বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
আলোকিত কক্সবাজার অনলাইন পত্রিকার  উন্নয়ন কাজ চলছে ; সাময়িক সমস্যার জন্য আন্তিরকভাবে দুঃখিত - আলোকিত কক্সবাজার পরিবারে যুক্ত থাকায় আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

“ঈদগাঁওতে আদর্শ শিক্ষালয়ে সভাপতি’র অনাদর্শিক কান্ড !

প্রতিবেদক এর নামঃ
  • প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ২৮১৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক.

কক্সবাজার সদরের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতন (কেজি স্কুল)। নব্বই দশকে প্রতিষ্টার পর পাশের হার বাড়ায় অভিভাবকদের কাছে অন্যতম নির্ভরতার শিক্ষালয়টিতে ক্রমে বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। এ সফলতাকে কাজে লাগিয়ে বিগত একযুগ ধরে অনৈতিকতার আশ্রয়ে সভাপতির পদ আকড়ে অনাদর্শিক কর্মকান্ড চালাচ্ছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি কামরুল হক চৌধুরী। তিনি শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগে প্রকাশ্য ঘুষের লেনদেন করছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রবিধান তোয়াক্কা না করে টেন্ডারহীন করছেন কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ। এসবে বাধা রোধে ম্যানেজিং কমিটিতে স্ত্রী, সম্মন্ধিসহ স্বজন ও নিজের তল্পিবাহক লোকজনকে স্থান দিয়ে অপকর্ম অব্যহত রেখেছেন।

এসব বিষয় উল্লেখ করে মাউশি অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ জুনায়েদ কবির নামে বিদ্যালয়টির প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী। তিনি স্থানীয় ঈদগাঁও কলেজ গেইট এলাকার ডা. মোহম্মদ আলমের ছেলে।

অভিযোগের অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী, দুদক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা অফিসারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রদেয় অভিযোগে জুনায়েদ কবির উল্লেখ করেছেন, অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও হোমিও চিকিৎিসক মোহাম্মদ আলম স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের নিয়ে ১৯৮৬ সালে স্কুলটি প্রতিষ্টা করেন। বাস স্টেশন এলাকায় পছন্দ করা জমির কিছু অংশের দাতা ছিলেন কামরুল হক চৌধুরী। তাই তিনিও শুরু থেকে পরিচালনা কমিটিতে দাতা সদস্য হিসেবে রয়েছেন। সবার একাগ্রচিত্যতায় নব্বই দশকে স্কুলটি পাঠদানে সেরা হিসেবে জেলায় সুনাম ছড়ায়। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থী সংখ্যা।

আয় ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ায় কর্মহীন কামরুল হক চৌধুরী স্কুল আঙ্গিনায় সারাদিন সময় দিয়ে ডা. মোহাম্মদ আলমসহ অন্য প্রতিষ্ঠাতাদের কৌশলে সরিয়ে সবকিছু নিজের দখলে নেন। ম্যানেজিং কমিটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শশুর, সম্মন্ধি, স্ত্রী ও অন্যস্বজনদের সম্পৃক্ত করেন স্কুলে। হাতে নেন বিদ্যালয়ের সুবিধাভোগী কিছু শিক্ষককেও। এরপর থেকে বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনের তপশীল নিজেদের ভেতর সীমাবদ্ধ রেখে তিনি ও প্রধান শিক্ষক অনুগতদের নিয়ে সংগোপনে পছন্দের কমিটি গঠন করেছেন। ফলে প্রকৃত অভিভাবকরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।
এ অভিযোগের সত্যতা মিলে ঈদগাঁও কলেজ গেইট এলাকার সেলিম রেজা নামের এক অভিভাবকের কথায়। তিনি বলেন, ২০০৩ সাল হতে এ বিদ্যালয়ে পড়ে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করা প্রথম সন্তান এখন অনার্সে পড়ে। ২০১৮ সালে পাশ করে দ্বিতীয় সন্তান এখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে। তৃতীয় সন্তান এখনো পড়ছে নবম শ্রেণীতে। দীর্ঘ এ সময়ে কোনদিনই ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন সম্পর্কে জানানো হয়নি।

একই কথা, অভিভাবক ভাদিতলার আলী হোসাইন, পালাকাটার মুজিবুর রহমান, মেহেরঘোনার আলী আকবর, পাহাশিয়াখারীর বজলুর রশীদসহ অসংখ্যজনের।

জুনায়েদ আরো উল্লেখ করেন, বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক ছালেহা আকতারকে নিয়োগ দেয়ার বিনিময়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি কামরুল হক চৌধুরী পৃথক ভাবে ২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ঈদগাঁও শাখার ছালেহা আকতারের ১৫১-১২২-০০০০৮৮০১ হিসাবের বিপরীতে ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর ২৭৭৩৪৫৪ নম্বর ও একই বছরের ৮ নভেম্বর প্রদেয় ২৭৭৩৪৫৫ নম্বর চেকে সভাপতির স্ত্রী ম্যানেজিং কমিটির দাতা সদস্য সেলিনা আকতারের একই ব্যাংকের ১২২-৪-১ নম্বর হিসাবে পৃথক ভাবে ২ লাখ টাকা নেন। সহকারী গ্রন্থাগারিকের (ছালেহা আকতার) ব্যাংক বিবরণীতে তা স্পষ্ট।

