কক্সবাজারের মাটিতে ১ হাজার পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম

প্রকাশ: ২০২০-০১-১৫ ১১:১৮:০৭ || আপডেট: ২০২০-০১-১৫ ১১:১৮:০৭

আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২০
এক কেজি কয়লা থেকে ৮ কিলোওয়াট ঘন্টা, এক কেজি খনিজ তেল থেকে ১২ কিলোওয়াট ঘন্টা, আর এক কেজি ইউরেনিয়াম (ইউরেনিয়াম-২৩৫) থেকে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ কিলোওয়াট ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ তেল বা কয়লার শক্তির তুলনায় ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর শক্তি ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ গুণ বেশি। আর সেই ইউরেনিয়ামেরই উচ্চমাত্রায় উপস্থিতি পাওয়া গেছে কক্সবাজারের মাটি ও পানিতে। সদ্য প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্সডাইরেক্ট ডটকম-এ (গ্রাউন্ড ওয়াটার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এর মুখপত্র) গত ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৯৯০ পিপিএম মাত্রারও বেশি ইউরেনিয়াম থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর, বিশিষ্ট ভ‚-রসায়নবিদ ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করে জাপানে পরীক্ষার পর এ ফলাফল পান। উক্ত গবেষক দলে আরো ছিলেন- জিওলজিকেল সার্ভে অফ জাপানের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ এডভান্সড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির শিক্ষক-গবেষক ইয়োশিয়াকি কোন, জাপানের তুকোশিমা ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ টেকনোলজি, ইন্টাস্ট্রিয়াল এন্ড সোশ্যাল সায়েন্সের শিক্ষক-গবেষক রিও আনমা, জাপানের ওসাকা সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ সায়েন্সের শিক্ষক-গবেষক হারু মাসুদা ও কেজি শিনোদা, সুইডেনের কেটিএস-ইন্টারন্যাশনাল গ্রাউন্ড ওয়াটার আর্সেনিক রিচার্স গ্রুপের ডিপার্টমেন্ট অফ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক-গবেষক প্রসূন ভট্টাচার্য্য, জাপানের দশিশা ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষক-গবেষক ইউরিকো ইউকো এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক-গবেষক বিপুলেন্দু বসাক।
পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৮৫০.৭ পিপিএম থেকে ৯৯০.৬
পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যা ইত:পূর্বে সিলেট ও মৌলভীবাজারে প্রাপ্ত আকরিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উচ্চমানের। ২০১৫ সালে সিলেট ও মৌলভীবাজারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. একেএম ফজলে কিবরিয়ার নেতৃত্বে চালানো অনুসন্ধানে ৫০০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম ধরা পড়ে। ওই বছরের ডিসেম্বরে এক সেমিনারে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাশাপাশি কক্সবাজার সাগর তীরে ও ব্রহ্মপুত্র নদের বালিতে ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব থাকার তথ্য প্রকাশ করেন। তবে কক্সবাজার ও ব্রহ্মপুত্র নদের মাটিতে কী মাত্রায় কিংবা কী পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সারাবিশ্বে ভিন্ন মাত্রার ইউরেনিয়াম ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম পারমানবিক চুল্লীতে সমৃদ্ধ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামকে ০.৭% থেকে ৩.৭ পর্যন্ত এবং ৩.৭ থেকে ৫% মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়। তবে ২০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বলা হয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচআরইউ)। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রচুর পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার। আর সেই ইউরেনিয়ামের যোগান দেশ থেকে আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, কক্সবাজারে চালানো সাম্প্রতিক ওই গবেষণা অনুসন্ধানের জন্য ভ‚-পৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ১৮.৯ মিটার গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে ৩ মিটারের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জিরকন ও মোনাজাইট পাওয়া যায়।
তিনি জানান, কক্সবাজারের মাটিতে ১.১ পিপিএম থেকে ৩৩.৪ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম এবং ৬.৩ পিপিএম থেকে ২০২.৩ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া যায়। আর এই মাটিতে মোনাজাইটের পরিমাণ ৩.২৮% ভাগ এবং জিরকন এর পরিমাণ ২.৩৬% ভাগ। আর মোনাজাইট এবং জিরকন কনা নিজেই ৩৩৯৫.৯ পিপিএম থেকে ৩৯৩৭.৫ পিপিএম পর্যন্ত থোরিয়াম এবং ৮৫০.৭ থেকে ৯৯০.৬ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ। যা সাধারণ মাত্রার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ। সাধারণ মাত্রায় থোরিয়াম থাকে ২৭৫.৫ পিপিএম থেকে ৩১৮.৪ পিপিএম এবং ইউরেনিয়াম থাকে ২৫৬.৩ পিপিএম থেকে ২৯০.৫ পিপিএম পর্যন্ত। এটা বেশ সমৃদ্ধ এবং কম গভীরতায় থাকায় উত্তোলনও হবে খুব লাভজনক।
