আলোকিত কক্সবাজারকার্যকর ডিজিটাল কর ব্যবস্থ গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময় - আলোকিত কক্সবাজার কার্যকর ডিজিটাল কর ব্যবস্থ গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময় - আলোকিত কক্সবাজার

কার্যকর ডিজিটাল কর ব্যবস্থ গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়

প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৪ ২৩:২৮:১৫ || আপডেট: ২০২০-০৫-১৪ ২৩:২৮:১৫

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন

দিন দিন করোনাভাইরাস (কোভিড -১৯) এর অতি দ্রæত প্রসারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। এটা অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে পড়েছে। নানাদিক থেকে সমস্যা দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে । ব্যবসা-বাণিজ্য, রুজি-রোজকার থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন এবং পৃথকীকরণের ফলে বিশ্বজুড়ে সামাজিক ক্রিয়াকলাপের প্রতিটি ক্ষেত্রই প্রভাবিত হচ্ছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে ট্যাক্স ডিজিটালাইজেশন বিষয়টি ট্যাক্স চ্যালেঞ্জগুলির জন্য একটি নতুন রেজোলিউশন, যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হওয়া অবশ্যই ব্যতিক্রম নয়, বরং সময়পোযুগী।

করোনায় অর্থনৈতিক খাতেআমরা যে ব্যাপকঝুঁকির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের উপায়গুলি নিয়ে ভাবনা, গভীরভাবে চিন্তা করা এবং বাস্তবায়নের জন্য এখন থেকেই কাজশুরু করা আবশ্যক। আজ বিশ্ব ব্যাপী যে বিষয়টি প্রধানআলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মধ্যে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য সরকারের রাজস্ব আদায়ের কৌশল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশিকরদাতার আয়কে সহায়ক ও সহনীয় পর্যায়ে সহযোগিতা করে কিভাবে আয়কর আদায় অব্যাহত রাখা যায় সে কৌশল নিয়েও চিন্তা ভাবনা করা জরুরী।

তাই একদিকে আয়কর আদায়ে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগ, অন্যদিকে ব্যবসা বান্ধব আয়কর ব্যবস্থা চালু করা দুটি ক্ষেত্রেই সমসাময়িক কৌশল প্রয়োগ করাই হবে অর্থনীতির জন্য সহায়ক। এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও একটা বড় বিষয় হিসেবে দেখা দিবে। কারণ অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে গেলে রাজনৈতিক মতানৈক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হতে পারেবহুবিধ, তবে উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আবশ্যক। এই ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলিউত্তরণে শিক্ষা ও প্রস্তুততি কোভিড -১৯: এর পরবর্তী কাজ হিসেবে আমাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার পথ বাতলে দিচ্ছে।

সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশও মহামারী করোনার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব দৃশ্যমান। সরকারের রাজস্ব আদায়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রস্তুতি নিতে হবে আট-ঘাট বেঁধে। ইতোমধ্যে হয়তো নানা উদ্যোগ তারা নিয়েছেন। করোনার ছুটির মধ্যেই অফিস খোলা রাখার কথাও শোনা যাচ্ছে।

তবে এতে কতটুকু সফলতা আসবে তা অনুমান করা কঠিন। গতানুগতিক নিয়মেরিটার্ন জমাআর ট্যাক্স জমার পদ্ধতি থেকে বের না হলে রাজস্ব বোর্ড তার কাঙ্খিত লক্ষ্য তো দূরের কথা রাজস্ব আদায়ের সাথে জড়িত লোকবল আর অফিস ব্যবস্থাপনা ব্যয় মেটাতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছে। করোনা মহামারীর পূর্বে রাজস্ব আদায়ের হারের বিষয়টি মূল্যায়ন করলে সন্দেহটি অমূলক হবে না। ফলে রাজস্ব বোর্ড হয়ে উঠতে পারে সরকারের আরেকটা চিন্তার বিষয়।

