃদ্ধি তার ধাক্কা অনেকটা সামলাবে।

দিল্লি বৈঠক আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বলে ভারতেরই কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ অভিমত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক উন্নয়ন সহযোগিতা ও বাণিজ্য সহযোগিতা ভবিষ্যতে ইউরোপিয়ান কমন মার্কেটের মতো এশিয়ার এই অঞ্চলেও একটি রিজিওনাল কমন মার্কেট তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য দরকার হবে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিরোধগুলোকে আপাতত এক পাশে সরিয়ে রেখে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে তোলা। শ্রমের বাজার প্রসারিত করা, যাতায়াতব্যবস্থা সহজ করা। প্রতিযোগিতামূলক নয়, সহযোগিতামূলক পণ্য উত্পাদনের ব্যবস্থা করা, বিনিময় বাণিজ্য শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীরতর করে তোলা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়াচীনের যখন প্রায় যুদ্ধাবস্থার সম্পর্ক ছিল তখনো নরওয়ের রাজধানী অসলোর মাধ্যমে এ দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন চলেছে। এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে চীনের সঙ্গে এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলবেন না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু নয়াচীনের প্রেসিডেন্ট তা হতে দেননি। ট্রাম্পও এখন বলছেন, এ সম্পর্ক তিনি রক্ষা করবেন।

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কাশ্মীর সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দিল্লি একবার প্রস্তাব দিয়েছিল, কাশ্মীর সমস্যা মেটানোর আগে দুই দেশ অন্য সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলুক। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরালো হোক। পরস্পরের প্রতি দেশভাগজনিত সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর হোক। তাহলে একসময় কাশ্মীর সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি পথ বেরোবে। পাকিস্তান তাতে রাজি হয়নি। সে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস দ্বারা সমস্যার সমাধান চেয়েছে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলছে রক্তপাত, সংঘাত, সংঘর্ষ। ফলে গোটা উপমহাদেশের শান্তি আজ বিপন্ন। কাশ্মীর সমস্যার এখনো কোনো সমাধান হয়নি। যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই অর্থ ব্যয় হচ্ছে অঢেল। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পানি নিয়ে বিবাদ সর্বত্র। মধ্যপ্রাচ্যে শাতিল আরবের পানির হিস্যা নিয়ে ঝগড়া রয়েছে। পানামা খাল, সুয়েজ খালের অধিকার নিয়েও যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধ দ্বারা সমস্যার সমাধান হয়নি। সিন্ধু অববাহিকায় পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। যুদ্ধ দ্বারা সে সমস্যার সমাধান হয়নি। বিশ্বব্যাংকের হস্তক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সিন্ধু অববাহিকা চুক্তি (Indus basin treaty) দ্বারা সমস্যার সমাধান হয়েছিল।

সেদিক থেকে গঙ্গা ও তিস্তার পানি সমস্যার ব্যাপারে বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের সাফল্য অতুলনীয়। কোনো আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ বা সালিস ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছে এবং এখন তিস্তা ও অন্যান্য নদ-নদীর পানি সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলছে। এবারের দিল্লি বৈঠকে এর কোনো রফা হয়নি। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে যে হবে সে সম্পর্কে জোরালো আশা পোষণ করা চলে। যুদ্ধ করে পানি সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ করতে পারবে না। তাকে আলোচনার মাধ্যমেই ভারতকে রাজি করাতে হবে। হাসিনা সরকার অত্যন্ত ধৈর্য ও দক্ষতার সঙ্গেই সেই পথে অগ্রসর হচ্ছে। গঙ্গার পানি চুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহল চুক্তি ইত্যাদির মতো তিস্তা চুক্তিও যে একমাত্র হাসিনা সরকারের দ্বারাই সম্ভব হবে তাতে সন্দেহ পোষণের কোনো কারণ নেই।

‘দেবে আর নেবে, মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে’—এটাই ছিল দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বৈঠকের সুর। বাংলাদেশ তিন দিকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত একটি দেশ। তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বাইরের আগ্রাসন প্রতিরোধ—সব কিছুতেই ভারতের সহযোগিতা একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকার অধিকার রাখে। তাই পাকিস্তানের স্বার্থে ও প্ররোচনায় বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবাদ জিইয়ে রাখতে গিয়ে আমাদের যে কত ক্ষতি হয়েছে, তা বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে আমরা বহুবার টের পেয়েছি। হাসিনা সরকার এই অবস্থা থেকে দেশকে মুক্তি দিয়েছে। শুধু ভারতের কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে নয়, বর্তমান বিজেপি সরকারের সঙ্গেও মৈত্রী ও সহযোগতাির সম্পর্ক রক্ষা ও বৃদ্ধি করে চলা হাসিনা সরকারের একটি বড় কৃতিত্ব।

বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা ও সহযোগিতা শুধু বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, ভারতের স্বার্থেও যে বাড়ানো ও রক্ষা করে চলা প্রয়োজন—এটা মোদি সরকার বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছে। তাই নরেন্দ্র মোদির মুখে শেখ হাসিনার এত প্রশংসা এবং বাংলাদেশের দিকে তাঁদের এ সহযোগিতার সম্প্রসারিত হাত। সমালোচকরা এর সব কিছুতেই খুঁত আবিষ্কার করতে পারবেন, সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করতে পারবেন। কিন্তু সমস্যার বিকল্প সমাধানের কোনো পথ দেখাতে পারবেন না।

ভারতের নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশের বন্ধুত্ব প্রয়োজন। নইলে নিজ দেশে মোদি যতই জনপ্রিয় হোন, আন্তর্জাতিক ও বহির্বিশ্বে তাঁর নিঃসঙ্গ যাত্রা ভারতের শক্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির কাজে তেমন সহায়ক হবে না। উপমহাদেশে ভারতের প্রকৃত বন্ধু কে? নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ভারত সম্পর্কে সন্দিগ্ধ; চীন প্রতিদ্বন্দ্বী, মিয়ানমারে তার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। পাকিস্তান ভারতের পুরনো শত্রু। এই শত্রুতা গত ৫০ বছরে আরো বেড়েছে। মোদির জনপ্রিয়তায় কেন্দ্রে তাঁর সরকার স্থিতিশীল হলেও বহু রাজ্যে বিজেপির কোনো আস্তানা নেই। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদির নেতৃত্বকে অহরহ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের ভারতনীতি এখনো অস্বচ্ছ। চীনের সঙ্গে ভারতের বিবাদ এখন স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করতে চায়। গুজব রটেছে, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান মিলে নতুন শক্তি জোট তৈরি হতে পারে। গুজব যদি সত্য হয়, তাহলে এশিয়া ও বহির্বিশ্বের রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান হবে কোথায়?

এসব চিন্তা-ভাবনা যে দিল্লির মাথা ও মস্তিষ্ককে ঠোকরাচ্ছে না, তা নয়। অবশ্যই ঠোকরাচ্ছে। এদিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী ও সহযোগিতা ভারতের জন্য একটি বড় নিশ্চয়তা। নইলে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের হুমকি ও দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় বাংলাদেশের মাধ্যমে অশান্তি সৃষ্টি এবং ভারতীয় পার্বত্য এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদদান দিল্লির জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত তার পূর্বাঞ্চলে অন্তত নিরাপত্তা ফিরে পেয়েছে। এই নিরাপত্তার গ্যারান্টি মোদি সরকারও হারাতে চায় না, চাইতে পারে না।

১৯৫০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত নেহরু-লিয়াকত চুক্তির গুরুত্ব যেমন তখন বোঝা যায়নি, বরং ভারতবিরোধী মহল তার মধ্যেও ত্রুটি আবিষ্কার করেছিল; তেমনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত বর্তমান দিল্লি চুক্তির গুরুত্ব এখন বোঝা যাবে না, বরং কলম উঁচিয়ে বসে থাকা নিন্দুক ও সমালোচকরা তাঁদের পাণ্ডিত্যের সাহায্যে বহু খুঁত আবিষ্কার করবেন। বিএনপি দেশ বেচে দেওয়ার রব তুললে বিস্মিত হব না। কিন্তু যতই দিন যাবে এই বৈঠকের ও চুক্তির গুরুত্ব দুই দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে থাকবে। বাংলাদেশ ও ভারত এ দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত এ চুক্তিগুলোর কল্যাণ যদি সারা উপমহাদেশে ছড়ায়, শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগের সূচনা করে, এমনকি তা একদিন ভারত ও পাকিস্তানকে কাশ্মীর সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে বিস্মিত হব না।

উপমহাদেশের বৃহত্তর স্বার্থেই এবং এই অঞ্চলকে ‘জোন অব পিস’-এ পরিণত করার জন্য একটি উপমহাদেশীয় কমনওয়েলথ গঠিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। ঢাকা-দিল্লি মৈত্রী সেই শুভ ভবিষ্যতের সূচনা করুক।

লন্ডন, রবিবার, ৯ এপ্রিল ২০১৭

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