গত কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করে ১০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম এর অস্তিত্ব পান বিজ্ঞানী ড. আশরাফ। যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা হু নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি। হু নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হল ২ পিপিএম ( পার্টস পার মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ)। আর এ ফলাফলের পরই কক্সবাজারের মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা থেকে তিনি সম্প্রতি ওই জরীপ চালান বলে জানান।
গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, তার গবেষণায় মোনাজাইটের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার (১৬%) ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। রুটাইল, জিরকন ও ইলমেনাইটেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশে থাকে। ইউরেনিয়াম একটি ঘন, রূপালী-সাদা, সামান্য প্যারাম্যাগনেটিক তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি নমনীয় এবং ক্ষতিকারকও। ইউরেনিয়ামের কালো স্তর অক্সাইডের মাধ্যমে বাতাসকে দূষিত করে। ইউরেনিয়াম একটি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু এবং প্রায় সমস্ত ননমেটালিক উপাদান এবং তাদের অনেকগুলি যৌগের সাথে প্রতিক্রিয়া করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ভারী ধাতু, যা ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘনীভূত শক্তির প্রাচুর্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীর ভূ-ত্বকে টিন, টাংস্টেন এবং মলিবডেনমের মতোই সাধারণ একটি খনিজ ইউরেনিয়াম। সাধারণত: ২ থেকে ৪ পিপিএম ঘনত্বের পাথরেই ইউরেনিয়াম দেখা যায়। ইউরেনিয়াম সমুদ্রের পানিতে জন্ম নেয় এবং সেখান থেকেও আহরণ করা যায়। তবে ভ‚-পৃষ্ঠের নীচে বা পানিতে; যেখানেই ইউরেনিয়াম থাকুক না কেন সেখান থেকে তেজস্ত্রিয়তা বের হয়। এতে উপাদানটি চিহ্নিত করা সহজ। তবে কক্সবাজারের ভ‚-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়ামের কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে বা সাগরের পানিতে কী মাত্রায় রয়েছে, তা নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি।
কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলীয় বালিতে ভারি খনিজ সম্পদের উপস্থিতির তথ্য প্রথম জানা যায় ১৯৬১ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান ভূতাত্তি¡ক জরিপ অধিদপ্তর পরিচালিত এক জরিপে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন এই ভারি খনিজ সম্পদের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। ১৯৬৭ সালে দুইজন অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞের সহায়তায় দেশের দক্ষিণ-পূব উপকূলীয় অঞ্চলের বালিতে ভারি খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, জরিপ, বালির নমুনা বিশ্লেষণ, খনিজের পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের ওপর গবেষণা কাজ শুরু করা হয়। এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই বছরই পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন ‘ডাইরেক্টর অব নিউক্লিয়ার এন্ড মিনারেলস (ডি,এন,এম)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে, যার প্রধান কার্যালয় ছিল পাকিস্তানের লাহোরে। আর একটি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হয় চট্টগ্রামে। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম অফিস হতে ধারাবাহিকভাবে ভারি খনিজ বালি অনুসন্ধান ও জরিপের কাজ শুরু করা হয় এবং ওই বছরেই ওই প্রকল্পের প্রথম ধাপটি শেষ করা হয়। বাংলাদেশের ৫৫০ কিঃমিঃ দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চলে ‘ভারি খনিজ বালি অনুসন্ধান ও জরিপে’ ১৭টি স্তুপের মধ্যে পাওয়া ৮টি মূল্যবান খনিজ পদার্থের মধ্যে মোনাজাইট ও জিরকনের মত তেজস্ক্রিয় পদার্থও রয়েছে বলে জানান পরমাণু শক্তি কমিশনের কক্সবাজারস্থ খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের সাবেক ভ‚-তত্ত¡বিদ ও গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী।
তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খনিজ বালি অনুসন্ধানের কার্যক্রমটি আরও শক্তিশালীভাবে পরিচালনা করা হয়। এসময় অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞ কর্তৃক কাজের অগ্রগতি ও ফলাফল বিষয়ক পর্যালোচনা করা হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন বেশ লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশক্রমে ও অস্ট্রেলীয়া সরকারের অর্থানুকূল্যে খনিজ বালি হতে মূল্যবান উপাদানসমূহ পৃথকীকরণের সঠিক পদ্ধতি উদ্ভাবন, উপাদানগুলোর পরিমাণ এবং গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য কক্সবাজারে একটি পাইলট প্লান্ট স্থাপন ও চালু করা হয়। এসব কার্যক্রমের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল খনিজ বালি থেকে মূল্যবান উপাদানগুলো পৃথকীকরণের সঠিক উপায় উদ্ভাবন করা, যা থেকে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক প্লান্ট স্থাপনের দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। এবং ১৯৭৭ সালে পাইলট প্লান্ট প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করা হয়। ইতোমধ্যে এ কেন্দ্রের দীর্ঘ গবেষণায় এসব মূল্যবান খনিজের ব্যবহারযোগ্য মান অর্জিত হয়েছে।
