কোরবানি কারা কীভাবে করবেন

কোরবানি কারা কীভাবে করবেন

ভাগ

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম

কোরবানি কারা করবেন : ১. জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর থেকে ১২ জিলহজের সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ কোরবানির দিনগুলোতে যাদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত শরয়ি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। নিসাবের পরিমাণ হলো, সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা বা এ পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া। কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর পর্যন্ত নিসাবের মালিকের কাছে থাকা জরুরি নয়। বর্তমান বিশ্ববাজারে রুপার মূল্য স্বর্ণের মূল্যের তুলনায় কম হওয়ায় নিসাবের ক্ষেত্রে রুপার মূল্যই গণ্য হবে। প্রত্যেক দেশে সেখানকার বাজারমূল্য ধর্তব্য হবে। ২. মুসাফিরের ওপর (সফরে থাকলে) কোরবানি করা ওয়াজিব হয় না। ৩. কোরবানি ওয়াজিব না হলেও নফল কোরবানি করলে কোরবানির সওয়াব পাওয়া যাবে। ৪. কোরবানি শুধু নিজের পক্ষ থেকে ওয়াজিব হয়, সন্তানাদি, বাবা-মা ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে ওয়াজিব হয় না, তবে তাদের পক্ষ থেকে করলে তা নফল কোরবানি হবে। ৫. যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয় সে কোরবানির নিয়তে পশু কিনলে সেই পশু কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব হয়ে যায়। ৬. কোনো উদ্দেশ্যে কোরবানির মানত করলে সে উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে গরিব হোক বা ধনী হোক তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। ৭. যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব সে কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানি না করলে কোরবানির দিনগুলো চলে যাওয়ার পর একটা বকরির মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। ৮. মৃত ব্যক্তির নামেও কোরবানি হয়। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা তিন ধরনের হতে পারে। যেমন- ক. নিজের কোরবানিতে পরিবারের মৃত ও জীবিত ব্যক্তিদের নিয়তের মাধ্যমে শরিক করা বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে এ ধরনের কোরবানি প্রমাণিত আছে। এভাবে দেয়া কোরবানির গোশত পরিবারের সবাই খেতে পারবে। খ. মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তার পক্ষ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করে থাকলে অসিয়ত বাস্তবায়ন করার জন্য মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ আছে। গ. রাসুলুল্লাহ (সা.), তাঁর স্ত্রীদের ও বুজুর্গদের নামেও কোরবানি হতে পারে।
কোরবানি কীভাবে করবেন : কোরবানির পশু জবাই করার নিয়ম হলো, পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে কেবলামুখী করে শুইয়ে পূর্বদিক থেকে চেপে ধরবে, তারপর কোরবানি করতে হবে। কোরবানি করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, সিনার উপরিভাগ এবং কণ্ঠনালির মাঝামাঝি স্থানে যেন জবাই করা হয়। গলায় চারটি রগ রয়েছে, এর মধ্যে গলার সামনের দিকে দুটি- খাদ্যনালি ও শ্বাসনালি এবং দুই পাশে দুইটি রক্তনালি। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালি, শ্বাসনালি এবং দুইটি রক্তনালির মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। নিজের কোরবানি নিজের হাতে করা উত্তম। আরবি নিয়ত জানা না থাকলে জবাই করার সময় শুধু ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে কোরবানি করলেও শুদ্ধ হবে। কারণ নিয়ত অন্তরের ব্যাপার।
কোরবানির জন্য পশু আগেই নির্ধারণ করতে হবে। পশু নির্ধারণ করার পর নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে- ১. এ পশু কোরবানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। দান করা যাবে না, বিক্রি করা যাবে না। তবে কোরবানি ভালোভাবে আদায় করার জন্য পরিবর্তন করে এর চেয়ে উত্তম পশুর ব্যবস্থা করা যাবে। ২. পশুর মালিক ইন্তেকাল করলে, এ কোরবানি বাস্তবায়ন করা তার উত্তরাধিকারীদের দায়িত্ব। ৩. এ পশু দ্বারা কোনো ধরনের উপকার ভোগ করা যাবে না। যেমন- দুধ বিক্রি করা, কৃষিকাজে ব্যবহার করা, সওয়ারি হিসেবে ব্যবহার করা ইত্যাদি। কোরবানির জন্তুর পশমও বিক্রি করা যাবে না। পশম তার শরীর থেকে আলাদা করে ফেললে সদকা করে দিতে হবে। ইচ্ছা করলে নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবে। ৪. কোরবানিদাতার অযত্ন-অবহেলায় যদি পশুটি দোষযুক্ত হয়ে পড়ে, চুরি হয়ে যায় অথবা হারিয়ে যায়, তাহলে তার কর্তব্য হবে অনুরূপ বা তার চেয়ে ভালো একটি পশু ক্রয় করা। আর যদি স্বাভাবিকভাবেই কোনো কারণে দোষত্রুটির সৃষ্টি হয়, তাহলে এটা কোরবানি করলেই চলবে। ৫. কোরবানির পশু হারিয়ে গেলে অথবা চুরি হয়ে গেলে- এ অবস্থায় কোরবানিদাতার ওপর আগে থেকেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকলে, সে কোরবানির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। আর যদি আগে থেকে ওয়াজিব না থাকে, বরং সে কোরবানির নিয়তে পশু কিনে ফেলেছে, তাহলে চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা হারিয়ে গেলে তাকে আবার পশু কিনে কোরবানি আদায় করতে হবে।
যাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রত্যেককে সহি-শুদ্ধভাবে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।
লেখক : শিক্ষা সচিব, মাদরাসা খাতুনে জান্নাত (রা.), মানিকনগর, ঢাকা।
ভাগ

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