তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ কারা হবেন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, কে স্বাক্ষর করবে বেতন বিলে?

তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ কারা হবেন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, কে স্বাক্ষর করবে বেতন বিলে?

ভাগ

আলোকিত শিক্ষা ডেক্স:

স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদে সাংসদের সভাপতি থাকা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিতাদেশ চেয়ে করা এক আবেদনের শুনানি শেষে আজ রোববার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়েছে, চাইলেই সংসদ সদস্যরা আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে বা থাকতে পারবেন না। সাংসদদের সভাপতি হতে হলে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে হবে।

আদালতের রায়ের পর সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন ওঠেছে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি এখন থেকে কে হবেন? সরকারি কর্মকর্তা/সুধীমহলের প্রতিনিধি/উপজেলা/ইউনিয়ন চেয়ারম্যান না পেশীশক্তি ও কালোটাকার মালিক কেউ? পরিচালনা পর্ষদের প্রবিধান মালা ৫ (১) ধারা অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা নির্বাচন করে জয়ী হয়ে ফের সভাপতির দায়িত্ব নেবেন? আর নতুন সভাপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ মেটাতে বিল-ভাউচার কার স্বাক্ষরে চলবে? শিক্ষক-কর্মচারীরা কার স্বাক্ষরে বেতন-ভাতা তুলবেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কবে নাগাদ এসব প্রশ্নের উত্তর সম্বলিত বিধি জারি করবে?

এরআগে গত ১ জুন একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০০৯ সালে প্রণীত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালার ৫ (২) ও ৫০ বিধি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন।

প্রথমে হাইকোর্ট পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার রায়ের ফলে এই মুহূর্ত থেকে দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পদ শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। হাইকোর্টের রায়ের পর শিক্ষামন্ত্রী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, আদালত যেভাবে চান সেভাবেই কাজ করা হবে। আর আজ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন সেটা আমরা কিভাবে কার্যকর করবো, সেটা নিশ্চয়ই সুপ্রিম কোর্টের ডিরেকশন আছে, সেই রায় দেখে করবো।

তবে হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত রায়ের পর সাংসদরা যে ‘নাখোশ’ হয়েছেন তার প্রমাণ সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্টের রায়কে স্থগিত চেয়ে আবেদন। হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত চেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করেছিল। তাদের বক্তব্য শুনে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারকের বেঞ্চ রোববার ‘নো অর্ডার’ দেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ কেন স্থগিতাদেশের আবেদন করল? কারণ হাইকোর্ট সাংসদরা সভাপতি হতে পারবেন না-এই আদেশের পাশাপাশি এও বলেছিল-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বিদ্যমান বিশেষ কমিটিও বাতিল করতে হবে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কোনো বিশেষ কমিটি থাকতে পারবে না। উল্লেখ্য, এই ভিকারুননিসা পরিচালিত হয় বিশেষ কমিটির দ্বারা। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এখন এটিও অবৈধ। রায়ের ফলে স্থানীয় সাংসদ রাশেদ খান মেনন আর প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি থাকতে পারবেন না। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার জন্য মেনন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ কমিটি অনুমোদন করিয়ে এনেছেন।

যেহেতু সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, সাংসদরা চাইলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না। কিন্তু বিধিমালার ৫ (১) ধারা মতে, সাংসদরা নির্বাচন করে সভাপতি হতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসবে দেশের আইন প্রণেতারা কী এত ছোট একটি পদের জন্য নির্বাচন করবেন? আর যদি-ই-বা করেন তাহলে এই নির্বাচন কী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘ভোট’ হবে। যদি তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যান সেক্ষেত্রে এরকম প্রহসনমূলক নির্বাচনের কী দরকার? তবে সাংসদ হওয়ার পরও তারা সভাপতি পদে নির্বাচন করলেই বোঝা যাবে-সাংসদরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য ‘লালায়িত’।

সাংসদরা সভাপতি হয়ে কী করবেন? কারণ সভাপতি হওয়ার মূখ্য লাভ আর নেই। এখন শুধু বসে বসে খবরদারি করা। আর বেতন বিল ও ভাউচারে স্বাক্ষর করা। সভাপতি-তো আর শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবেন না। এরফলে হয়তো তারা আর সভাপতি না হওয়ার আগ্রহও দেখাতে পারেন। ফলে আগামীতে কে সভাপতি হবেন, সেটাই দেখার বিষয়। সরকারি কর্মকর্তারা (ডিসি-ইউএনও) চাচ্ছেন সভাপতি হতে। এমনকি গত কয়েকবছরের ডিসি সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীক আলোচনায় ডিসিরা সভাপতি হওয়ার জন্য প্রস্তাবও দেন। কিন্তু অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটাকে মেনে নিতে চাচ্ছে না।

হবিগঞ্জের একটি কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপকের মতে, সাংসদদের সভাপতি রাখবেন না ভাল কথা। কিন্তু সাংসদের পরিবর্তে কাকে সভাপতি রাখা হবে। একজন ডিসি অথবা একজন ইউএনওতো সব প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না। আর তারা সভাপতি হলেই যে শিক্ষার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন হবে তার গ্যারান্টি কী?

এছাড়া তিনি আরেকটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন সুযোগে সাংসদের পরিবর্তে এমন কিছু লোক প্রতিষ্ঠানে সভাপতি হয়ে আসতে পারেন যার কোনো শিক্ষা ও নৈতিকতাই নেই। এরকম ব্যক্তি যদি সভাপতি হন তাহলে প্রতিষ্ঠানে কী খুব উন্নয়ন হবে? তবে সবমিলিয়ে সভাপতি হওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তারমতে, এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিমনা পেশার সঙ্গে জড়িত, সুধীমহলে গ্রহনযোগ্য এমন ব্যক্তিদেরকে সভাপতি করা যেতে পারে। আর এমন বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করে দিয়ে আইন করে দিলে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভালো হবে।

সর্বশেষ ২০০৯ সালের জুনে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা তৈরি হয়। ওই প্রবিধান অনুযায়ী, একজন সাংসদ সর্বোচ্চ চারটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পেরেছেন। তবে ওই প্রবিধানের ৫ (২) ধারা আদালত অবৈধ ঘোষণা করায় এখন সাংসদেরা অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেই আর সর্বোচ্চ চারটি স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না। তবে ৫ (১) বিধি অনুসারে সাংসদদের সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি নির্বাচিত হতে বাধা নেই। এখন দেখতে হবে-৫ (১) ধার অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী করে? এই ধারাটি রাখবে না তুলে দেবে?

যেহেতু আদালত বলেছেন, সাংসদরা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না। কিন্তু বিদ্যমান আইনে দেশের অধিকাংশ কলেজে সাংসদরা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আজ থেকে সভাপতি না থাকলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাউচারে কে স্বাক্ষর করবে। অধিকাংশ কলেজে গত মাসের বেতনের স্বাক্ষরই হয়নি। এ অবস্থায় সামনে চলে আসছে ঈদ।

বেতন বিলে স্বাক্ষর না করলে শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাবেন না। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর তাকিয়ে রয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারী তথা দেশবাসী। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু সভাপতি না থাকলে এগুলোর ভাউচারে কে সই করবে? সবমিলিয়ে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সিদ্ধান্ত আশা করছে শিক্ষক সমাজ।

অভিজিৎ ভট্টাচার্য : পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষা সাংবাদিক ও দৈনিকশিক্ষার নিজস্ব গবেষক।

সূত্র-দৈনিক শিক্ষা

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