রামুতে প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি ও ঘর দেয়ার নামে প্রতারনার অভিযোগ

প্রকাশ: ২০২০-০১-১৪ ২৩:৩২:৪৯ || আপডেট: ২০২০-০১-১৪ ২৩:৩২:৪৯

সোয়েব সাঈদ, রামু

দিনমজুর মনজুর আলমের ১১ বছর বয়সী মেয়ে রোজিনা আকতার পেটের জটিল রোগের কারনে হাটতে পারে না। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গও তেমন সচল নেই। টাকার অভাবে পারছিলেন না মেয়েটির চিকিৎসা করাতে। তাই প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে নিয়ে হতদরিদ্র পরিবারটির সদস্যরা ছিলো চরম হতাশাগ্রস্ত। অসহায় পরিবারের এ মেয়েটিকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন চৌকিদার পরিচয়দানকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ নামের এক যুবক।

আবার মেয়েটির মাকে ভিজিডি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়েছেন আরো ২ হাজার ১০০ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন সেমি পাকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার কথা বলে বয়োবৃদ্ধ শামশুদ্দৌজার কাছ থেকে নিয়েছেন ৪ হাজার ৮০০ টাকা। একই আশ্বাসে আনোয়ার বেগম নামের বৃদ্ধার কাছ থেকে নিয়েছেন ৪ হাজার ৩০০ টাকা।

নেজাম উদ্দিন রাজারকুল ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম হালদারকুল গ্রামের মৃত মো. কালুর ছেলে। নিজেকে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছেন।

রাজারকুল ইউপি চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমান জানান, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চোকিদার নন। তবে যুবকটি ইতিপূর্বে চৌকিদার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন এবং পরিষদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে আসছিলেন। বিভিন্ন অজুহাতে সে লোকজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিলেও বিষয়টি কেউ তাকে অবহিত করেননি। তাই প্রতারনার এসব বিষয় তিনি বিন্দুমাত্রও জানতেন না। তাই তিনি অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার শামসুল আলম জানিয়েছন, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ পরিষদের চৌকিদার পরিচয় দিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেয়ার আশ^াসে লোকজনের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি বিষয়টি তিনি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে ভুক্তভোগীদের পরামর্শ দেন। তিনিও এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

সোমবার (১৩ জানুয়ারি) রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমার কাছে ৩টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন প্রতারনার শিকার রাজারকুল ইউনিয়নের পশ্চিম হালদারকুল এলাকার মনজুর আলমের স্ত্রী খুরশিদা আকতার ও প্রতিবন্ধী মেয়ে রোজিনা আক্তার, মৃত মো. হোছনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং মৃত আবদুস সোবহানের ছেলে শামশুদ্দৌজা।

লিখিত অভিযোগে খুরশিদা আকতার ও তার প্রতিবন্ধী মেয়ে রোজিনা আকতার উল্লেখ করেছেন, ২ নং ওয়ার্ডে গ্রাম পুলিশের অস্থায়ী দায়িত্ব পালনকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ প্রতিবন্ধী রোজিনা আকতারকে ভাতা পাইয়ে দেয়ার আশ^াস দেন। এজন্য ‘স্যারের অফিসে’ দেয়ার অজুহাতে ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। বিভিন্ন লোভ-লালসার ফাঁদে ফেলে তার কাছ থেকে দাবিকৃত ৫ হাজার টাকা নিলেও এখনো কোন ভাতা তাকে দেয়া হয়নি। এরআগে ভিজিডি দেয়ার আশ^াসে খুরশিদা আকতারের কাছ থেকে নেন আরো ২ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ ভিজিডি ও প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়ার আশ^াসে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৭ হাজার ১০০ টাকা। পরবর্তীতে সরকারি সুবিধার কোনটি না পেয়ে তারা এসব টাকা ফেরত চান। তবে ওই কথিত চৌকিদার টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো তাদের বিভিন্ন হুমকী দেন। তাই নিরুপায় হয়ে তারা ইউএনও’র কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

বিধবা, হতদরিদ্র আনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন সেমি পাকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার আশ্বাসে তাঁর কাছ থেকে ৬ মাস পূর্বে ৪ হাজার ৩০০ টাকা নিয়েছিলেন চৌকিদার পরিচয়দানকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ। কোন ঘর দূরের কথা এখন টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাকে হুমকী দিচ্ছে ওই যুবক।

ইউএনও’র কাছে দেয়ার অপর অভিযোগে বয়োবৃদ্ধ শামসুদ্দোজা উল্লেখ করেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন সেমি পাকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার আশ্বাসে তাঁর কাছ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা নিয়েছিলেন চৌকিদার পরিচয়দানকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ। ঘর না পেয়ে তিনি টাকা ফেরত চাইলেও দিচ্ছে না। তাই নিরুপায় হয়ে তিনি প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন।

ইউপি মেম্বার শামসুল আলম আরো জানিয়েছেন, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে আরো অসংখ্য লোকজনের কাছ থেকে সরকারি সেবার নামে টাকা নিয়ে প্রতারনা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে মৃত আজিজুর রহমানের ছেলে আবছার মিয়ার কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা, ছিদ্দিক আহমদের ছেলে আবদুর রহিমের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা, মৃত আবদুন নবীর ছেলে ছিদ্দিক আহমদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা, মৃত নীল মনির ছেলে সজল পালের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, অজিত পালের ছেলে মিটার পালের কাছ থেকে ৫০০ টাকা, আনোয়ারার কাছ থেকে ৫০০ টাকা, আয়েশার কাছ থেকে ৫০০ টাকা, জোসনার কাছ থেকে ৬০০ টাকা, মকতুল হোছনের ছেলে আবদুর রহমানের কাছ থেকে ৪০০ টাকা, মৃত মো. হোছনের ছেলে রশিদ আহমদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা, ওসমানের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা, রহিমের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা, মৃত ফজল করিমের ছেলে মনজুর আলমের কাছ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা, বদি আলমের ছেলে নুর আলমের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা, বেবী আকতারের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা, তফুরা বেগমের কাছ থেকে ৬০০ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, পরিষদের নামে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক প্রতারনার ঘটনা মেনে নেয়া যায়না। এতে এলাকার লোকজন যেমন ভোগান্তির শিকার হয়েছে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। তিনি এসব প্রতারনার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা জানিয়েছেন, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে ডাকা হবে এবং এসব অভিযোগ তিনি নিজে তদন্ত করে দোষিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এ ব্যাপারে জানার জন্য অভিযুক্ত যুবক নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর মোবাইল ফোনে সোমবার রাতে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ ছিলো। ফলে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

ট্যাগ :