সামাজিক বনায়ন : ভূমিহীন, কৃষক-শ্রমিকের স্থলে চেয়ারম্যান, প্রবাসি ও ব্যবসায়ী !

প্রকাশ: ২০২০-০১-২৫ ১৫:৪৪:২৭ || আপডেট: ২০২০-০১-২৫ ১৫:৪৪:২৭

ওয়াহিদ রুবেল:

ভূমিহীন, দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্থ গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদী গাছের বাগান বা সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম শুরু করে সরকার। অথচ সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে কক্সবাজারের সদর উপজেলার মেহেরঘোনা রেঞ্জের আওতাধীন মেহেরঘোনা বীটে স্বচ্ছল, বিত্তবান এবং প্রবাসিদের সামাজিক বনায়নের অংশিদার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বীট এবং রেঞ্জ অফিসার মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে এমন অনিয়ম করেছেন। এ অবস্থায় সরকারের গৃহিত সামাজিক বনায়নের আসল উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বনবিভাগের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সামাজিক বনায়নের সুফল পেতে ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি পরিবেশ ও বনমন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করেন। উক্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে,“সাধারণভাবে কোন সামাজিক বনায়ন এলাকার এক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী স্থানীয় অধিবাসীগণের মধ্য হইতে উক্ত এলাকার উপকারভোগী নির্বাচিত হইবেন এবং ভূমিহীন, ৫০ শতাংশের কম ভূমির মালিক, দুস্থ’মহিলা, অনগ্রসর গোষ্ঠী, দরিদ্র আদিবাসী, দরিদ্র ফরেস্ট ভিলেজার এবং অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযোদ্ধার অসচ্ছল সন্তান উপকারভোগীর তালিকায় আসবে। কিন্তু সরকারের মহৎ এ উদ্দ্যোগ কাজে আসেনি মেহেরঘোনা রেঞ্জে। উল্টো অংশিদারীত্ব বনায়নের সিংহভাগ সদস্যই ভ‚-স্বামী এবং সচ্ছল। এমন কি একই পরিবারের একাধিক সদস্য বাগনে অংশিদার হয়েছে।

মেহেরঘোনা রেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, রেঞ্জের আওতাধীন মাছুয়াখলী মৌজার চান্দেরঘোনা ও কালিছড়া এলাকায় ২০১৭-২০১৮ সনে সৃজিত ২৫ হেক্টর বনভ‚মিতে সামাজিক বনায়ন করে বনবিভাগ সৃজিত বাগানে মোট ৪৩ জন উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। ২০১৯ সনের ২৮ এপ্রিল উপকারভোগী এবং সরকারের পক্ষে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিনামাম ২০১৮ সালের ৩০ জুন হতে কার্যকর হবে।

চুক্তিতে বলা হয়, মেহেরেঘোন রেঞ্জ ও মেহেরঘোনা বীট অফিসের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভ‚মিতে জ্বালানী ও অন্যনান্য স্বল্পমেয়াদী গাছের বাগান সৃজন করে স্থানীয় ভূমিহীন, দরিদ্র কৃষক শ্রমকি পর্যায়ভ‚ক্ত ব্যক্তিবর্গ বা দরিদ্র বিধাবা বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠি হতে উপাকরভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে স্থান পাওয়া উপকারভোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান, প্রবাসি, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ স্বচ্ছল মানুষ। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বনবিভাগের বাছাইকৃত উপকারভোগীদের মধ্যে ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম এবং সাবেক চেয়ারম্যান সোহেল জাহান চৌধুরীর নামও রয়েছে।

এছাড়া প্রবাসি মো: আলম, কাপড় ব্যবসায়ী নুরুল আবছার, প্রবাসি ছৈয়দ আলম, ঈদগাঁও জাব্বারিয়া আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক নুরুল আজিম ও তার স্ত্রী রওশন জাহান, প্রবাসি দেলোয়ার হোসেন সাইদী, প্রবাসি মউির রহমান (ঈদগাঁও বাজারে তার ৫ তলা ভবন রয়েছে), প্রবাসির স্ত্রী ছেনুয়ারা বেগম (তার তিন ছেলে বিদেশে), সদর উপজেলা যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক জামিল উদ্দিন, প্রবাসি নুরুল আমিনসহ প্রায় ২০ জন স্বচ্ছল লোক।

বাগানের অংশিদার ব্যবসায়ী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি  হুমায়ুন তাহের চৌধুরী বলেন, ঈদগাঁও সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলমসহ সম্ভবত তিনটি বা চারটি প্লটে এ ধরনের উপকারভোগী এসেছেন। দীর্ঘদিন যারা বনের জমি দখলে ছিলো তাদের নিয়েই বাগান করা হয়েছে, কোন অনিয়ম হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ মেহের ঘোনা বীটের এ বাগানটিতে যাদের নাম অন্তভ‚ক্ত করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে বীট অফিসার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা। যার ফলে প্রকৃত দরিদ্র, ভ‚মিহীনদের নাম বাদ দিয়ে স্বচ্ছল মানুষদের অংশিদারিত্ব বনায়নের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিত্তবানদের নিয়ে বাগান করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

জানতে চাইলে মেহের ঘোনা রেঞ্জ কর্মকর্তা মামুন মিয়া বলেন, বীট অফিসারের নেতৃত্বে আমাদের একটি কমিটি আছে। কমিটির সদস্যরা গরীব, ভ‚মিহীন, অসচ্ছল মানুষদের মধ্য থেকে বাগানের অংশিদার নির্ণয় করেছেন।

সাবেক ও বর্তমান চেয়াম্যানসহ স্বচ্ছল মানুষ কিভাবে বাগানের অংশিদা হলেন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, অসচ্ছল লোক না পাওয়ায় তাদের অংশিদার করা হয়েছে।

টাকার লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে মেহেরঘোনা বীট অফিসের বনকর্মকর্তা জাকের হোসেন বলেন, যারা আবেদন করেছেন তাদের মধ্য থেকে স্থানীয় মান্যগণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে যাচাই বাছাই করে বাগানের অংশিদার নির্ধারণ করেছি। কেউ যদি আবেদন না করে তবে, আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে আবেদন করাতে পারি না।

কথা বলার এক পর্যায়ে প্রতিবেদকে অফিসের গিয়ে স্বাক্ষাতে কথা বলার অনুরোধ জানান বনবিভাগের এ দুই কর্মকর্তা।

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মো: তৈহিদুল ইসলাম বলেন, আমি আসার পর নতুন বনায়ন হয় নি। আগে যা হয়েছে তা নিয়ে তেমন একটা কিছু বলতে পারবো না। তবে, বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর নিবো।

ট্যাগ :