মোশাররফের দণ্ড ইতিহাসের মাইলফলক

প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৪ ১৬:৩৭:৫৩ || আপডেট: ২০১৯-১২-২৬ ১৪:০৮:০৪

রুস্তম শাহ মোহমান্দ:

বিশেষ আদালতে ছয় বছর শুনানির পর রায় দেওয়া হয়েছে—সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। রায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় এক শর বেশি শুনানি হয়েছে। ‘অসুস্থতা’র কারণে আদালতে হাজির হতে পারেননি মোশাররফ। তিনি দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন।

বেশ কয়েকটি অভিযোগে মোশাররফ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সেসবের মধ্যে রয়েছে সংবিধান রদ করা, জরুরি অবস্থা জারি করা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের আটক করা। পুরো শুনানিতেই মোশাররফের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাঁর আইনজীবীরা।

রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছে। অনেকে এ রায় ঘোষণার সময়কে প্রকৃত গণতন্ত্র অভিমুখে রাষ্ট্রের অভিযাত্রার নির্ণায়ক ক্ষণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, এ রায় তাদের মর্মাহত করেছে। তারা উচ্চকণ্ঠে বলেছে, এ মামলায় আইনি বিষয়াদি ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি। মৃত্যুদণ্ডের আদেশে সামরিক বাহিনীতে চরম বেদনা ও যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ মামলার পরিপ্রেক্ষিত সহজ করে বোঝার জন্য কিছু অবিতর্কিত ঘটনা নিরীক্ষণ করে দেখা দরকার। তাঁর বিরুদ্ধে চরম বিশ্বাসঘাতকতার একটি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে, এ কথা জানার পর মোশাররফ দেশত্যাগের পথ বেছে নেন। তাঁর এ সিদ্ধান্তের পেছনে স্পষ্ট একটি উদ্দেশ্য ছিল। বছরের পর বছর তাঁর অনুপস্থিতির নকশা এ কারণেই করা হয়েছিল, যাতে শুনানি বারবার মুলতবি করা যায় এবং ‘শোনা সম্ভব হয়নি’ এ কথা বলে রায়কে আক্রমণের বিষয়ে পরিণত করা যায়।

শুনানি শুরু ও রায় ঘোষণার সময়ের মধ্যে বেশ কিছু দীর্ঘ বিরতিকাল পার হয়েছে। এসব বিরতিতে মোশাররফ বেশ সুস্থ ছিলেন, স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন এবং ভালোভাবে চলাফেরা করতে সক্ষম ছিলেন। বিরতিকালে তিনি একবার দেশে আসতে পারতেন, আদালতে হাজিরা দিতে পারতেন।

সাবেক এই সামরিক শাসক ১৯৯৯ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে উত্খাত করেন। সেনাপ্রধানের পদে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। সংবিধান অবমাননা করা অবশ্যই চরম বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্বের কোথাও কি এমন কাজ যৌক্তিক বলে প্রমাণ করা যায়? সভ্য কোনো দেশের কেউ কি এ যুক্তি গ্রাহ্য করবে যে দেশের সেবা বা দেশের জন্য যুদ্ধ করা, গুরুত্বপর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে অপরাধ করে কঠিন শাস্তি থেকে কেউ রেয়াত পেতে পারেন। কোনো যুক্তিতেই কি জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিকে যুক্তিযুক্ত বলা যায়? কোনো ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণই হোন, আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন—এমন যুক্তি মেনে নেওয়া অসম্ভব।

১৯৯৯ সালে আইনসম্মত সরকারকে উত্খাত করার আগেই মোশাররফ অপরাধ করেছিলেন। কারণ তিনি সরকারের অজ্ঞাতে কারগিলে সামরিক অভিযানের আদেশ দিয়েছিলেন। সেই অপরাধেও তাঁর শাস্তি পাওনা ছিল। কারগিল অভিযান যখন কেঁচে গেল তখন এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি পরামর্শ ও সহায়তা চাইলেন যিনি অভিযানের কথা জেনে হতবাক। অতঃপর প্রধানমন্ত্রীকে উড়ে যেতে হলো ওয়াশিংটনে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনার জন্য। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন বড়দিনের ছুটি কাটছাঁট করে পাকিস্তানি নেতার সঙ্গে তড়িঘড়ি আয়োজিত বৈঠকে বসেছিলেন।

মোশাররফের বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে তাতে কোনো আইন লঙ্ঘন করা হয়নি। যা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা হলো অন্য তিন সামরিক শাসক আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার মামলা আমলে না নেওয়ার ঐতিহ্য। পাকিস্তানের ইতিহাস ও তার সামরিক বাহিনীর আধিপত্যের নিরিখে বলা সহজ যে এ রায়ের পর বাস্তবতার পরিবর্তন সামান্যই আশা করা যায়। ছেলের কম্পানি থেকে বেতন নেওয়ার কথা অস্বীকার করার অভিযোগে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু সাবেক এক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করা খুবই কঠিন। পাকিস্তান জন্মকাল থেকে এ সংকটে নিপতিত।

আদেশ মানা হোক বা না হোক, বিশেষ আদালতের এ রায় পাকিস্তানের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। ছেলের কম্পানি থেকে বেতন নেওয়ার কথা অস্বীকার করার অভিযোগে দণ্ড দেওয়ার কারণে বিচার বিভাগ চরম সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এ রায়ের মাধ্যমে তার উত্তরণ ঘটেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু অভিযোগে প্রকাশ্যেই মোশাররফের দণ্ড চেয়েছিলেন; এখন সত্যের সম্মুখীন। তিনি কি চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন, নাকি বিচারিক মানদণ্ড অনুসরণ করবেন—সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : পাকিস্তানের রাজনীতিক ও কূটনীতিবিদ

সূত্র : দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

সূত্র-কালেরকণ্ঠ

ট্যাগ :