সুতরাং এখনই প্রয়োজন তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অতিদ্রæত কার্যকর পদক্ষেপগ্রহণ করা। কত কম খরচে করদাতাদের কাছ থেকে কর আদায় করা যায়, তা নিয়ে কাজে নেমে পড়া। প্রসঙ্গত কিছু কর্মকর্তা হয়তো গতানুগতিক পদ্ধতি থেকে বের হতে চাইবেন না। কিন্তু তাদের অনীহা কিংবা বিরোধীতার দিকে নজর না দিয়ে সরকারকে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এক্ষেত্রে যে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. জটিলতা পরিহার করে,সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়কর রিটার্নের একটি অনলাইন ভার্সন চালু করা, যাতে সহজে করদাতাগণ নিজে বা তার সহযোগী/আয়করআইনজীবিদের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দিতে পারেন।
২. রিটার্ন জমা হওয়ার সাথে প্রাপ্তি স্বীকার পাওয়া এবং সার্টিফিকেট দরকার হলে তা যেন একইভাবে অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
৩. সংশ্লিষ্ট ফরম হবে সংক্ষিপ্ত এবং মৌলিক তথ্য সম্বলিত
৪. আয়কর দাতাদের টিআইএন নাম্বার দিলেই অটোমেটিক তার নামে আলাদা পাতা ওপেন হবে। যাতে একটা পাসওয়ার্ড এর ব্যবস্থা থাকতে পারে। এতে করে সহজে করদাতা নিজেই পাসওয়ার্ডটি প্রতিস্থাপন করতে পারেন।
৫. করদাতা নিজের ইচ্ছে মত সকল তথ্য দিতে পারবেন, পরবর্তীতে ভুল হলে তা যেন নিজেই সংশোধন করতে পারবেন;
৬. করাদাতার প্রদেয় আয়কর প্রদানের জন্য বিকাশ/নগদসহ সকল অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা। যাতে ভার্চুয়াল রিটার্ন পোস্টিং দেয়ার সাথে সাথে তার প্রদেয় করের পরিমাণ এবং পরিশোধের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় জানিয়ে দেওয়া হবে। ঐ সময়ের মধ্যে করদাতা তার প্রদেয় কর বিকাশ/নগদসহ অন্যান্য মাধ্যমে জমা দিলে একটা কোড দেয়া হবে। উক্ত কোড পোস্টিং দিলেই করদাতার রিটার্নটি গৃহিত হবে। গৃহিত হলে অটোমেটিক একটা মেসেজে তার মোবাইলে বা ই- মেইলে প্রাপ্তি স্বীকার চলে আসবে।
৭. করদাতার জন্য বিভিন্ন অপশন থাকবে-যেমন আপনার কি সার্টিফিকেট প্রয়োজন? করদাতা টিক চিহ্নতে ক্লিক করলেই সার্টিফিকেট তার পছন্দ বা চাহিদা মাফিক প্রিন্ট/সেভ/ইমেইলঅপশনচলে আসবে।
৮. একই ভাবে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও করা যেতে পারে।
৯. এব্যাপরে ব্যাপক পরিসরে প্রচার প্রচারনার ব্যবস্থা করা; যাতে করে সহজে করদাতাগণ নিজেদের সুবিধার কথাগুলি বুঝতে পারে এবং অনলাইনে ভার্চুয়াল রিটার্ন জমা দিতে আগ্রহী হন।
১০. করদাতার কোন বিষয়ে অধিকতর ব্যাখ্যা জানার প্রয়োজন হলে ই-নোটিশ করার ব্যবস্থা রাখা;
১১. ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে কর মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা;
১২. সংশ্লিষ্ট আয়কর আইনজীবিদের ব্যাপকহারে একাজে লাগানো যেতে পারে। বর্তমানে অনেক তরুন আইনজীবি আছেন, যারা তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ। তাদেরকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
১৩. কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবিদের অনলাইনে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে।

ভার্চুয়াল করব্যবস্থায় সরকারের রাজস্ব আদায়ে যে যে ক্ষেত্রে সাফল্য আসতে পারে:
১. কম লোকবল ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ রাজস্ব আদায়;
২. অতিসহজে ই-টিআইএনধারী করদাতাদের করজালে নিয়ে আসা সম্ভব হবে;
৩. করদাতাগণ উৎসাহী হবেন;
৪. কর রিটার্ন জমা দিতে গেলে হয়রানির স্বীকার হতে হয় বলে যে অভিযোগ আছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে;
৫. তথ্য প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে;
৬. অতিসহজে করদাতাকে মনিটরিং করা যাবে;
৭. করদাতাকে নোটিশ করার প্রয়োজন হলে সহজে করা সম্ভব হবে;
৮. করমামলা অতিদ্রæত নিষ্পত্তি করে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