ঘুষের টাকা পেয়ে ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের বিপরীতে ছালেহা আকতারকে একই বছর ২১ নভেম্বর নিয়োগপত্র দেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিজ্ঞাপনের বিপরীতে আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট। কিন্তু ছালেহা আকতার গ্রন্থাগার ডিপ্লোমা পাশ করেন ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর। এতে তার আবেদনই ছিল অবৈধ। এরপরও নিয়োগপত্র দেয়ার বিষয়টি মাউশির চট্টগ্রামের ডিডির কাছে ধরা পড়ায় বাতিল করা হয় প্রথম নিয়োগ। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ একই পত্রিকায় দ্বিতীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে ২৫ এপ্রিল পরীক্ষা দেখিয়ে ৩০ এপ্রিল ছালেহাকেই নিয়োগপত্র দেয়া হয় এবং তিনি ওই বছরের ৩ মে কর্মস্থলে যোগ দেন।

শুধু ছালেহা নয়, অন্যান্য আরো অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে, ছালেহার মতো চেকে কারো কাছ থেকে এভাবে টাকা নেননি সুচতুর সভাপতি। আর চাকুরি সমস্যাসহ প্রতিষ্ঠানে কোনঠাসা হবার ভয়ে কেউ বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেন না। এছাড়াও বিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগেও তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও পরীক্ষা ব্যতিরেখে নিজের পছন্দের লোকদের নিয়োগ দিয়ে বিপুল অর্থ হাতাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘুষের টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে না নিয়ে বাধাহীন ভাবে পরিবারেই খরচ করেন তিনি।

এসবের পাশাপাশি, বিগত একযুগ ধরে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে তিনি কখনো টেন্ডার আহবান করেননি। এমনকি বিদ্যালয়ের ভবন সম্প্রসারণে এককালীন ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও বিনা টেন্ডারে নিজের তত্বাবধানে কাজ করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানেও বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কারে প্রায় ১০ লাখ টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে চলছে। অডিট কার্যক্রম যথাযথ তদারক করলে তা প্রমাণ হবে বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।
সহকারি গ্রন্থাগারিক ছালেহার নিয়োগে ঘুষ নেয়ার বিষয়ে কামরুল হক চৌধুরী বলেন, নিয়োগের বিনিময়ে ছালেহা স্কুলে কিছু বেঞ্চ সরবরাহ দিয়েছিলেন বলে জানি। নগদ টাকা নেয়ার কথা নয়।

কিন্তু, দাতা সদস্য (সভাপতির স্ত্রী) সেলিনা আকতারের একাউন্টে পৃথক ভাবে ছালেহার একাউন্ট থেকে ২ লাখ টাকা হস্তান্তর হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টিআকর্ষণ করা হলে তিনি উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, এমনটি হয়েছে নাকি? এটি সাংবাদিকের কাছে কেমন করে এলো? আর এটাতো কয়েকবছর আগের ঘটনা। এসব নিয়ে এখন কোয়েরি করার প্রয়োজন কি? বিষয়টি আমার ঠিক মনে পড়ছেনা। খবর নিয়ে জেনে বলতে হবে।

শিক্ষার্থীদের পাঠোন্নয়নে নেয়া খন্ডকালীন শিক্ষকরা পছন্দসই লোক না হলে কার্য সফল হয়না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আর, বিনা টেন্ডারে উন্নয়ন কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, বিদ্যালয় ফান্ডের টাকায় আমরা তিনতলা একটি ভবন করেছি। সরকারি একতলা একটি ভবনের উপরে সম্প্রসারণ করে আরো দু’তলা তুলেছি। টেন্ডার দিলে অনেক ধরণের ঝামেলা হয়। তাই উন্নয়ন কাজ হিসেবে ম্যানেজিং কমিটি আলাদা উন্নয়ন কমিটি করে নিজেরাই ভবন তৈরী করেছি।

উন্নয়ন কর্মকান্ড চালাতে সরকারের বেধে দেয়া নিয়মনীতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সবদিক লিয়াজু করলে কোন কথা উঠে না, এখন নিজেরা করেছি বলেই এত কথা আসছে। এসব বিষয়ে মাউশি থেকে তদন্ত দল এসে ঘুরে গেছে। তারা বেশ কয়েক বছরের অডিট রিপোর্ট চেয়েছে। ভবিষ্যতে টেন্ডারহীন কাজ না করতে সতর্ক করে দিয়ে চলে গেছেন নিরীক্ষাদল। এ নিয়ে তো আর কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।

জুনায়েদ বলেন, শিক্ষা নিয়ে এমন বাণিজ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিকতার শিক্ষা ছড়াবে না। এলাকার সবাই বিষটি অনুধাবন করলেও হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খুলেন না। আমি একবার বলতে গিয়ে নিগৃহিত হয়েছি। স্বেচ্ছাচারিতা-দুর্নীতি-অনিয়মে বুঁদ হয়ে স্ত্রীকে দাতা সদস্য বানালেও অন্য কাউকে দাতা সদস্য হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না সভাপতি। দাতা সদস্য হতে অনেকের আবেদন ম্যানেজিং কমিটির সভায় উপস্থাপন পর্যন্ত করেননা তিনি। উল্টো মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করেন। এরকম একটি মামলা থেকে সম্প্রতি খালাস পেয়েছি আমি।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. মো. গোলাম ফারুক বলেন, অভিযোগ পেয়েছি-তদন্ত করে সত্যতা পেলে বিধিমতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
Design and Develop By MONTAKIM
themesba-lates1749691102