ককক্সবাজারস্থ সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’র পরিচালক ড. মোহাম্মদ রাজিব জানান, প্রায় চার দশক সময় ধরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’ উপকূলীয় এলাকায় মূল্যবান খনিজ অনুসন্ধান এবং আহরণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এ যাবৎ ১৭টি ভারী খনিজ স্তুপের আবিষ্কারসহ এর বিস্তৃতি, মজুদ এবং গুণগত মান নির্ণয় করা হয়েছে। সেই সাথে একটি পরীক্ষামূলক প্লান্ট এবং একটি খনিজ পৃথকীকরণ গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে কাঁচাবালি প্রক্রিয়াজাতকরণ করে চলেছে। এ খনিজগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় প্রধান প্রধান খনিজসমূহ হলো ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন এবং রুটাইল। সম্প্রতি উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকার নদীবাহিত বালিতেও উপস্থিত অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণসম্পন্ন খনিজ, বিশেষ করে সিলিকা সমৃদ্ধ বালি নিয়ে গবেষণা চলছে।
বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তির উন্নয়নে রাশিয়ার সহযোগিতায় পাবনার রূপপুরে ২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। প্রায় ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র দুটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তির উন্নয়নে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৬১ সালে। এরপর এই প্রকল্পের সম্ভ্যাবতা যাচাই শেষে ১৯৬৩ সালে পাবনার রূপপুরকে প্রকল্পের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশ আমলে ২০০১ সালে পারমানবিক শক্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং ২০০৭ সালের ২৪ জুন দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করে এবং ওই বছরের ১৩ ফেব্রæয়রি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা MOU (Memorendum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র , ফ্রান্স এবং চীনের সাথে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা শীর্ষক একটি সহযোগিতা স্মারকেও স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১১ সালের ২ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি করপোরেশনের সাথে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ইতোমধ্যে রাশিয়া ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আনুমানিক দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দুটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। যদিও ইত:পূর্বে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়স্কো বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি উৎপাদনের জন্য ২০২১ সালে চালু হবে বলে জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০১৩ সালের ২৯ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ কোন দ্বীপে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
তবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. একেএম ফজলে কিবরিয়া এ প্রতিবেদকে বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ভ‚-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়াম পাওয়া গেলেও এগুলো রূপপুরে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ খনি থেকে পাওয়া এসব পদার্থ আকরিক থেকে পৃথক করতে যে প্লান্ট দরকার তা এখনও আমাদের দেশে স্থাপিত হয়নি। রূপপুরে সমস্ত জ্বালানী রাশিয়া থেকে সরবরাহ করা হবে।
তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই মূল্যবান খনিজ সম্পদের ব্যবহার এই মুহুর্তে সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক হিসাবে এখনই প্রস্তুতি শুরু করা উচিৎ বলে মনে করেন গবেষকরা।
গবেষক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর ধারণা, কক্সবাজারে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে, তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। গত বছর চট্টগ্রামের পতেংগায় চালানো জরীপেও মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ত্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যারমধ্যে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম ও রেডিয়াম রয়েছে। এসব জরীপ চট্টগ্রাম উপক‚লের মাটিতেও ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য সমুদ্র উপক‚লীয় এলাকাতেও এই খনিজ পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্যাগ :