এখন অনেকে বলতে পারেন , অনলাইনে রিটার্ন জমা দেয়ার ব্যবস্থা তো রয়েছেই । তবে সেটার কার্যকারিতা হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন সিস্টেম এর ওয়েব সাইটটি হলো-https://www.etaxnbr.gov.bd/tpos/registration। কিন্তু দুঃখজনক হলো আপনি সাইটিতে গিয়ে বিব্রত হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন। কারণ প্রথমে ভাল একটা উপদেশ দেয়া আছে। খুশি মনে সেটা দেখে দ্বিতীয় অপশনে গেলেই ((To register account for Income tax online filing system –Click here.) শুরু হবে আপনার বিরক্ত, কেননা এরপর সেটি আর কোন কাজ করবে না। অর্থাৎ আপনি রেজিস্ট্রেশনই করতে পারবেন না। এরকম বহু অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। আমাকেও বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছে-ভাই, আপনি হার্ড কপি জমা দিয়ে আসেন। তাহলে এমন অনলাইন ব্যবস্থার দরকার কি? বিগত কয়েক বছর ধরে সবক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে জাতীয় রাজস্ববোর্ড -এর কার্যক্রমে সেভাবে উল্লেখ করার মতো প্রভাব কিংবা অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেয়ার বিষয়টি তার বড় উদাহরণ।

বর্তমানে কোভিড-১৯ এর পরবর্তী অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য করপরিশোধ, কর আদায়, কর-মনিটরিং, কর-মামলা নিষ্পত্তি ইত্যাদিতে ডিজিটাল করনীতি ঘোষণা করা এবং তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা অত্যন্তজরুরী ও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

আমাদের সরলভাবে স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের করআদায় পদ্ধতি বিশ্বের অন্য যে কোন রাষ্ট্রের তুলনায় দুর্বল। এছাড়া আমাদের দায়িত্ববানদের অধিকাংশই স্বচ্ছ নন। আমাদের আয়কর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন আইনও নেই। ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ দিয়ে বর্তমান সময়ে আয়কর ব্যবস্থাপনা করা খুবই কঠিন। আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর বিভিন্ন দুর্বলতা থাকায় আয়কর কর্তারা যে কোন সময় একটা এসআরও জারি করে সহজ কোন বিষয়কে জটিল করতে পারেন, আবার সরকারের কোটি কোটি টাকা আদায় করার সুযোগ থাকলেও তা নামে মাত্র আদায় করে অব্যাহতি দিতে পারেন। এসুযোগগুলো আইনের ব্যাপক দুর্বলতা।

আমরা যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই, কর আদায়ে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারেআমাদের প্রতিবেশি দেশগুলির অগ্রগতি ব্যাপক। যেমন-গত ৩-৪ অর্থ বছর ধরেভারত ব্যাপক হারে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করছে এবং তাদের সফলতাও অনেক। ট্যাক্সটেক ইন্ডিয়া জরিপ ২০১৬-এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় ট্যাক্স আদায় এবং ব্যবসায় পরিচালনায় প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অন্যদিকে আমরা সর্বত্র ডিজিটাল ডিজিটাল বলে আওয়া তুলছি কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কাজের কাজ কিছুই করতে পারছি না।

বর্তমানে করোনা মহামারি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ভার্চুয়াল বনাম ডিজিটাল অর্থনীতি, করনীতি ও করআদায়নীতি কতটা প্রয়োজন, শুধু প্রয়োজন নয়, কতটা জরুরী। এটা সম্ভবও। আমরা অনেকে এখন ডিজিটাল পদ্ধতির সাথে অভ্যস্ত হচ্ছি এবং হতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ এর কোন বিকল্প এখন আর চিন্তা করা যাবে না।

তবে হ্যাঁ এনালগ পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের কতগুলি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলোকে বড় আকারে না দেখে তা মেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়াটাই জরুরী। আগামী ১জুলাই ২০২০ এর পূর্বে সরকার তথা রাজস্ব বোর্ড কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাইলেশন করার উদ্যোগ নিবেন এ প্রত্যাশা আমাদের সকলে। এটা সময়ের দাবি।

লেখক-মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন , আয়কর আইনজীবি -ঢাকা (০১৭১৬২৫৩৪৪৩)।

ট্যাগ :

আর্কাইভ

জুন 2020
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মে    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
দৃষ্টি আকর্ষণ